শত শত নদীবেষ্টিত ভূ-ভাগে প্রাচীন কৌম ও বঙ্গ-জন অধ্যুষিত বঙ্গ-জনপদ। বিচিত্র এর ভূ-প্রকৃতি, যা তার মানুষদের মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। সেই প্রকৃতি মনোহর আর দৃষ্টিনন্দন হলেও আচরণে অনেকটা প্রতিপক্ষ। দৃষ্টিসীমা সরলভাবে দিগন্তের সন্ধান পায় না। পথ-ঘাটও অসরল, আঁকা-বাঁকা। প্রলয়ঙ্কারী বন্যা এখানকার প্রায় প্রতিবছরের ঘটনা। নিত্য লড়াই চলে নদী আর তার পাড়ের মানুষদের মধ্যে। নদী ঘর ভাঙে, শস্য কেড়ে নেয়। সমুদ্র ফূলে ওঠে গ্রাস করে সবকিছু। এমনিতর জল-স্থলে প্রতিপক্ষের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকে এ অঞ্চলের পরাক্রমশালী মানুষেরা। আর তাই লড়াই সংগ্রাম প্রতিবাদমুখরতা তাদের সংস্কার। আত্মবিস্মরণ বা অস্তিত্বকে ভোলার অবকাশ মেলেনি তার। সভ্যতার বিকাশ বা বিকাশের উৎকর্ষতার বদৌলতে সেই প্রতিপক্ষসুলভ প্রকৃতিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও প্রতিপক্ষ বা শত্র“র নব রূপে প্রত্যাবর্তন রোধ করা যায়নি। প্রতিকূলতার চটুল চরিত্র ও নব মাত্রিকতায় পাল্টে গেছে যুদ্ধের প্রকৃতি। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, উগ্র আগ্রাাসী জাতীয়তাবাদ, শোষণসর্বস্ব পুুঁজিবাদ, ধর্মান্ধতা প্রভৃতি তথাকথিত সভ্যতার ধারক মানুষদেরই সৃষ্টি, যে সৃষ্টির বিকাশ মানুষেরই চরম শত্র“রূপে। অন্যদিকে এসকল শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে মুক্তিকামী বিশ্ববাসী প্রগতির অস্ত্র হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেছে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, উদার জাতীয়তাবাদের ধারণা, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী মূল্যবোধ, এবং সমাজতন্ত্রের দর্শন। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে প্রগতির উপরোক্ত অস্ত্রসমূহ মূলশক্তি ও প্রেরণার যোগান দিয়েছিল।
প্রায় দু’শো বছর শাসন-শোষণ শেষে ১৯৪৭’র আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান এ নামক দু’ পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করে ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ব্রিটিশরা। এর মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে স্বাধীনতা নামক এক মাকাল ফল, যা আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হয়ে খেয়েছিলাম। ১২শ’ মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে একমাত্র ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো মিলই ছিল না। এ তথাকথিত স্বাধীনতা পরিণত হয় মূলত পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্বাধীনতায়, পূর্ব পাকিস্তানকে অবাধ শোষণের স্বাধীনতা। পূর্ব পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশ বিবেচনা করে পশ্চিমারা এদেশের মানুষকে রাষ্ট্রজীবনের সর্বক্ষেত্রে উপেক্ষিত ও বঞ্চিত রাখে, যেমন- ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রাদেশিক স্ব্যায়ত্বশাসন, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি। আশা বা মোহভঙ্গের প্রথম বছর ১৯৪৮ সালে ভাষার ওপর আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি নিজস্ব ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে ঢাকায় এক গণবিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ কয়েকজন নিহত ও অনেকে আহত হন। ভাষার জন্য জীবন ও রক্তদানের মাধ্যমেই শুরু হয় এদেশবাসীর স্বাধিকার আদায়ের সুদীর্ঘ সংগ্রাম। এ সুদীর্ঘ সংগ্রামের পরিণত প্রকাশই ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালীর স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ৬ দফা ম্যান্ডেট নিয়ে পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। পূর্বতন বছরগুলোতে সংগঠিত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া এদেশবাসীর মনস্তত্ত্বে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, তা আরো করুণভাবে আত্মগত হয় ১৯৭০-র ১২ নভেম্বর। ইতিহাসের এক প্রলয়ংকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগে পূর্ববাংলার দক্ষিণাঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এদিন। সর্বনাশা ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ১০ লাখ মানুষের জীবন ছিনিয়ে নেয়। সর্বস্বান্ত হয় অসংখ্য মানুষ। অথচ এই বিরাট জাতীয় দুর্যোগে ইয়াহিয়া সরকার দুর্গত জনসাধারণের প্রতি নিষ্ঠুর উদাসীনতা প্রদর্শন করে।
এরপর ১৯৭০-র ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ৩১৩ আসনের মধ্যে পুর্ব পাকিস্তানের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬৯, এবং আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়। ফলাফল বিবেচনায় কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করার কথা আওয়ামী লীগের। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনে মত দিতে অস্বীকার করেন। সরকার গঠন বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে শুরু হয় আলোচনা বৈঠক। কিসের জন্য আলোচনা, এটা বুঝতে বাঙালি নেতৃবৃন্দের খুব একটা সময় লাগেনি। জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে শেখ মুজিব ১ মার্চ ’৭১ দেশব্যাপী অসহযোগের আহবান জানান। রুখে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। সর্বস্তরের জনগণ একবাক্যে জননেতার এ আহবানে সাড়া দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অচল করে তোলে। ২ মার্চ থেকে পূর্ব বাংলার সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম চলতে থাকে শেখ মুজিবর রহমানের নির্দেশে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শিত হয়। ৩ মার্চ রমনা রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। এই ইশতেহারে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এরপর পরিস্থিতির পরম্পরায় আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। রমনা-রেসকোর্সে বিশাল জনসমুদে শেখ মুজিব গভীর আবেগ, নির্ভুল যুক্তি এবং ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনাপূর্ণ এক ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণে তিনি বলেন, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। ... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
মূলত সেদিন থেকেই ‘স্বাধীনতা” শব্দটি এদেশবাসীর। প্রতিদিন শেখ মুুজিবর রহমান আহুত অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পাকসরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষাভ মিছিল,সভা-সমাবেশ ও প্রতিরোধযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ২৩ মার্চ সকালে পল্টন ময়দানে জয় বাংলা বাহিনীর এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে এ বাহিনীর নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের পতাকাসহ শেখ মুজিবের বাসভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করেন। ২৩ মার্চ পূর্ব বাংলার প্রতিটি শহরে পাকিস্তান দিবসের অনুষ্ঠান বর্জিত হয় এবং পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়।
অন্যদিকে, পূর্ব-পাকিস্তানের জেগে ওঠা সচেতন জনতার অধিকার আদায়ের যৌক্তিক সংগ্রাম রুদ্ধ করে দিতে পাক-সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত নেয় চূড়ান্ত আঘাত হানার। এ লক্ষ্যে ফেব্র“য়ারি বা তার আগে থেকেই মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে বিমান ও জাহাজযোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষের ওপর অপারেশন চালানোর নির্দেশ প্রদান করা হয়। অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২টি সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে ১ম সদর দপ্তরটি গঠিত হয়। এখানে ৫৭তম বিগ্রেডের বিগ্রেডিয়ার আরবাবকে শুধু ঢাকা মহানগরী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং মেজর জেনালে খাদিম রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লে. জেনারেল টিক্কা খান। শহরের মানুষ পাকিস্তানীদের এ অভিযান প্রতিরোধ করতে রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রয়াস পায়। ঢাকা সেনানিবাস থেকে বের হওয়া পাকসেনাদের প্রথম সাঁজোয়া বহর ঠেকাতে ফার্মগেট এলাকায় রাস্তায় রাস্তায় গাছের গুড়ি, পুরনো গাড়ি ফেলে ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়। সেনাবহর এসে পৌঁছলে শত শত মানুষ মুহর্মুহু জয়বাংলা স্লোগান দিতে থাকে। কিন্তু অচিরেই সেনাদের মেশিনগান তাদের নিস্তব্ধ করে দেয়। শুরু হয় গণহত্যা; পাকসেনারা সেনানিবাসে অতর্কিতভাবে বাঙালি সেনাদের ওপর হামলা চালায়। তারা পিলখানাস্থ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, খিলগাঁওয়ের আনসার সদর দপ্তর প্রভৃতি প্রতিরক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা স্থাপনায় সশস্ত্র হামলা চালায়। মধ্যরাতের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসিক ভবন, পত্রিকা অফিস, পুরাতন ঢাকার হিন্দুপ্রধান অঞ্চল শাখারী পট্টি, তাঁতিবাজারসহ ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া প্রভৃতি স্থানের সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় সশস্ত্র হামলা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে এক রাতের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই প্রায় ১ লাখ নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানী সেনারা। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ জীবন রক্ষার্থে শহর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নেয়।
অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর সম্ভাব্য মৃত্যু মেনে নিয়েও জনগণের জীবন রক্ষার্থে মহাহত্যাযজ্ঞের প্রথম প্রহরেই গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। স্বাধীনতা হয়ে ওঠে সবার অভিন্ন ও একমাত্র লক্ষ্য। ২৬ মার্চ-ঢাকা এক ধ্বংসস্তূপের নগরী। এ ঘটনায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে শুরু হয অভাবনীয় প্রতিরোধ প্রক্রিয়া। ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানা এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকসেনারা এদেশীয় পুলিশ, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট’র সৈন্যদের নিরস্ত্র করে পাইকারি গণহত্যা চালালে সেই খবর অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। আত্মরক্ষার ও দেশাত্মবোধের তাগিদে অধিকাংশ সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য প্রতিরোধ-সংগ্রামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন। সশস্ত্রবাহিনীর বিক্ষিপ্ত বিদ্রোহের মধ্যে চট্টগ্রামস্থিত ৮-ইবি এবং ইপিআর বাহিনীর সসস্ত্র প্রতিরোধ একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। এতে স্বল্পকালের জন্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র দখলে আসলে ২৬ মার্চ স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এম.এ হান্নান এবং ২৭ মার্চ অপরাহ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ৮ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার আরেকটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ ঘোষণাটিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। নবগঠিত এ রাষ্ট্রের সরকার জোটবদ্ধ না হয়ে বিশ্বের অপর রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ স¤পর্ক সৃষ্টিতে আগ্রহী। এছাড়াও এ ঘোষণায় সারা বিশ্বের সরকারগুলোকে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলারও আহ্বান জানানো হয়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র : মুজিবনগর প্রশাসন, তৃতীয় খন্ড, প্রকাশকাল : নভেম্বর, ১৯৮২)
ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে দুর্বিসহ হয়ে ওঠা বাংলার শহর-গ্রাম থেকে পাহাড়, জঙ্গল, নদী-নালা ডিঙিয়ে লাখ লাখ মানুষ বেরিয়ে পড়ে নিরাপত্তার খোঁজে। বেশিরভাগ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের স্থানে স্থানে তাঁবু খাটিয়ে তৈরি করা হয় শরণার্থী শিবির। প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বাংলাদেশী শরণার্থীদের ভার নিলেও পরবর্তীতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শরণার্থী আশ্রয় নিতে থাকলে এর ভার নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ১৪১ টি শরণার্থী শিবির স্থাপিত করা হয়। এই শিবিরগুলিকে মোট ৯,৮৯৯,৩০৫ বাংলাদেশী আশ্রয় গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গে ৭,৪৯৩,৪৭৪, ত্রিপুরাতে ১,৪১৬,৪৯১, মেঘালয়ে ৬৬৭,৯৮৬, আসামে ৩১২,৭১৩ ও বিহারে ৮৬৪১ সংখ্যক বাংলাদেশী শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করে। নকশাল-বিক্ষত জনবহুল পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অগণিত বিদেশী শরণার্থী বিশেষত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জন্যে উন্মুক্ত করা অসামান্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীন ভূমিকা রাখেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। মুক্তিযুদ্ধের এ পর্বে অসামান্য ভূমিকা রাখেন সীমান্ত অতিক্রম করা আওয়ামী লীগ নেতা (সাধারণ সম্পাদক) তাজউদ্দিন আহমদ। প্রায় একক প্রচেষ্টায় তিনি সে সময় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র সময় জুড়ে তিনি সমস্ত বিভ্রান্তি ও উপদলীয় কোন্দলের মধ্যে স্থির থেকে জাতিকে সঠিক নেতৃত্বে চালিত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখেন।
৪ এপ্রিল মুক্তিবাহিনীর উর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ, যথা- কর্নেল এম এ জি ওসমানী, লে. কর্নেল আবদুর রব, লে. কর্নেল সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শাফায়াত জামিল প্রমুখ ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদরদপ্তর তেলিয়াপাড়ায় সমবেত হন। এ সভায় কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মনোনিত করে একটি প্রাথমিক কমান্ড কাঠামো গঠন করা হয়। ৪ জন উর্ধ্বতন কমান্ডারকে সার্বিক প্রতিরোধ ও অপারেশনের দায়িত্ব প্রদান করা হয় : মেজর শফিউল্লাহকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল, মেজর খালেদ মোশাররফকে কুমিল্লা- নোয়াখালী অঞ্চল, মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে কুষ্টিয়া- যশোর অঞ্চল এবং মেজর জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল।
১০ এপ্রিল নির্বাচিত সাংসদগণ আগরতলায় একত্রিত হয়ে এক সর্বসস্মত সিদ্ধান্তে সরকার গঠন করেন। এই সরকার স্বাধীন সার্বভৌম গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। স্বাধীনতার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব) বলে এ সরকারের কার্যকারিতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়। ১১ এপ্রিল নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ আরও ৩ জন আঞ্চলিক অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেন : রংপুর অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ, দিনাজপুর- রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলে মেজর নজমূল হক এবং বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলে মেজর এম এ জলিল। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ বাহিনীর সদরদপ্তর ১২ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু করে। লে. কর্নেল এম এ রব চীফ অব স্টাফ এবং গ্র“প ক্রাপ্টেন এ কে খন্দকার ডেপুটি চীফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথ তলায় বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সম্মুখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির এ সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান জাতীয় সংসদের ¯পীকার অধ্যাপক ইউসুফ আলী। যে সমস্ত নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় তাঁরা হলেন :
১। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানে বন্দী)
২। উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি)
৩। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
৪। অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
৫। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ (আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
৬। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান (ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত)
শেখ মুজিবর রহমানের অবর্তমানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে এবং কর্নেল এমএজি ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে সরকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে কর্নেল আবদুর রবকে সেনাবাহিনী প্রধান, এ কে খন্দকারকে বিমানবাহিনী প্রধান ও উপ-সেনা প্রধান এবং মেজর শামছুল আলমকে মেডিকেল সার্ভিস-এর ডাইরেক্টর জেনারেল হিসেবে মনোনিত করা হয়। দেশ বিদেশের শতাধিক সাংবাদিক ও হাজার হাজার দেশবাসীর উপস্থিতিতে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংসদ জনাব আবদুল মান্নান। সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এই স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিব নগর।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় এটি একটি জনযুদ্ধে রপ নেয়। তাই রাজনৈতিকভাবে এই যুদ্ধকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সর্বসম্মতিক্রমে একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন :
ক) জনাব আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি ন্যাপ ভাসানী
খ) জনাব মনি সিং সভাপতি বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টি
গ) অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ সভাপতি ন্যাপ মোজাফফর
ঘ) জনাব মনোরঞ্জন ধর সভাপতি বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস
ঙ) জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী পদাধিকারবলে
চ) খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদাধিকারবলে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র এই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সরকার প্রায় এক কোটি শরণার্থীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে বিশ্বের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা উপস্থাপনসহ একটি সময়-উপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ :
১। যে সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন-
ক) রাষ্ট্রপতির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব আবদুস সামাদ আজাদ, এম এন এ
খ) প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, এম এন এ
গ) তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত জনাব আবদুল মান্নান, এম এন এ
ঘ) জয় বাংলা পত্রিকার উপদেষ্টা জনাব জিল্লুর রহমান, এম এন এ
ঙ) যুব শিবির নিয়ন্ত্রণ পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ আলী, এম এন এ
২। বেসামরিক প্রশাসন-
ক) ক্যাবিনেট সচিব জনাব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ টি ইমাম)
খ) মুখ্য সচিব জনাব রুহুল কুদ্দুস
গ) সংস্থাপন সচিব জনাব নূরুল কাদের খান
ঘ) অর্থ সচিব
জনাব খন্দকার আসাদুজ্জামান
ঙ) পররাষ্ট্র সচিব জনাব মাহাবুবুল আলম চাষী এবং জনাব আবুল ফতেহ
চ) প্রতিরক্ষা সচিব জনাব এম এ সামাদ
ছ) স্বরাষ্ট্র সচিব জনাব এ খালেক
জ) স্বাস্থ্য সচিব জনাব এস টি হোসেন
ঝ) তথ্য সচিব জনাব আনোয়ারুল হক খান
ঞ) কৃষি সচিব জনাব নুরউদ্দিন আহমেদ
ট) আইন সচিব জনাব এ হান্নান চৌধুরী
৩। কুটনৈতিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসীর কাছে
গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন-
ক) মিশন প্রধান যুক্তরাজ্য, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (বহিঃর্বিশ্বে সরকারের বিশেষ দূত)
খ) মিশন প্রধান কলিকাতা, জনাব হোসেন আলী
গ) মিশন প্রধান নতুন দিল্লী, জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী
ঘ) মিশন প্রধান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, জনাব এম আর সিদ্দিকী
ঙ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত ইরাক, জনাব আবু ফতেহ
চ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত সুইজারল্যান্ড, জনাব অলিউর রহমান
ছ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিলিপাইন, জনাব কে কে পন্নী
জ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেপাল, জনাব মোস্তাফিজুর রহমান
ঝ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত হংকং, জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ
ঞ) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত জাপান, জনাব এ রহিম
ট) মিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত লাগোস, জনাব এম এ জায়গীরদার
৪। স্বাধীন বাংলাদেশের গণমুখী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো কি হবে সে লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে। যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি এই পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন তাঁরা হলেন :
(ক) ড. মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী
(খ) ড. মোশারাফ হোসেন
(গ) ড. খান সরওয়ার মুরশিদ
(ঘ) ড. এম আনিসুজ্জামান
(ঙ) ড. স্বদেশ বোস
৫। মুক্ত এলাকায় সুষ্ঠু প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং ভারতে অবস্থান গ্রহণকারী শরণার্থীদের দেখাশুনা ও যুব শিবির পরিচালনার জন্য সরকার সমস্ত বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করেন। প্রতিটি প্রশাসনিক এলাকায় চেয়ারম্যান ও প্রশাসক নিয়োগ করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার সংবাদ প্রচারিত হলে কলকাতার পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত এম. হোসেন আলী বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেন। এর আগে ৬ এপ্রিল দিল্লীর পাক হাইকমিশনের কর্মকর্তা কে. এম. সাহাবুদ্দিন ও আমজাদুল হক বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য জানান। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ক্যানবেরা, কাঠমুন্ডু, ম্যানিলা, লন্ডনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দূতাবাসে বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মাচারীরা পাকিস্তানপক্ষ ত্যাগ করেন। এসব ঘটনাবলি মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি লন্ডনে তাঁর সদর দপ্তর স্থাপন করে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরূপে ছুটে বেড়ান, যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের নাড়া দেয়। বিশ্বজনমত আদায়ের লক্ষ্যে তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রধান শহরে নানা উপায়ে পাকিস্তানী নৃশংসতা তুলে ধরেন। লক্ষ্য হয়ে যায় একটিই, সেই নির্দিষ্ট ও দুর্নিবার লক্ষ্যÑ দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি। ফলে সশস্ত্রযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের অভিপ্রায়ে দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে মুক্তি পিয়াসী সবুজের দল।
৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। ৯ মে তাঁদের হাতে ন্যস্ত করা হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগদানেচ্ছু বাংলাদেশের তরুণদের প্রশিক্ষণ দানের দায়িত্ব। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ভারত একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বরাদ্দ করলে প্রথমে আগরতলা থেকে এবং তারপর ২৫ মে থেকে কলকাতা থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের’ অনুষ্ঠান নিয়মিত স¤প্রচার শুরু হয়। মুক্তিপাগল শব্দ-সৈনিকদের নির্ভিক প্রচেষ্টায় মুক্তিবাহিনীর জন্য প্রচারিত চরমপত্র, রণাঙ্গন কথিকা, রক্তস্বাক্ষর, অগ্নিশিক্ষা, দেশাত্ত্ববোধক গান ইত্যাদি উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠানসমূহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সমর্থনকারী সবাইকে দারুণ উজ্জিবিত করে। পাশাপাশি চিত্রসৈনিকেরাও তাঁদের শিল্পকর্মে পাকিস্তান শাসকদের ব্যঙ্গচিত্র উপস্থাপন করে জনমনে পাকিস্তানী শাসন সম্পর্কে তীব্র ঘৃণার সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি অঞ্চলভেদে আরও কয়েকটি বাহিনী সংগঠিত হয়। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনী, সিরাজগঞ্জে লতিফ বাহিনী, ঝিনাইদহে আকবর বাহিনী, ফরিদপুরে হেমায়েত বাহিনী, বরিশালে কুদ্দুস বাহিনী ও গফুর বাহিনী, ময়মনসিংহে আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী, রংপুর- কুড়িগ্রাম অঞ্চলে আলতাফ বাহিনী, নওগাঁ-রাজশাহী অঞ্চলে ওহিদুর বাহিনী প্রভৃতি। পাশাপাশি সর্বহারা দলের নেতা সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে তাঁর গণবাহিনী বরিশাল অঞ্চলে বেশ কিছু সফল অপারেশন সম্পন্ন করে। অন্যদিকে, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেও কার্যকর থাকে। এতে মস্কো বা রাশিয়াপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলো প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন ও অংশগ্রহণ করলেও চীন বা পিকিংপন্থী কমিউনিস্টগণ দোদুল্যমানতায় ভুগতে থাকেন। পিকিংপন্থীদের অন্যতম নেতা মওলানা ভাসানী সত্তরের নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে জনগণকে নির্বাচনে নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্ররোচনা চালালেও নির্বাচনে ৬ দফাপন্থী আওয়ামীলীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করলে তিনি তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন- এ বিজয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের বা দলের নয়, ইহা সাতকোটি মানুষের বিজয় ...।” তিনি অবিলম্বে ইয়াহিয়া সরকারকে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। মওলানা ভাসানীর এ ডাবল স্টান্ডার্ড বা দ্বৈত আদর্শে পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের অধিকাংশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এঁদের মধ্যে অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের মারামারি হিসেবে অভিহিত করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকেন, আবার অনেকে একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। আবার অনেকে পিকিংপন্থী আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেন। এখানে উল্লেখ্য, নওগাঁ-রাজশাহী-নাটোর অঞ্চলে পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট ওহিদুর রহমান পার্টির হটকারীতত্ত্ব পরিহার করে তাঁর প্রায় ১ হাজার যোদ্ধা ও ১ হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে আওয়ামীলীগ ফ্রন্টের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ঐতিহাসিক একাত্তরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সুগঠিত পাকসেনাদের বিপরীতে মুক্তিবাহিনী ছিল অনেকটা আগোছালো, অসংবদ্ধ। তবুও তাঁরা পাকসেনাদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। আশা ছিল, পৃথিবীর মানবতাবাদী সংস্থা ও বড়ো বড়ো সভ্য দেশগুলো এই অসম যুদ্ধ রোধে সচেষ্ট হবে। কিন্তু তা হয় নি। তাই মে মাসের মাঝামাঝি থেকে গেরিলাযুদ্ধের পথ বেছে নেয়া হয়। ১৩টি শিবিরে মে-জুন-জুলাই এ তিন মাস ধরে চলতে থাকে গেরিলা প্রশিক্ষণ। তাঁদের রণকৌশল- অতর্কিত আক্রমণে ছোটো ছোটো পাক সেনাদলকে পরাজিত করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নেয়া। জীবন বাজি রেখে এভাবেই চলতে থাকে এদেশবাসীর যুদ্ধ প্রক্রিয়া। ফলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ পুনর্দখলের ফলে সৃষ্ট পাকিস্তানী শাসকদের আত্মপ্রসাদ ক্রমশ ম্লান হয়ে আসতে থাকে জুন মাসের শেষের দিকে। জুলাই মাসে নিয়মিত বাহিনীর ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে জেড ফোর্স’ নামে প্রথম একটি ব্রিগেড গঠন করা হয়। অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান। অক্টোবর মাসে এস ফোর্স’ নামে দ্বিতীয় ব্রিগেড গঠিত হয় ২য় ও ১১শ বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে। অধিনায়ক মেজর শফিউল্লাহ। এরপর ৪র্থ, ৯ম এবং ১০ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে গঠিত হয় কে ফোর্স।
১০ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী সদরদপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সভাপতিত্বে যুদ্ধ-অঞ্চলের অধিনায়কদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে বাংলাদেশকে ১১টি যুদ্ধ-সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এ কমান্ডারগণ হলেন :
সেক্টর অধিনায়ক যুদ্ধ-এলাকার তথ্য
সেক্টর- এক মেজর রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অংশবিশেষ (মুহুরী নদীর পূর্বপাড় পর্যন্ত)। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপ্স ২১০০ জন সেনা এবং ২০,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- দুই মেজর খালেদ মোশাররফ কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ, ঢাকা জেলা ও ফরিদপুর জেলা। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপ্স ৪,০০০ জন সেনা এবং ৩০,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- তিন মেজর কে এম শফিউল্লাহ কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ, ময়মনসিংহ জেলার অংশবিশেষ, ঢাকা ও সিলেট জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপ্স ৬৬৯৩ জন সেনা এবং ২৫,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- চার মেজর সি আর দত্ত সিলেট জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপ্স ৯৭৫ জন সেনা এবং ৯,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- পাঁচ মেজর মীর শওকত আলী সিলেট জেলার অংশবিশেষ ও ময়মনসিংহ জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল ছয়টি। সেক্টর ট্রুপ্স ১৯৩৬ জন সেনা এবং ৯,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- ছয় উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার রংপুর জেলা ও দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল পাঁচটি। সেক্টর ট্রুপ্স ২৩১০ জন সেনা এবং ১১,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- সাত মেজর নজমূল হক ভূঁইয়া
রংপুর জেলার অংশবিশেষ, রাজশাহী জেলার অংশবিশেষ, পাবনা জেলার অংশবিশেষ ও দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ এবং বগুড়া জেলা। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল নয়টি। সেক্টর ট্রুপ্স ২৩১০ জন সেনা এবং ১২,৫০০ জন গেরিলা। সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ তারিখে সড়ক-দুর্ঘটনায় মেজর নজমূল হক ভূঁইয়া নিহত হওয়ার পর লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান সেক্টর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেক্টর- আট মেজর আবু ওসমান চৌধুরী যশোর জেলা, ফরিদপুর জেলা, কুষ্টিয়া জেলা, খুলনা ও বরিশাল জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপ্স ৩,৩১১ জন সেনা এবং ৮,০০০ জন গেরিলা। ১৮ আগস্ট লে. কর্নেল এম আবুল মঞ্জুর সেক্টর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেক্টর- নয় মেজর আবদুল জলিল বরিশাল জেলা, পটুয়াখালী জেলা, খুলনা জেলা, ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল তিনটি। সেক্টর ট্রুপ্স ৩,১১ জন সেনা এবং ৮,০০০ জন গেরিলা।
সেক্টর- দশ প্রধান সেনাপতির নিয়ন্ত্রণে (নৌ-সেক্টর) সমগ্র বাংলাদেশ। এ সেক্টরটি গঠিত হয়েছিল নৌ-কমান্ডোদের দিয়ে। বিভিন্ন নদী বন্দর ও শক্র পক্ষের নৌ-যানগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য এঁদের বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানো হতো। লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্ব এবং পাকিস্তানিদের প্রস্তুতি বিশ্লেষণ করে অভিযানে সাফল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতো এবং তার ওপর নির্ভর করত অভিযানে অংশগ্রহণকারী দলসমূহে যোদ্ধার সংখ্যা কত হবে। যে সেক্টর এলাকায় কমান্ডো অভিযান চালানো হতো, কমান্ডোরা সেই সেক্টর কমান্ডারের অধীনে কাজ করতেন। নৌ-অভিযান শেষে তাঁরা আবার তাঁদের মূল সেক্টর- ১০ নম্বর সেক্টরের আওতায় চলে আসতেন। নৌ-কমান্ডোর সংখ্যা ছিল ৫১৫ জন।
সেক্টর- এগার মেজর আবু তাহের ময়মনসিংহ জেলা, সিলেট জেলা ও রংপুর জেলার অংশবিশেষ। এ সেক্টরের সাব-সেক্টর ছিল সাতটি। সেক্টর ট্রুপ্স ২৩১০ জন সেনা এবং ২৫,০০০ জন গেরিলা। মেজর আবু তাহের ১৪ নভেম্বর ’৭১ আহত হওয়ার পর এই সেক্টরের দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয় নি।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আগস্ট একাত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতে ট্্েরনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল দশ হাজারেরও কম, যা পাক সেনাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিতান্তই অপ্রতুল। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত কারণে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বাংলাদেশের মক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা-সংকট কাটানোর লক্ষ্যে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে কুড়ি হাজার করে আরো ষাট হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেনিং দেয়া হয় এবং বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর জন্যে গঠন করা হয় আরো নতুন তিনটি ব্যাটেলিয়ান। সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে চলমান অস্ত্রশস্ত্র সংকটের উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৬ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ নৌ-কমান্ডো বাহিনীর পৃথিবীকে চমক লাগানো নৌবিধ্বংসী তৎপরতার অভাবনীয় সাফল্য মুক্তিযুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ভারতের সহায়তায় ট্রেনিংপ্রাপ্ত মাত্র ৩০০ জন নৌমুক্তিযোদ্ধা মাত্র ৬ টি ছোট নৌযান নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে ১৬ আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে সর্বমোট ৫০,৮০০ টন জাহাজ নিমজ্জিত করেন, ৬৬,০৪০ টন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করেন, এবং বেশ কিছুসংখ্যক নৌযান দখল করে নেন। এ দুঃসাহসিক অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে পরিচিত।
প্রত্যক্ষ তৎপরতার ক্ষেত্রে তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা নভেম্বরের শুরুতে অনেক বেশি সক্রিয় ও আত্মবলে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। লক্ষ্য ও কৌশল সম্পর্কে যথোপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই তাঁরা দখলদার সৈন্যদের চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ হটাতে সক্ষম হন। এতে পাকিস্তানী বাহিনীর এদেশীয় সহযোগী রাজাকার বাহিনীর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও সুবিধাবাদী অংশটি ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে, এবং এ অবস্থায় বাহিনীর আয়তন বৃদ্ধির জন্যে দখলদার সামরিক শাসকরা জামায়াতে ইসলামী এবং বিহারী সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় গঠিত ‘আলবদর’ ও ‘আল শামস’ বাহিনীদ্বয়ের গোঁড়া সদস্যদের ওপর অধিকতর নির্ভর করতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, অধ্যাপক গোলাম আজমের প্রস্তাবনা ও প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ৯ এপ্রিল ’৭১ ঢাকায় ১৪০ সদস্য নিয়ে নাগরিক শান্তি কমিটি’ গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল এ কমিটির নাম পরিবর্তন করে শান্তি কমিটি’ রাখা হয় এবং জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে এ কমিটি গঠিত হয়। কমিটির তত্ত্বাবধানে একাত্তরের মে মাসে মওলানা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে খুলনার আনসার ক্যা¤েপ এ বাহিনী গঠিত হয়। তিনি এই বাহিনীর নামকরণ করেন রাজাকার বাহিনী। এ বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ (পঞ্চাশ) হাজার। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান সহযোগী হিসাবে এরা দায়িত্ব পালন করে। এরপর আগস্ট মাসে ময়মনসিংহে গঠিত হয় আলবদর বাহিনী। বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে এ বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। এ বাহিনীর কার্যকলাপের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধে আলবদর বাহিনী ১,১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এসকল নপুংসক রাজাকার, আলবদর বাহিনী ছাড়াও পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী মিজোবাহিনী। সরল স্বভাবের কিন্তু বিপথে চালিত এই মিজোদের কয়েকটি নিরাপদ ঘাঁটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে। এ ঘাঁটিগুলো পাকিস্তান ও চীনের দ্বারা প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে এমন পরিপূর্ণ হয়ে থাকত যে এ বৈরি ভূমিতে যে কোনো সম্ভাব্য ভারতীয় অনুপ্রবেশ তারা প্রতিরোধ করতে পারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশস্থ পাকিস্তান প্যারা মিলিটারি ফোর্সেস-এর বেতনভূক্ত এ মিযোদের পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে মোতায়েন করা হয়। তারা চীনাদের দ্বারা গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তবুও পাক কর্তৃপক্ষ প্রতিটি পোস্টে মিযোদের পাশাপাশি বেলুচি, পাঠান ও পাঞ্জাবীদের ছোটো ছোটো ইউনিট রাখত এটা নিশ্চিত করার জন্যে যে তারা যেন সর্বশেষ লোক এবং সর্বশেষ রাউন্ড পর্যন্ত পাকিস্তানের স্বার্থে লড়াই করে।
এদিকে ঢাকার পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এলাকার জীবন্ত কিংবদন্তি কাদের সিদ্দিকী নবীন একদল সহকর্মী নিয়ে পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ পরিচালনায় এক বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করেন। টাইগার সিদ্দিকী নামে পরিচিত মাত্র ২৫ বছর বয়সী তরুণ মুক্তিযোদ্ধা তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, অভূতপূর্ব রণকৌশল এবং বিরল সামরিক প্রতিভাবলে গড়ে তোলেন ১৭ হাজার সুদক্ষ মুক্তিযোদ্ধা এবং ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এক বিরাট বাহিনী। ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ নামে খ্যাত এ দলটি কখনো অস্ত্র সাহায্য পাওয়ার আশায় বসে থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ও বহুগুণ শক্তিশালী পাক বাহিনীর ওপর আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে অস্ত্র ছিনিয়ে এনে যুদ্ধে ব্যবহার করেছেন তাঁরা। এ বাহিনীর অসাধারণ রণনৈপুণ্যেই ডিসেম্বর মাসে মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ মুক্ত এলাকা দিয়েই প্রথম ঢাকায় পৌঁছে।
আগস্ট মাসে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবের ফাঁসির ঘোষণা করেন ইয়াহিয়া। ইন্দিরা গান্ধীর প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ইয়াহিয়া বিশ্ববাসীকে জানাতে বাধ্য হনÑ শেখ মুজিব বেঁচে আছেন এবং কারাভ্যন্তরেই রয়েছেন। অন্যদিকে ১ কোটি শরণার্থীর ও মুক্তিযোদ্ধাসহ
অন্যান্য বঙ্গবাসীর যাবতীয় প্রয়োজনের যোগান দিতে গিয়ে মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে ইন্দিরা সরকার। সংগঠিত এ সমস্যাবলির সমাধানকল্পে ইন্দিরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মস্কো এবং ২৪ অক্টোবর থেকে তিন সপ্তাহের জন্যে বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানি ভ্রমণ করেন। কিন্তু বিশ্বনেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় কেমন ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ভারতকেই প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন। এভাবে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়। ৩ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তানী বিমানবাহিনী ভারতের ৭টি বিমান ঘাটিতে একযোগে হামলা চালালে অনিবার্য হয়ে যায় ভারতের সর্বাত্মক যুদ্ধপ্রস্তুতি। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
এ চূড়ান্ত যুদ্ধে ভারতীয় ইষ্টার্ণ কমান্ড অংশ গ্রহণ করে। তাদের সদর দপ্তর ছিল কলকাতাস্থ ফোর্ট উইলিয়ামে এবং অধিনায়ক ছিলেন লে. জেনারেল জগজিত সিং অরোরা। এ যুদ্ধে ভারতীয়দের তিনটি কোর (৭টি ডিভিশন), ১টি কমুইনিকেশন জোন, ১টি প্যারা বিগ্রেড, ৩টি বিগ্রেড গ্র“প, ১২টি মিডিয়াম রেজিমেন্ট আর্টিলারী, ৪৮টি ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী, ১টি আরমার্ড রেজিমেন্ট, ২টি ইন্ডিপেন্ডেন্ট আরমার্ড বিগ্রেড, ৩টি ইঞ্জিনিয়ার বিগ্রেড, ২৯ টি বিএসএফ ব্যাটালিয়ান অংশ গ্রহণ করে। এ পর্বের ২ দিনের যুদ্ধেই বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তান বিমানবাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। কূট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে যখন বুঝতে পারেন যে এ যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, তখন নতুন ষড়যন্ত্রের প্রচেষ্টা চালাতে প্রয়াসী হন। এপ্রিল মাস থেকেই হোয়াইট হাউস পাকিস্তানকে অস্ত্র না দেয়ার বিবৃতি দিলেও, গোপনে এ প্রক্রিয়া সচল থাকে যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে।
চলমান যুদ্ধে পাকিস্তানের নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫ ডিসেম্বর বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডেকে যুদ্ধ-বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করে। সঙ্গে সঙ্গে এ অন্যায় প্রস্তাবে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তথা পাকিস্তানের এ প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। পরদিন ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন ইন্দিয়া গান্ধী। এতে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়, এবং ভারতে সকল প্রকার মার্কিন অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যস্ত সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত তার সমুচিত জবাব দেয়। ইতোমধ্যে রণাঙ্গণে শুরু হয়ে যায় পাকসেনাদের পলায়ন পর্ব। ৭ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানীদের নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে আগাতে থাকে যুদ্ধের পরিণতি।
প্রেস সেন্সর ও সংবাদ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করায় এ সময় গণহত্যাসহ পাকসেনা কর্তৃক সংঘটিত অন্যান্য অপরাধের সংবাদ বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য বিশ্ববাসী বাংলাদেশের সঠিক চিত্র সম্পর্কে প্রথম দিকে অবহিত হতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বাধীনতার স্বপক্ষে বাংলাদেশ ও বিদেশে বাঙালীদের উদ্যোগে মুজিবনগর, মার্কিন যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়। এসব সংবাদপত্রে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা, বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম ও নির্দেশাবলী, নেত্রবৃন্দের বিবৃতি ও তৎপরতা, প্রবাসী বাঙালীদের আন্দোলনের খবর ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত জয় বাংলা, বাংলাদেশ, বঙ্গবাণী, স্বদেশ, রণাঙ্গন, স্বাধীন বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ, সোনার বাংলা, বিপ্লবী বাংলাদেশ, জন্মভূমি, বাংলারবাণী, নতুন বাংলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিউজ লেটার, বাংলাদেশ সংবাদ পরিক্রমা, আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিউজ লেটার, বাংলাদেশ নিউজ বুলেটিন, শিক্ষা উল্লেখযোগ্য। কানাডা থেকে বাংলাদেশ স্ফুলিঙ্গ’ নামক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। জুলাই মাসের দিকে বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশের গণহত্যাসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড সম্পর্কে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কতিপয় দেশ ছাড়া জাতিসংঘ এবং অপরাপর সদস্য দেশ এ ব্যাপারে সচেতন হয় এবং পাকিস্তানের বর্বরোচিত কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ১৯৭১-র মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে বিরোধীতা করলেও সেদেশের মানবতাবাদী জনতা নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্বয়ারে অনুষ্ঠিত করে ইতিহাসের স্মরণযোগ্য আয়োজন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে দর্শক ছিল ৪০ হাজার, এবং আয় হয়েছিল আড়াই লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের শিশুদের কাজে ব্যয় করার জন্যে জাতিসংঘের শিশু তহবিলে জমা দেয়া হয়। এছাড়া এ অনুষ্ঠানটি মার্কিন জনগণসহ বিশ্বাবাসীর সহানুভূতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১০ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারদের অধীনে ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর এক যৌথ কমান্ড গড়ে তোলা হয়। যৌথ কমান্ডের পরিকল্পনা ছিল সম্ভাব্য বড়ো ঘাঁটিগুলোকে এড়িয়ে সর্বাপেক্ষা কম ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে ঢাকা দখল করা। এক্ষেত্রে এমন কৌশল অবলম্বন করা হয় যে, পাকিস্তানীরা ভুল করে ধারণা করেÑ চতুর্দিকে বিপুল শক্তি নিয়ে যৌথ কমান্ড এগিয়ে আসছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানীপক্ষ সমগ্র দেশে তাদের সামরিক শক্তি ছড়িয়ে দেয়। এতে পাকিস্তানবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশ্যম্ভাবী পরাজয় বুঝতে পেরে পাকিস্তানী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরের যুদ্ধ বিরতির আবেদন জানায়। নিরাপত্তা পরিষদে যখন এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে ইয়াহিয়া জাতিসংঘকে জানান এ প্রস্তাব অনুমোদিত নয়। তাই তা নাকচ করা হোক। ইয়াহিয়ার এ মত পরিবর্তনে মার্কিন সপ্তম নৌবহর ছিল যুদ্ধ জয়ে আশার আলো। এ সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে চীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি বিশ্বসংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়।
ডিসেম্বর ১০ থেকে ডিসেম্বর ১৫, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম লগ্ন। ততদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানীদের অবধারিত পরাজয়। আসন্ন পরাজয়ের কথা জেনেও পাকিস্তানী পশুরা ঘৃণ্য নৃশংসতা ও বিকৃত উল্লাসের সাথে হত্যা করে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কট্টরপন্থীদের সশস্ত্রবাহিনী ‘আলবদর’। গোস্টাপো স্টাইলের এ বাহিনী বিশিষ্ট বাংলাদেশীদের চিনিয়ে দেবার, ধরিয়ে দেবার এবং অবশেষে হত্যা করার ভার নেয়।
পাক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নক্সার প্রণেতা। যাঁরা ধর্ম নিরপেক্ষতা, শোষণমুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন তাঁরাই এই হত্যালীলার শিকার হয়েছেন। ‘জেনোসাইডের’ পাশাপাশি ‘এলিটোসাইডে’ অন্তর্ভুক্ত ছিলেনÑ বাংলাদেশের লেখক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী প্রমুখরা। ঢাকার এক বিরাট সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও উচ্চপদস্থ অফিসারদের গভর্নর হাউসে এক সভায় আমন্ত্রণ করে নির্বিচারে হত্যা করার একটি মহাপরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানীদের। পরবর্তীতে এই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়াই ছিল ওদের এ হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য। তবুও তারা হত্যা করে ১,১১১ জন বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে।
একাত্তরের ইতিহাসে অত্যন্ত ঘটনাবহুল একটি দিন ১৪ ডিসেম্বর। ঢাকা শহর ও গুটিকয় ছোটো ছোটো এলাকা বাদে সারা দেশ তখন শত্র“ মুক্ত। আসন্ন যুদ্ধ ও সম্ভাব্য ধ্বংসের আশঙ্কায় থমথমে ঢাকা শহর। নিশ্চিত পরাজয় জেনে পাকিস্তান বাহিনী তাদের এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায় স্বাধীন হতে যাওয়া বাংলাদেশকে মেধাশূণ্য করে দেওয়ার জন্য বহু বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐদিনই ঢাকার গভর্নর হাউসের ওপর আক্রমণ চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর ছয়টি মিগ ২১। এ ঘটনায় পাস্তিানের সর্বোচ্চ বেসামরিক প্রশাসন অর্থাৎ পরিষদ গভর্নর মালিক পদত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খানের চৈতন্যোদয় হয় সেদিন। ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাপতি লে. জেনারেল নিয়াজীকে বার্তা পাঠানÑ পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের সহযোগীদের জীবনরক্ষার্থে যুদ্ধ বন্ধ করার সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার। শর্তহীন আত্মসমর্পণের দিকে তাড়িত হয় পরাস্ত পরিশ্রান্ত ইস্টার্ন কমান্ড। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত বাহিনী ঢাকা নগরীর উপকণ্ঠে সমবেত হয়। এরপর আসে ১৬ ডিসেম্বর। বাংলার ইতিহাসে এক হিরন্ময় মুহূর্ত।
১৬ ডিসেম্বর প্রথমার্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩৬ নম্বর ডিভিশনের প্রধান মেজর জেনারেল জমশেদ ঢাকার মীরপুর সেতুর কাছে ভারতীয় অধিনায়ক মেজর জেনারেল নাগরাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা ঢাকায় প্রবেশ করে। দুপুর ১ টায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব পাকবাহিনীর আত্মসমর্পনের খসড়াদলিল নিয়ে বিমানযোগে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। বিকেল ৪ টায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশ ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্র“প ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার, এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিগণ ঢাকায় অবতরণ করেন। এর আধঘণ্টা পরেই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল হর্ষোৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী সমরাধিনায়ক লে. জেনারেল নিয়াজী বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল পাকিস্তানী বাহিনীর (৯৩,০০০) পক্ষে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। জন্ম হয় একটি দেশের, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এখনো দেশ যুদ্ধ করে চলছে তার অভ্যন্তরীণ ও আভ্যন্তরীণ অপশক্তিসমূহের বিরুদ্ধে। কেননা, মুক্তির যেমন শেষ নেই, তেমনি মুক্তিযুদ্ধেরও শেষ হয়নি। ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের শত সহস্র বছরের স্থবিরতার শেষ ঘোষণা মাত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন