রবিবার, ২৫ মার্চ, ২০১২

আবহমান স্বাধীনচেতা বঙ্গভূমি

বৈদিক সাহিত্য মহাভারত ও মৎসপুরানের পুরাকাহিনী থেকে বলিরাজা নামক এক প্রজাবৎসল প্রসিদ্ধ রাজার কথা জানা যায়। কিন্তু রাজা অপুত্রক হওয়ায় বংশ রক্ষার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে প্রখ্যাত অন্ধমুনি দৃঘতমাসের শরণাপন্ন হন। রাজার প্রবল কাকুতি-মিনতিতে এক সময় মুনি করুণা করে তাঁর ঔরসে রাণীর গর্ভে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম নামক পাঁচ পুত্র সন্তান দান করেন। পরবর্তীতে এঁদের বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ নামে পাঁচটি সমৃদ্ধ জনপদের সৃষ্টি হয়। Ñএ গল্পটি নিছক পুরাণালেখ্য হলেও খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে রচিত সাহিত্যে এ সকল জনপদের নাম থেকে এগুলোর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। বাংলাদেশের বর্তমান উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্র অঞ্চল উল্লিখিত পুন্ড্র জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি পুন্ড্র জনপদ এ অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন হওয়ায় এখানকার উঁচু ভূমিতেই প্রথম মানববসতি ও সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ বলেছেন- বাংলার রাঢ়-বরেন্দ্রই প্রাচীন। পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গ অর্বাচীন। রাঢ় ছিল অনুন্নত ও অজ্ঞাত। তাই বরেন্দ্র নিয়েই বাংলার ইতিহাসের শুরু। মানুষের আদি নিবাস ছিল সাইবেরিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। সেখান থেকেই নানা পথ ঘুরে আসে ভূমধ্যসাগরীয় দ্রাবিড়, নিগ্রো, সাইবেরীয়, নর্ডিক-মোঙ্গল। এরাই অষ্ট্রীক, দ্রাবিড়, শামীয়, নিগ্রো, আর্য, তাতার, শক, হূন, কুশান, গ্রীক, মোঙ্গল, ভোটচীনা প্রভৃতি নামে পরিচিত। আমাদের গায়ে আর্য-রক্ত সামান্য, নিগ্রো-রক্ত কম নয়, তবে বেশি আছে দ্রাবিড় ও মোঙ্গল-রক্ত, অর্থাৎ আমাদেরই নিকট জ্ঞাতি হচ্ছে কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল, নাগা, কুকী, তিব্বতী, কাছাড়ী, অহোম প্রভৃতি। ক্স

কেবল ঐতিহাসিক নয়, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সমৃদ্ধতর সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন জাতির বিশেষ আকর্ষণ ছিল, যার পরিণতিতে নানাবিধ উপলক্ষে এখানে তাঁদের আগমন বা আগ্রাসন। এদেরই একটি দল মধ্য এশিয়ার যাযাবর আর্য জাতি। আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, বৈদিক যুগের শেষ দিকে বহিরাগত আর্যরা অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় ভুখন্ডে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে ভারত ভূখন্ডে প্রবেশের এক হাজার বছরের মধ্যে তারা বাংলায় স্থানু হতে পারেনি। আর্য-রচিত বৈদিক সাহিত্যে এর কারণ হিসেবে বাংলায় বসবাসকারী আদি জাতিগোষ্ঠীর অনুন্নত সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিন্দা জ্ঞাপন থাকলেও তা যে পরাজিতের ক্ষোভ ভিন্ন অন্য কিছু নয় তা সহজেই অনুমেয়। বাংলার মানুষ এসকল বহিরাগত আর্যদের কাছে সহজে তাদের আত্মমর্যাদাবোধ বিকিয়ে দেয়নি।

ইতিহাসের সূত্র ধরে জানা যায়, ভারতে আগমনের পর আর্যরা বার বার এ ভূখন্ড অধিকার করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, আর বার বার তাদের আগ্রাসনকে রুখে দিয়েছে এখানকার অদি অধিবাসী কোল, ভিল, মুন্ডা, সাঁওতালগণ। আর্যরা প্রথমদিকে কৃতিত্ব দেখাতে না পারায় বঙ্গের লোকদের ম্লেচ বলে উপহাস করত এবং এদের ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ করত। কিন্তু একসময় যুদ্ধজ্ঞানে দক্ষ আর্যরা যুদ্ধে ঘোড়া ও লোহার ব্যবহার শুরু করলে এখানকার স্থানীয়দের পরাভব ঘটে। এরপর কালক্রমে হিন্দু বর্ণব্যবস্থার উপরের স্তরে আসীন হয় আর্যরা। স্থানীয় নরগোষ্ঠীদের দিয়ে তৈরি হয় নীচের স্তর।
এখান থেকেই শুরু স্বাধীনতা খুঁজে ফেরার ইতিহাস। এরপর আর নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি এদেশের মানুষ। ৩২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর বাংলা দখল করে সর্বভারতীয় মৌর্যসাম্রাজ্য। সে সময় সমগ্র উত্তরবঙ্গ বা উত্তর বাংলা পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্র জনপদ নামে পরিচিত ছিল্। পরবর্তীতে এ অঞ্চল বরেন্দ্র নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। বর্তমান বগুড়ার মহাস্থাগড়কে কেন্দ্র করে পুন্ড্রনগরের পত্তন ঘটায় মৌর্য্যরা। কিন্তু বাংলার মানুষ এ বিদেশী শাসনকে মেনে নিতে না পেরে স্বাধীন রাজ্য গড়ার প্রয়াস পায়। মৌর্য্যযুগেই তারা গঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে তোলে স্বাধীন ও শক্তিশালী গঙ্গারিডি রাজ্য।

গ্রীক ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সম্রাট আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে এ ভূখন্ডে গঙ্গারিডি নামক রাজ্যটি পরাক্রান্ত ছিল। এ রাজ্যের তখন ৬০ হাজার পদাতিক সেনা, ১ হাজার অশ্বারোহী সেনা এবং ৭ শত রণহস্তি ছিল। মহাবীর আলেকজান্ডার নাকি গঙ্গারিডির এ ধরনের পরাক্রম-শক্তির কথা জানতে পেরে এ রাজ্য পরাভূত করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেছিলেন। প্লিনি, টলেমি এবং রোমান কবি ভার্জিলের লেখাতেও গঙ্গারিডি রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধির উল্লেখ রয়েছে। অবশ্য খ্রিষ্টাব্দ শুরুর তিনশ বছর পূর্ব থেকে খ্রিষ্টাব্দ শুরুর পরবর্তী তিনশ বছর পর্যন্ত মোট ছয়শ বছরের বাংলার ইতিহাস এখনো উদঘাটন করা যায়নি।

মৌর্যদের পরে তিন শতকের মধ্যে সর্বভারতীয় রাজবংশের পত্তন ঘটায় গুপ্তরা। মহারাজ শ্রীগুপ্তের শাসনামলে বরেন্দ্র গুপ্ত-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু বর্হিদেশীয় রাজাদের শাসন এদেশের মানুষকে স্বস্তি দেয়নি বলে তারা নিজেদের স্বাধীনচেতা ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছে বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ অঞ্চলে গুপ্তশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বাংলার মানুষ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটায়, যেমন- দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সমতট রাজ্য, পশ্চিম বাংলার পুষ্করণ রাজ্য। এরইমধ্যে ৬ শতকের দিকে গুপ্তসাম্রাজ্যে অরাজকতা শুরু হলে এবং পতন ঘটলে এদেশের মানুষ মুক্তির প্রত্যাশায় বঙ্গরাজ ও গৌড়রাজ নামে আরও দুটি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটায়।

৭ শতকের প্রথম দিকে রাজা শশাঙ্ক নিজ যোগ্যতাবলে গৌড়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গৌড় তথা বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা হিসেবে খ্যাত শশাঙ্কর মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় পরবর্তী প্রায় একশ বছরের অরাজকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এ বঙ্গভূখন্ড। একদিকে বিদেশী শত্রর আক্রমণের আশঙ্কা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিদ্রোহ, ঠিক মাৎস্যনায় যুগের মতো। তবে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অর্জিত সংগ্রামী অভিজ্ঞতা এখানকার মানুষকে হতাশায় বিপর্যস্ত না করে নতুন প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটাতে প্রেরণা যোগায়। ৮ শতকের মধ্যভাগে তারা নিজেদের মধ্য থেকে গোপাল নামক একজনকে রাজা নির্বাচিত করে। জানা যায়, গোপাল দেব-এঁর রাজ্যাভিষেক এবং রাজধানীস্থল ছিল বর্তমান বরেন্দ্র অঞ্চল তথা তৎকালীন পুন্ড্রবর্ধনে। রাজপদ অলকৃত করার পর তিনি অচিরেই সকল অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী ৪শ’ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। গোপালের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র ধর্মপাল সিংহাসনে বসেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে মগধে বিক্রমশীল বিহার এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁ পাহাড়পুরে সুবিশাল সোমপুর বিহার (তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়), জগদ্দল বিহার, আগ্রাদ্বিগুণ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ শাসনামলে পাল রাজাগণ এ ধরনের বেশকিছু গৌরবজনক অবদান রাখলেও দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়। বাংলার ইতিহাসে এটি একটি তমসাচ্ছন্ন ক্রান্তিকাল। রাজা জনগণের স্বার্থ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১১ শতকের শেষ লগ্নে রাজা ২য় মহীপালের সময় এ অবস্থা চরম আকার ধারণ করে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের পাশাপাশি বিদেশী আক্রমণ এক সময় পাল সাম্রাজ্যকে ভঙ্গুর করে ফেলে। বরেন্দ্র অঞ্চলের চাষী কৈবর্ত্যগণ রাজার প্রধান সেনাপতি দিব্যোক কৈবর্তের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহে রাজা পরাজিত এবং নিহত হন। বিদ্রোহীরা বরেন্দ্র দখল করে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে। অবশ্য সন্ধ্যাকর নন্দীর সাহিত্যে দিব্যোককে দস্যু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ সময় বর্তমান নওগাঁ জেলার পতœীতলা উপজেলার দিবর নামক স্থানে একটি জলাশয় খনন করে বিজয়ী কৈবর্ত্য নেতা দিব্যোক একটি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এদেশের মানুষ তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে এদেশের মানুষ।

সংগ্রাম এদেশের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়ানো, জীবনের অপিরহার্য অঙ্গ। এমনি সময় দক্ষিণাত্যের কর্নাট থেকে আসা বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসকরা উপর্যুপরি আক্রমণে উত্তর-পশ্চিম বাংলা থেকে পাল শাসন এবং পূর্ব-দক্ষিণ বাংলা থেকে বর্ম শাসনের অবসান ঘটায়। শুরু হয় শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের ওপর তীব্র শোষন ও অত্যাচার। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, এ সময়কার মানুষের লেকায়ত জীবনধারা ও ধর্মীয় আচারের ওপর বৈষম্যমন্ডিত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিপন্নতার অনূভব থেকে বিক্ষুব্ধ হতে থাকে জনসাধারণ। এ বিক্ষোভের চরম প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় ১৩ শতকের শুরুতে। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে সামান্য কিছু সেনা নিয়ে সেন সাম্রাজ্য দখল করে নেয় বহির্ভারতীয় মুসলমান সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খলজি। প্রতিবাদের পরিবর্তে মুসলিম শাসকদেরকে মুক্তির কান্ডারী ভেবে তাদের এ আগ্রাসনকে স্বাগত জানায় বাংলার মানুষ। প্রথমে মুসলিম শাসকগণ দিল্লীর সুলতানের গভর্নর হয়ে এদেশে আসলেও ক্রমইে তাঁদের অধিকাংশ এদেশের মাটি ও মানুষকে ভালবেসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে নাসির উদ্দিন ইব্রাহীম শাহের সময় থেকে এ স্বাধীনতা স্থিতিশীলতা পায়। এরপর প্রায় ২শ বছর স্বাধীন সুলতানদের শাসনাধীনে কাটে বাংলার রাজনৈতিক পরিমন্ডল।

স্বাধীন সুলতানী শাসন আবসান এদেশের মানুুষের জন্য আরেকটি বিপর্যয় নিয়ে আসে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আফগান শের খান সুর এদেশে আফগান-শাসন প্রতিষ্ঠা করলে এদেশের মানুষ সুলত্নাী আমলের ধারাবাহিক সমৃদ্ধির ধারা থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে। এরপর ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আফগান নরপতি দাউদ কররানী মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হলে এ ভূখন্ড মোগল সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়। বিদেশী মোগলদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখানকার স্থানীয় জমিদারগণ প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বারো ভুঁইয়া নামে খ্যাত বাংলার জমিদারদের এ জোট প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত এদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

মোগল শাসনাধীনের এক পর্যায়ে এখানকার নবাবগণ বাংলার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে সম্মান জানিয়ে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে সচেষ্ট হয়। নবাব মুর্শিদকুলি খান থেকে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন জগৎ শেঠের নীলনক্সা, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ ও ইয়ার লতিফের ষড়যন্ত্র এবং মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রায় ২ শত বছরের অন্ধকার নেমে আসে এদেশের মানুষের জীবনে। শুরু হয় বেনিয়া বৃটিশ শাসন-শোষণে পরাধীনতার নির্মম এক কালো অধ্যায়।

১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশেমের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতায় পরিণত হয় বৃটিশ বণিকরা। শুরু হয় কোম্পানী-শাসন। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড ক্লাইভ বাংলার কোম্পানী গভর্নর হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দ্বৈতশাসন প্রবর্তিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে চরম দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে এদেশের মানুষ। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে কুখ্যাত এ বিপর্যয়ে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যবরণ করে। তবে বিদেশী বেনিয়াদের এসকল অনাচার মুখ বুজে সহ্য করেনি এদেশের মানুষ। অর্ধজাহানের মালিক, বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধর বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হেরে যাবে জেনেও বিদ্রোহ করেছে, জীবন দিয়েছে। আর এ বৃটিশবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে সম্মানিত হয় এ বঙ্গভূখন্ড। বৃটিশ শাসনের পুরো সময়টি এদেশের মানুষের উত্তাল সংগ্রামের সময়, যেমন- সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০- ১৮০০), মাঝি বিদ্রোহ (১৭৬৬-১৭৮৩), সমরেশ গাজীর বিদ্রোহ (১৭৬৭-১৭৬৮, ১৮৪৪-১৮৯০), সন্ধীপের বিদ্রোহ (১৭৬৯, ১৮১৯, ১৮৭০), চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৭০, ১৭৭৯), কৃষক তন্তুবায় বিদ্রোহ (১৭৭০-১৭৮০), গারো বিদ্রোহ (১৭৭৫-১৮০২), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), নীল চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৭৮-১৮০০, ১৮৩০-১৮৪৮, ১৮৫৯-১৮৬১), লবণ চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০৪), রেশম চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩), খাসি বিদ্রোহ (১৭৮৩), বরিশালের বিদ্রোহ (১৭৯২), গঞ্জাম বিদ্রোহ (১৭৯৮), নায়ার বাহিনীর বিদ্রোহ (১৮০৪), খান্দেশের বিদ্রোহ (১৮০৮), জাঠ বিদ্রোহ (১৮০৯), ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহ (১৮১২-১৮৩০), গুজরান বিদ্রোহ (১৮১৩), ভীল বিদ্রোহ (১৮১৮), বুন্দেল খান্দী বিদ্রোহ (১৮২৪), কিটুর বিদ্রোহ (১৮২৪), ভূমিজ বিদ্রোহ (১৮৩২), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩২), নাগা বিদ্রোহ (১৮৩৯), কোলাপুর বিদ্রোহ (১৮৪৪), খোন্ড বিদ্রোহ (১৮৪৬) সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৭), সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৫৭), সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহ (১৮৬১), সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭২-১৮৭৩), রাজশাহীর প্রজা-বিদ্রোহ (১৮৮৩-১৮৮৮), তেভাগার দাবিতে কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪৬-১৯৪৭) প্রভৃতি।

তবে সিপাহী বিদ্রোহ নামে খ্যাত ১৮৫৭ সালে বৃটিশবিরোধী মহাঅভ্যুত্থান ইংরেজ-শাসনের ভিত নড়বড়ে করে তোলে। এরপর দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে নীল বিদ্রোহ। নওগাঁ, রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় নীলচাষীগণ ইংরেজ নীলকরদের নীলকুঠি আক্রমণ করে এবং নীলচাষকে ইচ্ছাধীন চাষযোগ্য ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে বৃহত্তর রাজশাহীর প্রজা বিদ্রোহ (১৮৮৩-১৮৮৮)। ইংরেজ শাসকদের ক্রমবর্ধমান খাজনা-নীতির প্রতিক্রিয়ায় তাদের দোসর স্থানীয় রাজা হরনাথের নিপীড়নের প্রতিবাদে প্রায় ৫ বছর এ আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এভাবেই একের পর এক সচেতন গণজাগরণের কারণে পরাভব মানে বৃটিশ শাসকরা। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই বৃটিশ পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাশ করে এদেশ থেকে তারা বিদায় নেয়। সা¤প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে ২৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৫ আগস্ট জন্ম নেয় ভারত।

ভারত থেকে বিযুক্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান ধর্মের একতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও সে ধর্ম যে কেবল স্বার্থবাদী অভিজাতদের ব্যবহারধর্ম, তা বুঝতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি এই ভূখন্ডের অধিবাসীদের। সেন যুগে ব্রাহ্মণ শাসকদের অত্যাচার থেকে যেমন স্বধর্মের মানুষেরা রক্ষা পায়নি, তেমনি ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষেরাও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অর্জিত সংগ্রামী অভিজ্ঞতা এদেশের মানুষকে আবার প্রাণিত করে নব্য ব্রাহ্মণ্যবাদী পাকিস্তানীদের রুখে দাঁড়াতে। রূখে দাঁড়ায়, রক্ত ও প্রাণ সঁপে দেয়, স্বাধীনতা অর্জন করে এ বঙ্গভূখন্ড, বাংলাদেশ।

কোন মন্তব্য নেই: