মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১১

মুক্তিযুদ্ধে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের ভূমিকা (৩য় ও শেষ পর্ব)

(২য় পর্ব প্রকাশের পর)


পাক-সরকারের কারাগার থেকে শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তির সম্ভাবনা এক সময় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকলে মুুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন দেশের নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে শঙ্কিত হয়ে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতাদের একাংশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে মুজিব বাহিনী নামে প্রায় ৮ হাজার সদস্যসম্বলিত একটি আলাদা বাহিনী গঠন করেন। এ সময় একটি বিশেষ রাজনৈতিক কমান্ডো-বাহিনী হিসেবে মুজিব বাহিনী প্রতিষ্ঠা করায় মস্কোপন্থী কমিউনিস্টগণ ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সহায়তায় ২০ হাজারের অধিক তরুন যুবককে গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে এঁরা ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের রণক্ষেত্রগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা যুদ্ধ ছাড়াও সংবাদ বহন, রেকি করার মতো যুদ্ধে সহায়ক বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া প্রবাসী সরকারের প্রথম বিমান বাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর অভূতপূর্ব সাহসী অপারেশনগুলোতে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের ব্যাপক ভূমিকা বজায় থাকে।

অন্যদিকে পিকিংপন্থী বাম নেতাকর্মীগণ তাঁদের ভিন্নতর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও মুক্তিযুদ্ধে পাক-সরকার কর্তৃক গণহত্যাকে পিকিং বা চীন পরোক্ষভাবে সমর্থন করলে তাঁরা আদর্শিকভাবে বিপর্যস্ত হন। এ নিয়ে পিকিংপন্থী বামদের মধ্যেকার চলমান উপদলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। রাশেদ খান মেনন ও কাজী জাফর আহমদসহ পিকিংপন্থী নেতাদের একাংশ এ সময় ভারতে অবস্থান করে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে একটি বামপন্থী ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করেন। কেননা, চলমান মুক্তিযুদ্ধ রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের স¤প্রসারণবাদী চক্রান্তের ফসল। তাই ভারত-রাশিয়ার সহযোগিতায় আওয়ামীলীগ এ মুক্তিসংগ্রামের ফলাফলকে এ দুটো দেশের হাতেই তুলে দেবে।

এঁদের মধ্যে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা নেতৃত্বাধীন দলটি (পূর্ববাংলা সাম্যবাদী দল) এক সময় চীনা দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেন এবং একইসঙ্গে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-রাশিয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁরা খাঁটি কমিউনিস্ট নেতৃত্বে রামগতি নোয়াখালীতে ১০ হাজারের অধিক সদস্য সম্বলিত লাল গেরিলার মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি অংশ করে মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে তাঁরা যুগপৎ পাকিস্তান বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীকে আক্রমণ করার দুমুখো যুদ্ধ-কৌশল গ্রহণ করেন। এ সময় বেশকিছু শ্রেণীশত্রু খতমের ঘটনাও ঘটে। তবে পাকিস্তানীদের বিপক্ষে এ দলটি বেশ কিছু অপারেশনে সাফল্য অর্জন করলেও পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর অবিশ্বাস ও অসহযোগিতার কারণে তাঁরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

কমরেড মতিন-আলাউদ্দিন নেতৃত্বাধীন দলটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে পাবনা জেলাশহর মুক্ত করার নেতৃত্ব দান করেন। এ সময় তাঁরা স্থানীয় পুলিশ ও জনগণের সহায়তায় শতাধিক পাকসনোকে হত্যা করতে সক্ষম হন। কিন্তু পরবর্তীতে এ দলটি বাংলাদেশ প্রশ্নে চৈনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে, নওগাঁ রাজশাহীর আত্রাই অঞ্চলে পিকিংপন্থী ওহিদুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে পিকিংপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রচলিত দুই ককুরের লড়াই তত্ত্ প্রত্যাখান করেন। তিনি মার্চের গণহত্যা শুরুর আগে থেকেই স্থানীয় স্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গ ও থানা থেকে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে তাঁর সহস্রাধিক রাজনৈতিক সহকর্মীকে অস্ত্র ও যুদ্ধের কলাকৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন আত্রাই অঞ্চলটি ছিল রাজশাহীর বাঘমারা থানার তাহেরপুর থেকে নওগাঁর সরল শিকারপুর পর্যন্ত ৫০ মাইল, নওগাঁর মান্দা থানার প্রসাদপুর থেকে নাটোরের সিংড়া থানার কালিগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৫০ মাইল এবং বগুড়া সান্তাহারের সান্ধিরা গ্রাম থেকে নাটোরের নলডাঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ৫০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ দলে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষারত ছাত্র, স্থানীয় কৃষক-শ্রমিক-মজুর ছাড়াও পুলিশ-আনসার-ইপিআর ও সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ও পালিয়ে আসা সদস্যরা ছিলেন। ওহিদুর রহমান তাঁর যোদ্ধাকর্মীদের নিয়মিত সেনাবাহিনীর আদলে সেকশন, প্লাটুন, কোম্পানী, ব্যাটেলিয়ন পদ্ধতিতে গড়ে তোলেন। সহস্রাধিক সদস্য সম্বলিত এ দলটি মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুুড়ে শত শত পাকসেনা ও রাজাকার হত্যার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত অঞ্চল প্রায় মুক্ত রাখতে সক্ষম হন। মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত পর্যায়ে কিছুকিছু অপারেশনে ওহিদুর বাহিনী ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে অংশগ্রহণ করে এ দেশ মাটি ও মানুষের জন্য বিজয় নিশ্চিত করেন।

আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, চলমান রাজনৈতিক সমস্যাবলী বিশ্লেষণের দূর্বলতা প্রভৃতি যে কারণেই হোক মুক্তিযুদ্ধকালে মানবজাতির প্রাগ্রসর চিন্তাধারার অধিকারী হিসেবে খ্যাত বামপন্থী রাজনীতিকদের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ভ্রান্তির শিকার হয়ে জনবিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনার প্রয়াস পেলেও ব্যতিক্রমবাদে অন্তর্গতভাবে তাঁদের সকলেরই স্বপ্ন ছিল এক শোষণমুক্ত অসা¤প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা। কেননা এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মঙ্গল ও সমৃদ্ধি সম্ভব। (সংক্ষেপিত)


                                                                       *** সমাপ্ত ***

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

ক. মঈদুল হাসান, মূলধারা ’৭১, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ১৯৮৬
খ. নাড়গোপাল ঘোষ, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি ও তার পটভূমি, কল্পনা বক সিন্ডিকেট, নদীয়া, ১৯৯৭
গ. তালুকদার মনিরুজ্জামান, বামপন্থী রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০৭
ঘ. ওহিদুর রহমান, আত্রাইয়ের কৃষক, মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল ও দুই পতাকা (অপ্রকাশিত)
ঙ. আমজাদ হোসেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের রূপরেখা, পড়–য়া, ঢাকা, ১৯৯৭
চ. জাগলুল আলম, বাংলাদেশে বামপন্থী আন্দোলনের গতিধারা ১৯৪৮-১৯৮৯, প্রতীক, ঢাকা, ১৯৯০

সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১১

মুক্তিযুদ্ধে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের ভূমিকা (২য় পর্ব )

(প্রথম প্রকাশের পর)

১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ভারতে বিপুল পরিমান যুদ্ধরসদ সরবরাহ করলে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্কের সুবাদে আইয়ুব খান ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখান পিকিংপন্থীগণ। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে তাঁরা এই আলোকে বিচার করতে গিয়ে এটাকে মার্কিন স্ম্রাাজ্যবাদী চক্রান্তের ফসল হিসেবে নির্ধারণ করেন এবং আইয়ুব খানের বিরোধীতা করাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করার প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করেন। ফলে তাঁরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতিমা জিন্নাহ-র বিরুদ্ধে আইয়ুব খানের পক্ষে কাজ করেন। অথচ আইয়ুব সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিয়েটো, সেন্টো এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রেখেছে, এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এ সরকারের নির্ভরশীলতা রয়েছে। এরপর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন (পিডিএম) গঠন করে সংসদীয় গণতন্ত্র পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হলে পিকিংপন্থীরা নিজেদের এ আন্দোলন থেকে বিরত রাখেন। এমনকি এর আগের বছর ১৯৬৬ সালে আওয়ামীলীগ উপস্থাপিত অত্যন্ত জনপ্রিয় ৬ দফা আন্দোলন থেকেও বিরত থাকেন তাঁরা। তাঁদের মতে, ৬ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের সংখাগরিষ্ট জনগণের- শ্রমিক, কৃষক এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণীর আশা-আকাক্সা প্রতিফলিত হয় নি। তাই এটা কেবল পূর্ব-পাকিস্তানে একচেটিয়া অধিকারীদের একটি নতুন শ্রেণীর জন্ম দিবে। এটা সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে আতাঁতের ফলে সৃষ্ট একটি কর্মসূচী ছাড়া কিছু নয়।

অন্যদিকে বামপন্থীদের আরেক অংশ সোভিয়েত বা মস্কোপন্থী নেতৃবৃন্দ পিকিংপন্থীদের সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার কৌশলকে গ্রহন করেন, যা ক্রমশ সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে। এজন্য তাঁরা আওয়ামীলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের চরম পর্যায়ে ১৯৬৮ সালে মস্কোপন্থীরা সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন এবং আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত যুক্ত থাকেন।

অন্যদিকে, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামীলীগ (ইপিএএল) নেতা শেখ মুজিবর রহমান এ অঞ্চলের প্রধান বিরোধী নেতায় পরিণত হন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবিতে ৬ দফা আন্দোলনের কর্মসূচী হাতে নিলে এদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব আওয়ামীলীগের হাতে চলে আসে। প্রথমদিকে এ আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আন্দোলন হিসেবে প্রকাশ পেলেও ক্রমশ এতে দেশের আপামর জনসাধারণ সম্পৃক্ত হলে অচিরেই আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। ৬ দফা আন্দোলন পরিণত হয় গণমানুষের আন্দোলনে। তবুও আওয়ামলীগের নেতৃত্ব হারানোর ভয় ছিল। কেননা, পরবর্তী গণআন্দোলনগুলোতে বামপন্থী ক্যাডার, ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক ও নিম্নবিত্ত মানুষের এক বৃহৎ অংশ যারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীল চিন্তাধারা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁরা কেবল বাংলার ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, কৃষক-শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠার জন্যেও লড়েছিলেন। তাই আওয়ামীলীগ নেতারা তাঁদের স্বায়ত্বশাসনের অর্থনৈতিক কর্মসূচীতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে এটাকে গণমুক্তির দফা হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলতে সক্ষম হন। অন্যদিকে ষাটের দশক থেকে বামপন্থী দলগুলোর মধ্যেকার মতাদর্শ ও কৌশলে শত্রুতাপূর্ণ কোন্দল ও বিভক্তি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, জনগণ নেতৃত্ব তুলে দেয় আওয়ামীলীগের হাতে, রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রে চলে আসেন শেখ মুজিবর রহমান।

আগেই উল্লিখিত হয়েছে যে, বামপন্থীদের প্রধান দুই উপদলের মধ্যে পিকিংপন্থীগণ শুরু থেকেই আওয়ামী নেতৃত্বাধীন চলমান কর্মসূচী সম্পর্কে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে এ থেকে বিরত থাকেন এবং মস্কোপন্থীগণ প্রাথমিকভাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বনের অংশ হিসেবে আওয়ামীলীগকে সমর্থন করেন এবং সম্পৃক্ত থাকেন। তাঁরা বন্দুকের নল সকল ক্ষমতার উৎস- এ তত্ত্বকে খারিজ করে বিপ্লবী সচেতনতা ও কর্মজীবী মানুষের একতার মধ্য দিয়ে সংসদীয় পন্থায় সমাজতন্ত্র কায়েম করতে সচেষ্ট হন। এজন্য তাঁরা পরবর্তী ১৯৬৯ সালের গণঅথ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। এখানে উল্লেখ্য, ’৬৯-্এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বামপন্থী মওলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সম্মেলনে এবং এর নেতৃত্বের প্রথম সারিতে আওয়ামী লীগের প্রাধান্য থাকলেও মূল সংগঠক ছিলেন কমিউনিস্টগণ। কিন্তু পার্টি নিষিদ্ধ, বিপুল সংখ্যক নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দি ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে পলাতক ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষ ভয় পেতো এ দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে। এজন্যই সাধারণ মানুষ অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী আওয়ামীলীগকে মুসিলিম লীগের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। আওয়ামীলীগ এর ফল পায় পরবর্তী ’৭০-এর নির্বাচনে।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ৭৬.৫ % ভোট পেয়ে ৩০০ প্রাদেশিক আসনের মধ্যে ২৮৮টি এবং জাতীয় পরিষদে ৭২.৬ % ভোট পেয়ে ১৬২ টি আসনের মধ্যে ১৬০ টি আসন লাভ করে। এতে আওয়ামীলীগ প্রাদেশিক পরিষদ নয় পুরো পাকিস্তানে সরকার গঠনের অধিকার লাভ করে। কিন্ত পাক-সরকার নির্বাচনের এ ফলাফল প্রত্যাখান করে উল্টো বলপ্রয়োগ ও হত্যার মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল হাতে নিলে এদেশের মানুষের স্বাধীকার আন্দোলন স্বাধীনতা-সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধে মোড় নেয়। পাক-সরকারের হাতে বন্দি হন এদেশের মানুষের সংগ্রামের নায়ক শেখ মুজিবর রহমান। বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ ও আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ প্রতিবেশী-দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁরা দ্রুত প্রবাসী সরকার গঠন করে জনতার মুক্তিসংগ্রামকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত করার প্রয়াস পান। এ সময় আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র-সজ্জিত পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিপক্ষে কার্যকর যুদ্ধ ও সে যুদ্ধে সাফল্য নিশ্চিত করার লক্ষে ভারতের সহযোগিতায় এক লাখের অধিক মুক্তিকামী জনতাকে গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এসকল গেরিলার একটি বড় অংশ ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং কৃষক-শ্রমিক। প্রাথমিক পর্যায়ে গেরিলা বা মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ তাঁদের নিজ দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের প্রাধান্য বজায় রাখেন। অন্যদিকে, প্রশিক্ষণকামী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আওয়ামীলীগের নীতি অনুযায়ী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত না করার বিধি সত্ত্বেও ভারতে আশ্রয়কৃত বামপন্থী নেতাকর্মী ও সংগঠন তথা মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি, মস্কোপন্থী ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি, কৃষক ইউনিয়ন প্রাথমিক অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিবাহিনীর একটি সহায়ক-শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেন। তাঁরা দেশের বিভিন্ন স্থান এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে প্রায় ১২ হাজার তরুণ-যুবককে (অধিকাংশই অরাজনৈতিক) উদ্বুদ্ধ করে মুক্তিবাহিনীতে পাঠান। এরপর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়লে মুক্তিবাহিনীতে ক্রমান্বয়ে মস্কোপন্থী বামদের প্রায় ৬ হাজার নেতাকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই প্রত্যাশায় সেপ্টেম্বর মাসে মওলানা ভাসানী, মনি সিং, মোজাফ্ফর আহমদ প্রমুখদের নিয়ে প্রবাসী সরকারের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে মস্কোপন্থী নেতৃবৃন্দ বিপুল ভূমিকা রাখেন এ সময়। তাঁরা মার্চের শুরু থেকেই আসন্ন যেকোনো ধরনের পরিস্থিতিতে পাকিস্তানীদের প্রতিহত করার জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে তাঁদের কুচকাওয়াজ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ২৫ মার্চ পাকসেনারা গণহত্যা শুুরু করলে মস্কোপন্থী নেতাকর্মীগণ সম্ভবপর আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য স্বাধীনত্কাামী দল ও ব্যক্তির সহায়তায় বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এরপর সামগ্রিক পিরিস্থিতি বিবেচনায় সংগঠিতভাবে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করতে তাঁরা ভারতে গমণ করেন।

(চলবে..)

মুক্তিযুদ্ধে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের ভূমিকা (১ম পর্ব )

সাতচল্লিশের দেশ ভাগের সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সদস্যদের মধ্যে যাঁরা পাকিস্তান অংশে স্থানু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কেবল একটি বামপন্থী রাজনৈতিক ধারা সারাদেশে প্রবহমান ছিল। ১৯৪৮-এর ২য় কলকাতা কংগ্রেসে পাকিস্তানের জন্য পৃথক কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিপি) গঠন করে সাজ্জদ জহির (সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক) কে মহাসচিব নিযুক্ত করে মতাদর্শিকভাবে বিপ্লবের হিংসাত্বক রণদিপ লাইন গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী কয়েক বছর পূর্ব-পাকিস্তান বা পূর্ব-বাংলার বামপন্থীগণ রণদিপের এ হিট এন্ড হিট কৌশল অনুসরণ করেন। এ পদ্ধতিকে অন্যতম পন্থা হিসেবে অবলম্বন করে এ সময় রেলওয়ে ধর্মঘট, ময়মনসিংহের হাজং বিদ্রোহ, নাচোলের সাঁওতাল বিদ্রোহ প্রভৃতি শোষণ-বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত করার প্রয়াস চলে। এতে সংগ্রামরত কৃষককুল স্থানীয় ও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ইতিবাচক ফল পেলেও যখন পাক-সরকার বামপন্থীদের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় তখন মেহনতী জনতা ও বামপন্থীদের নেতৃত্বের উত্থান অনেকটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ইতোপূর্বে ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের দায়েরকৃত রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় পার্টি-মহাসচিব সাজ্জাদ জহির এবং প্রখ্যাত উর্দূকবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজসহ বেশকিছু নেতৃবৃন্দের বিচার সম্পন্ন হওয়ায় ক্রমশ পার্টির দূর্বল ক্ষমতা প্রকাশ পায়। এ সময় সিপিআই (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) রণদিপ কৌশল বা চরমপন্থা পরিত্যাগ করলে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপি)ও তাদের চলমান পন্থা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এরপর যখন ’৫৪ সালের জুলাই মাসে সরকার সিপিপি (কমিউনিস্ট পার্টি অব পাকিস্তান)-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তখন এপার বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আন্ডার গ্রাউন্ড বা গোপনে চলে যাওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। অন্যদিকে রাজশাহী জেল থিসিস-এ প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান এবং আওয়ামীলীগের কিছু কর্মকান্ডের জন্য কমিউনিস্ট ইনফরমেশন ব্যুরো-র প্রশংসার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের বামপন্থীরা এখানকার জনপ্রিয় সংগঠনগলোর মাধ্যমে প্রকাশ্যে কাজ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হন। পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পূর্ব থেকেই এ নবতর কৌশল অনুসরনে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন অধিকাংশ নেতাকর্মী। এরই অংশ হিসেবে ১৯৫১ সালে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম অঙ্গ-সংগঠন যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমদিকে এ সংগঠনের কর্মচেষ্টা সা¤প্রদায়িক বাতাবরণে সরকার কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের বিরোধীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে সরকার-বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে এ সংগঠনের নেতাকর্মীগণ নিজেদের প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করেন। পরের বছর ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের অ্যাকশন কমিটিতে জোড়ালো ভূমিকা রাখার মধ্যদিয়ে এ আন্দোলনের নেতৃত্বে দান করে। আর তাই ফেব্রয়ারিতে এ আন্দোলন সম্পন্ন হতে না হতেই মার্চের মধ্যে যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের তিন-চতুর্থাংশকে গ্রেফতার করে পাক-সরকার।

১৯৫২ সালের এপ্রিলে কারাগারের বাইরে থাকা যুবলীগের বাকি নেতৃবৃন্দ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপিএমইউ) নামক ছাত্র সংগঠনের জন্ম দেন। প্রধান আদর্শ- অসা¤প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা। অন্যদিকে মূল দল ইপিসিপি-র একাংশ ১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগের মাধ্যমে কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আরেকাংশ এ দলটির সঙ্গে মুসলিম থাকায় তথা সা¤প্রদায়িক আদর্শের আশঙ্কায় ১৯৫৩ সালে হাজী মোহাম্মদ দানেশের সভাপতিত্বে আরেকটি দল গঠন করেন। একই বছরে আওয়ামী মুসলীম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী তাঁর দলে নবাগত বামদের প্রভাবে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেন এবং দলের নির্বাহী কমিটিতে ৯ জন বামপন্থী নেতাকে অন্তভুর্ক্ত করেন। এতে দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বামপন্থীদের প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ সালে পাক-সরকারের বিতর্কিত প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে ভাসানীর সঙ্গে বামপন্থীগণ যুগপৎ আন্দোলন- সংগ্রাম পরিচালনা করেন এবং মুসলীম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর (আওয়ামীলীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি ও গণতন্ত্রী দল) সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। এ যুক্তফ্রন্ট ’৫৪-র নির্বাচনে মুসলীম লীগকে ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত করে। বামপন্থীরা আলাদাভাবে ৪ টি এবং যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে ১৮টি আসন লাভ করেন। এরপর নির্বাচনের কয়েকমাস পরে যুক্তফ্রন্ট বাতিল করা হলে সকল কমিউনিস্ট সংসদ সদস্য আওয়ামীলীগে যোগদান করেন।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের আহবায়ক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কিছু বাস্তবায়নমুখী কর্মসূচীর সঙ্গে বামপন্থী নেতৃবৃন্দ এবং মওলানা ভাসানীর বিরোধ ঘটে। ৫৪’র নির্বাচনী ২১ দফার মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ক্ষমতায় আরোহনের পর সোহরাওয়ার্দী এটা মেনে নিতে আপত্তি করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের মৈত্রীবন্ধন রক্ষা করতে প্রচেষ্টা চালান। অতপর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে এ ইস্যু সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে সমর্থিত হলে ভাসানী দলের নির্বাহী কমিটির ৯ জন বামপন্থী সদস্যকে নিয়ে আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করেন। পরের বছর ১৯৫৭ সালে ভাসানী আহুত উভয় পাকিস্তানের সকল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক দল ও ব্যক্তিবর্গের এক সম্মেলনে ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি (ন্যাপ) নামক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফ্রন্ট গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী এ নতুন দলের জাতীয় ও পূর্ব-পাকিস্তান অংশের সভাপতি।

এ দলটিই পরবর্তীতে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির জনপ্রিয় ফ্রন্টে পরিণত হয় এবং শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন বামপন্থী নেতা এ দলের নির্বাহী কমিটিতে স্থান লাভ করেন। একই বছরের ডিসেম্বর মাস্ েউত্তরবঙ্গে অনুষ্ঠিত এক কৃষক সমাবেশে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি এবং আবদুল হককে সেক্রেটারি করে পূর্ব-পাকিস্তান কৃষক সমিতি গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাবেক যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ তোয়াহাকে সভাপতি করে গঠিত হয় পূর্ব-পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন। এ বছরের অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি হলে আবার বামপন্থীদের ধরপাকড় শুরু হয়। মওলানা ভাসানীসহ বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দ এ সময় গ্রেফতার হন, বাকীরা আত্মগোপনে চলে যান। ১৯৬২ তে নতুন সংবিধান চালুর পর ভাসানী ছাড়া পেলেও বামপন্থীদের আতঙ্ক থেকে যায় ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের দ্বন্ধের প্রভাব এসে আঘাত করে এখানকার বামপন্থীদের। ১৯৬৩-৬৪ সালে এ দ্বন্ধ সামনে চলে আসে; রাশিয়া-চীন, মস্কো-পিকিং। প্রচেষ্টা ১৯৬৩ সাল থেকে শুরু হলেও অবশেষে ১৯৬৬ সালে চীনপন্থি কমিউনিস্টগণ ইপিসিপি ত্যাগ করে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদ- লেনিনবাদ) গঠন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় অচিরেই ইপিসিপির ছাত্র সংগঠন এবং ইপিএনএপি দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পিকিং বা চিনপন্থীদের ভিত্তি- লেনিনের সাম্রাজ্যবাদতত্ত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাওবাদী কৌশল। তাঁরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পাকিস্তানের জনগণের এক নম্বর শত্রু বিবেচনা করেন।

(চলবে...)

বিজয়ের অঙ্গীকার, শাস্তি পাক আদিবাসী রাজাকার

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ত্যাগ ও অংশগ্রহণ ছিল। একইসঙ্গে এদের মধ্যে কতিপয় কুলাঙ্গার পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করে এদেশের স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে প্রয়াস পেয়েছে। তারাই আদিবাসী রাজাকার।

ঔপনিবেশিক শাষক ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে নিয়ে ১৮৮১ সালে একে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে। একাত্তরে এই তিনটি সার্কেলের রাজা ছিলেন যথাক্রমে- ত্রিদিব রায়, অং শৈ প্রু চৌধুরী, মং প্রু চাঁই/ সাইন চৌধুরী। এঁদের মধ্যে মানিকছড়ির মং রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। আর চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানীদের দোসর, যুদ্ধাপরাধী।

পাকিস্তান আমলে পার্বত্য রাঙামাটিতে মুসলীমলীগ রাজা ত্রিদিব রায়, এসটি হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে পাকিস্তানী শোসন-নির্যাতন আর বৈষম্যের পক্ষে রাজনীতি করেছেন। জাতীয় পরিষদে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম-এ রাজা ত্রিদিব রায় এবং ময়মনসিংহে পিডিপি নেতা নুরুল আমিনের আসন ছাড়া বাকি ১৬০টি আসনই লাভ করেছিল। ত্রিদিব রায়ের আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ছিলেন চারু বিকাশ চাকমা।

পাকিস্তানী শাসনামলে পাক-প্রভুদের প্রতি রাজা ত্রিদিব রায়ের যেমন স্বার্থের সম্পর্ক এবং অগাধ আস্থা ছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালেও তিনি পাকিস্তানীদের শক্তিমত্তার প্রতি অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। শরদিন্দু শেখর চাকমা তাঁর মুক্তিযদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রন্থে বলেছেন- "রাজা ত্রিদিব রায় মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে না, যদি ভারত পাকিস্তানকে যদ্ধে পরাস্ত করতে না পারে। আর ভারত পাকিস্তানকে পরাস্ত করতে পারবে না, কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীন এবং আমেরিকা আছে। তারা কোনোদিন পাকিস্তানকে ভারতের কাছে পরাজিত হতে দেবে না।”

তাই রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় থেকেই পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তার সহযোগিতায় রাঙামাটিতে গণহত্যা চলেছে। পাক-পরিবৃত্ত রাঙামাটিতে মুক্ত করতে এগিয়ে আসা দশ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলকে হত্যা করায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এমনকি তার ইন্ধন ও প্রভাবের কারণে ঐকান্তিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক চাকমা তরুণ-যুবক মুক্তিযদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বরং তাদের পাকিস্তানীদের রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি তার সার্কেলের বিভিণœ এলাকায় গিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতেন। চাকমা যুবক তরণদের সংগ্রহ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পানছড়ি প্রর্ভৃতি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানী ক্যাম্পে সরবরাহ করতেন তিনি। এখানে তারা দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সসস্ত্র রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানপন্থী কার্যক্রমে লিপ্ত হতেন।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নামক আকর গ্রন্থের ৯ম খন্ডে জেনারেল মীর শওকত আলী বীরউত্তম বলেছেন- "চাকমা উপজাতিদের হয়ত আমরা সাহায্য পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায় ...”। একইভাবে ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম তাঁর গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ - এ বলেছেন, "চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রথম থেকেই নির্লিপ্ত এবং গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন...।”

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নামক গ্রন্থে জামালউদ্দিন লিখেছেন, "..... অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক-দালালখ্যাত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দিনই (১৬ই এপ্রিল, ১৯৭১) পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী রাঙ্গামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরামুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এই দলের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইফতেখার। ”

ইফতেখার ছিলেন রাঙামাটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের সন্তান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী।তাঁর দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাঙামাটি সদরের এসডিও আবদুল আলী। তিনি ইফতেখারসহ এসএম কালাম, আবদুল শুকুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, শামসুল হক মাস্টারকে নিয়ে একটি স্পিডবোটে চড়ে মহালছড়ি থেকে রাঙামাটি এসেছিলেন। পাকিস্তানিরা এঁদের নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে সে সময়। তারা আবদুল আলীকে রাঙামাটি পুলিশ লাইনের একটি ব্যারাকে আটকে রেখে তাঁর শরীর ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে লবন ছিটিয়ে দিতো এবং পরবর্তীতে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়েছিল।

কিন্তু একাত্তরের নভেম্বর থেকে যখন মক্তিযুদ্ধের গতিপথ ক্রমশ স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে চলতে থাকে, তখনই নিরাশ হয়ে যান ত্রিদিব রায়। চলে যান তার প্রভুদেশ পাকিস্তানে। সেখান থেকে পাকিস্তানের হয়ে দালালি কর্মকান্ড স¤প্রসারণের অংশ হিসেবে মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড প্রভৃতি বৌদ্ধপ্রধান দেশে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান। তবুও যখন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদারদের শেষরক্ষা হলো না, থকন তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশে না এসে পাকিস্তানে থেকে যান। সেখানে পাক-দালল হিসেবে বাংলাদেশীদের মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের পরেই তার স্থান। একাত্তরে তার অসাধারণ ভূমিকারজন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পাকসরকার তাকে সসম্মানে পনর্বাসিত করেছে। পাকিস্তানের হয়ে আর্জেন্টিনা ও শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন রাজা ত্রিদিব রায়। এখন আছেন ফেডারেল মন্ত্রী হিসেবে। সেখানে থেকে তিনি পাকসরকারের সেবা করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে দ্যা ডিপার্টেড ম্যালোডিসহ বিভিন্ন বিতর্কিত প্রকাশনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ত্রিদিব রায়ের মতই আরেকজন যুদ্ধাপরাধী বোমাং সার্কেলের রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী। মক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানীদের সক্রিয় দোসর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। সে সময় তার সঙ্গে তার পরিবার ও স¤প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ পাকিস্তানী-দালাল হিসেবে নেতিবাচক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনিও শুরু থেকেই পাকসরকারের সহযোগী হিসেবে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে মুসলীমলীগের হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী পরিষদে (বন, সমবায় ও মৎস) স্থান লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুতকৃত যুদ্ধপরাধীদের তালিকা ও এ সম্পর্কিত প্রকাশনায় প্রথম সারিতে স্থান রয়েছে এই দুই আদিবাসী রাজার।

অথচ এসব কুলাঙ্গার ব্যক্তিকে একাত্তরে মানবতা-বিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনো প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়নি। বরং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের স্বাধীন বাংলাদেশে এসব যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তিদের বংশধরকে বিভিন্নভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

আর অন্যদিকে, একাত্তরের মক্তিযুদ্ধে নিজের অর্থ, অস্ত্র, শ্রম তথা সর্বস্ব দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মং সার্কেলের রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী। যুদ্ধকালে মানিকছড়ি রাজবাড়িতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজের সংগৃহিত ৩০টি অস্ত্র ও গাড়ি দিয়েছেন, মুজিবনগর সরকারকে নিজের অর্থ-কড়ি দিয়েছেন। এরপর নিজ পরিবার পরিজন নিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে থেকেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং আখাউড়া অপারেশসহ বেশ কয়েকটি অপারেশনে বীরত্বপূর্ন নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। সে সময় তাঁর দক্ষতা ও নিরাপত্তার জন্য ভারত সরকার তাঁকে অনারারি কর্নেল উপাধি দিয়েছিল। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বস্ব হারানো এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ ত্যাগ ও বীরত্বের জন্য কোনো উপাধিও দেওয়া হয়নি।

মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা : মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী

গণহত্যার ইতিহাসে স্বল্পতম সময়ে সর্বাধিক মানুষ নিহত হয়েছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কর্তৃক গণহত্যায়। কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল এদেশের আপামর জনসাধারণ; এদেশের বাঙালি ছাড়াও অর্ধশতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, যারা কখনো আদিবাসী, কখনো উপজাতি, কখনো ুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন অভিধায় অভিহিত। অস্তিত্বে জড়িয়ে থাকা, চেতনায় মিশে থাকা প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে ইতিহাসের অধ্যায়ে অধ্যায়ে সংগ্রামী মহাকাব্যের এ স্রষ্টারাই ভারতবর্ষে বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে ১ম বিদ্রোহ করেছিল। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০- ১৮০০), গারো বিদ্রোহ (১৭৭৫-১৮০২), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), খাসি বিদ্রোহ (১৭৮৩), ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহ (১৮১২-১৮৩০), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৭), মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৫৭), তেভাগা বিদ্রোহ (১৯৪৬-১৯৪৭), টংক বিদ্রোহ, নাচোল বিদ্রোহ প্রভৃতির পথ ধরেই তাঁদের সমুখে আসে মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১)।

এ মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর বাঙালি জাতির পাশাপাশি রক্ত ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সনাতনসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত সমরদক্ষ পাকিস্তানী সেনাদের সমুখে দাঁড়িয়েছে বাঙালি ছাড়াও অর্ধ-শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ- সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, মুরং, ত্রিপুরা, গারো, হাজং প্রভৃতি।

উপমহাদেশের বিদ্রোহ-সংগ্রামের ইতিহাসে সমুজ্জল সাঁওতালদের বাংলাদেশে বসতি উত্তরবঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে। উত্তরবঙ্গে পাকিস্তানীদের প্রধান ঘাঁটি রংপুর ক্যান্টনমেন্টে ছিল ২৩তম ব্রিগেড হেড-কোয়ার্টার। ২৩ মার্চ পাকিস্তানি লে. আব্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুরসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। হিন্দু বিবেচনা করে পার্শ্ববর্তী সাঁওতাল গ্রামগুলোতে চালায় অত্যাচারের স্টীমরোলার। এ পরিস্থিতিতে দা-কুড়াল, তীর-ধনুকের মতো আদিম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রংপুর সেনানিবাস আক্রমণের মতো দুঃসাহসিক কাজে এগিয়ে আসে সাঁওতালরা। ২৮ মার্চ হাজার হাজার বিুব্ধ বাঙালি ও আদিবাসী সকাল ১১ টায় ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হয়। গোপন চর মারফত আগেভাগেই ঘেরাও-এর কথা জেনে যাওয়া পাকিস্তানীরা রাতেই সেখানকার বাঙালি অফিসার ও সেনাদের বন্দি করে এবং ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলার প্রস্ততি নেয়। পদব্রজে সহস্র মানুষের অগ্রগামী স্রোত দেখে পাশবিক আক্রোশে গর্জে ওঠে তাদের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। শত শত বাঙালি ও আদিবাসীর রক্তে রক্ত-বর্ণ হয়ে যায় ঘাঘট নদীর জল। এদেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় ৩০ হাজার সাঁওতাল। তিনশ’রও বেশি সাঁওতাল কেবল রংপুর থেকেই প্রত্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দিনাজপুরের ওরাওঁ ও সাঁওতাল মিলে প্রায় ১০০০ জনের একটি বিশাল মুক্তিবাহিনী ঐ এলাকায় অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করে। একইভাবে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, নেত্রকোণার গারো-হাজং-কোচ-ডালু প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫০০ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সাঁওতালদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা যোাগান সাঁওতালনেতা সাগরাম মাঝি। গোদাগাড়ি রাজশাহীর বিশ্বনাথ টুডু ছিলেন প্লাটুন কমান্ডার। মক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় সাঁওতাল খ্রিষ্টান যাজক ফাদার লুকাশ মারান্ডিকে, রাজশাহীর কাশিঘুটুতে ১১ জনকে এবং রংপুরের উপকণ্ঠে ২০০ জন সাঁওতালকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নির্মম লৈঙ্গিক নির্যাতন করা হয় গোদাগাড়ির আদাড়পাড়া গ্রামের মালতী টুডুসহ বেশ কয়েকজন নারীকে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধপর্বেই মণিপুরী-অধ্যুষিত মৌলভিবাজারের ভানুগাছ, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, ছাতকের কোম্পানিগঞ্জ ও সিলেটে পাকসেনারা নৃশংসভাবে হত্যা করে নিরপরাধ ছাত্র, যুবা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে। আদিম লালসার শিকার হয় অসংখ্য মণিপুরী নারী। ১২ আগস্ট মৌলভীবাজারের ভানুবিলের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ব্রাহ্মণ সার্বভৌম শর্মাকে হত্যা করা হয়। নিহত হন মাধবপুর গ্রামের গিরীন্দ্র সিংহ, গিরীন্দ্র সিংহ প্রমুখ। এভাবে মৌলভীবাজার, কুলাউড়া, বড়লেখা, চুনারুঘাট, মাধবপুর, বৈকুণ্ঠপুর, গোয়াইনঘাট, হবিগঞ্জের কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, সিলেট সদর ও ফেষ্ণুগঞ্জ থানার ৮৩ টি বাগান এলাকার আদিবাসী চা-জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৬০২ জনকে হত্যা করে। কামারছড়ায় পাকসেনাদের ক্যাম্পে বাংকার খনন ও জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্যে পালাক্রমে স্বেচ্ছাশ্রমে বাধ্য করা হত ভানুবিলের প্রতিটি মণিপুরীকে। জঙ্গলে কাজ করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৃষ্ণ কুমার সিংহ, কুলেশ্বর সিংহসহ বেশ কয়েকজন আদিবাসী যুবক পালিয়ে ভারত গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। কেবল গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধ নয়, শব্দশিল্প, চিত্রশিল্প, নৃত্যশিল্প প্রভৃতির মধ্যদিয়েও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেছেন অনিতা সিংহ, সাধন সিংহ, বানী সিনহা প্রমুখ। নন্দেশ্বর সিংহ, বিজয় সিংহ প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক কয়েকশত মুক্তিসেনার বাহিনী গড়ে তুলতে অসীম ভূমিকা রাখেন।

বর্মিদের অত্যাচারে সবকিছু হারিয়ে এদেশে স্থিতু হয়েছিল রাখাইনরা। অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা হারানোর বেদনা, চেতনায় পরাধীনতা থেকে মুক্তির আকাক্সা। সেই আকাক্সার বশেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্ব রাখেন অসংখ্য রাখাইন। তেমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য বীরযোদ্ধাÑ কক্সবাজারের উ-মংয়াইন, উ-ক্যহাচিং, পটুয়াখালী-বরগুনার উ-উসিটমং, রামুর মংয়াইন, মহেশখালীর মংহা প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধকালে রাখাইনদের কেউ কেউ নিজেদের ‘চায়না বৌদ্ধ’ পরিচয় দিয়ে রক্ষা পেলেও পাকিস্তানি নৃশংসতায় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল অধিকাংশ রাখাইন জনপদ। মে মাসে মহেশখালীর ঠাকুরতলা বৌদ্ধ বিহারে পাকসেনারা অনুপ্রবেশ করে বিনা অপরাধে বিহারের মহাথেরো উ-তেজিন্দাসহ ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে। বৌদ্ধ বিহারের ৬২টি রৌপ্য মূর্তি লুণ্ঠন ও কয়েকটি শ্বেত পাথরের মূর্তি ধ্বংস করে। দণি রাখাইন পাড়ার বৌদ্ধ বিহারের সেবায় নিয়োজিত তিনজন নিরপরাধ রাখাইনকে আগুণে পুড়ে হত্যা করে।

অন্যদিকে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় একাত্তরে পাকিস্তানীদের পক্ষ নিয়ে কাজ করায় সকল চাকমাদের ঢালাওভাবে পাকিস্তানের দালাল বলা হয়। পাকিস্তানপর্বে এদেরকে ভারতপন্থী, আবার ’৭১ ও পরবর্তীপর্বে বলা হয় পাকিস্তানপন্থী। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন রকম। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চাকমারা। ১ লক্ষ চাকমা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তাদের মধ্যে পাকসরকারের প্রতি ক্ষোভ ছিল সহজাত। তাই চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ’৭১-এ পাকিস্তানের প নিলেও চাকমা রাজ পরিবারের অন্যতম সদস্য কে. কে রায় মুক্তিযুদ্ধের সপে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। প্রখ্যাত চাকমা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার নেতৃত্বে সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রস্তুতি নিয়েছিল অসংখ্য চাকমা ছাত্র ও যুবক। তাঁদের ভাষ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক এইচ.টি.ইমাম এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা সাইদুর রহমানের ষড়যন্ত্রে চাকমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এর অনেক প্রামাণ্য উদাহরণের মধ্যে উল্লেখ্য- রসময় চাকমা, তাতিন্দ্রলাল চাকমা প্রমুখ। প্রশিক্ষণের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত গিয়েও বিফল মনোরথে ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁদের। সঙ্গে ছিলেন আরও অনেক আদিবাসী তরুণ যুুবক। যুদ্ধে অংশ নিতে না পেরে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের সনাতন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সুযোগ বুঝে বিচ্ছিন্নভাবে পাকিস্তানীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন এবং অন্যদিকে কেউ কেউ হতাশ হয়ে পাকিস্তানীদের ইন্ধনে রাজাকার বাহিনীতে নিযুক্ত হয়েছেন। অথচ পরবর্তী সময়ে এ কতিপয় চাকমা রাজাকারের জন্য নির্মম মাশুল দিতে হয়েছে আপামর চাকমা জনগোষ্ঠীকে।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়োত্তর অব্যাহতিকালেই মুক্তিযোদ্ধা নামধারী কতিপয় দল চাকমাপ্রধান কুকিছড়া, পানছড়ি, কানুনগোপাড়ায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যা ও লুটপাটের মহোৎসব চালায়। খাগড়াছড়ি মাটিরাঙ্গার আসালং, বড়বিল, তাইন্দ্যং এবং তবলছড়ি মৌড়ার গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষে যে দলটি মাটিরাঙ্গা হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে, সে দলটি পানছড়ি এবং দীঘিনালার বেশ কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং কিছুসংখ্যক আদিবাসীকে হত্যা করে। আবার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যেসকল চাকমা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁদের প্রতি পরবর্তীতে শীতল আচরণ করা হয়। যুদ্ধকালীন বীরত্বের স্বীকৃতির রেকর্ড অনুযায়ী ৩ জন চাকমা মুক্তিযোদ্ধাকে বিধান মোতাবেক খেতাবে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও, পরবর্তীতে তা অকার্যকর রয়ে যায়।

খাগড়াছড়ি মং রাজা মং প্রু সেইন সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যুদ্ধকালে মানিকছড়ি রাজবাড়িতে আশ্রয়শিবির এবং ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মুজিবনগর সরকারকে অর্থ-সহায়তা ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিজের কয়েকটি গাড়ি এবং ত্রিশটির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদান করেছেন। এরপর তিনি ত্রিপুরার সাব্রুম এবং সেখান থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে রূপাইছড়ি শরণার্থী-শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের কাজে নিয়োজিত হন। এরপর নিরাপত্তার খাতিরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে আগরতলায় পাঠিয়ে অনারারি কর্নেল উপাধি দেয়। এসময় তিনি আখাউড়া অপারেশনসহ বেশ কয়েকটি সফল অপারেশনে পুরোভাগে থেকে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেন।

অথচ সংবিধানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার মতই মক্তিযুদ্ধে তাঁদের ত্যাগ ও অবদানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকগণ এড়িয়ে গেছেন মুক্তিযুদ্ধের এ সাহসী উপাদানগুলো। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার আকড়গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ১৫ খন্ডের দলিলপত্রে উল্লেখ নেই এঁদের অবদানগাঁথা। এমনকি বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ইতিহাস গ্রন্থের মর্যাদা লাভকারী মূলধারা ’৭১ (মঈদুল হাসান) এও আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান ঊপেক্ষিত।

ইউ কে চিং মারমা বীরবিক্রম : বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা

পাঁচ হাজার বছরের দালিলিক(জবপড়ৎফবফ) ইতিহাসসমৃদ্ধ সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী গাঙ্গেয় নিম্ন অববাহিকা আমাদের বঙ্গ ভূখন্ড, অধুনা স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ। ভারত বার্মা আর বঙ্গোপসাগরের বেষ্টনে লাল-সবুজের স্বাধীন-সার্বভৌম এই বাংলাদেশের সপ্রতিভ অবস্থান। যুগে যুগে যোজন যোজন দূর থেকে আগত মনীষীরা পাগল হয়েছেন এর প্রকৃতির প্রেমে, পাগল হয়েছেন নৃতাত্ত্বিকরা এর বৈচিত্র্যময় বিন্যাসে। অন্যদিকে এর সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনায় লালায়িত হয়েছে লোভিরা, লুন্ঠনে লুন্ঠনে র্জজর করেছে অসংখ্যবার। যখন নিতান্তই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তখনই প্রতিবাদী হয়েছে এদশের সহজ সরল মানুষ, অসীম ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম দিয়েছে এক একটি মহাকাব্যের। পৃথিবীর ইতিহাসগ্রন্থে স্বর্ণের হরফে লেখা তেমনি এক মহাকাব্যের নাম ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ। মহান সেই যুদ্ধে এদেশের মানুষ তাদের রক্তের নদী বেয়ে নিয়ে এসেছে স্বাধীনতার সাম্পান। আর এত অল্প সময়ে এত বড় অর্জন সম্ভব হয়েছিল সেই সংগ্রামে দেশের আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততার কারনেই। সম্পৃক্ততা ছিল এদেশের বাঙালি ভিন্ন আরও অর্ধশত জনগোষ্ঠীর, যারা আমাদের মূলস্রোতেরই অংশ, এই দেশের আদিবাসী স¤প্রদায়। এক প্রাথমিক হিসেবে জানা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আদিবাসীর সংখ্যা কয়েক সহস্র। যুদ্ধে শহীদ আদিবাসীর সংখ্যা শত শত। সংখ্যাহীন এমন অনেক আদিবাসী যোদ্ধা রয়েছেন যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব রেখে এদেশের বিজয়কে অনুকূলে এনে দিয়েছেন। অথচ স্বাধীন দেশের ক্রমাগত নিগ্রহ, বঞ্চনা ও অ¯¦ীকৃতি তাদের অনেককে আজ দেশান্তরিত হতে বাধ্য করেছে, কুন্ঠিত করছে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিতে। তেমনি এক অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বীর মুক্তিযোদ্ধা আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একমাত্র বীববিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত ইউ কে চিং মারমা।

'মুক্তিযোদ্ধা ইউ কে চিং বীরবিক্রম’ পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ৪৩টি আদিবাসী বা অবাঙালী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত বীরসেনার নাম। জš§ ১৯৩৭ বান্দরবান পার্বত্য জেলার সদর থানার লাঙ্গিপাড়া গ্রামে। মাতা হƒাংসাউ আর পিতা বাউসাউ মারমা। স্থানীয় বোমাং রাজা পরিচালিত স্কুলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করে ইউ কে চিং ১৯৫২ সালে ভর্তি হন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স(ইপিআর)-য়ে। দীর্ঘ ৩০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ১৯৮২ সালে অবসর নেন হাবিলদার মেজর হিসেবে। বর্তমানে তিনি তাঁর জন্মস্থান লাঙ্গিপাড়ায় অবসরজীবন যাপন করছেন। ‘আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা' শীর্ষক শিরোনামে পরিচালিত একটি গবেষণাকর্মকান্ডের অংশ হিসেবে আমরা সারাদেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাাৎ করি। সাাৎ করি ইউ কে চিং মারমার সাথে পাহাড়ের দীর্ঘ প্রান্তদেশ পেরিয়ে গত জুন মাসের একটি দিনে, তাঁর প্রান্তিক বসতভিটায়। চারিদিকের আরণ্যক আবহে আবিষ্ট ইউ কে চিং এর নড়বড়ে ঘরটিতে ঝোলানো ছিল তাঁর যৌবন ও যুদ্ধকালীন কিছু অস্পষ্ট ছবি। কেবল স্পষ্ট তাঁর কন্ঠস্বর, প্রানবন্ত তাঁর হাসি। সেদিনের সেই অন্তরঙ্গ আলাপে তিনি অকৃপনভাবে উšে§াচন করেছিলেন তাঁর জীবন ও যুদ্ধের অনেক অনুল্লিখিত কথা। নানাবিধ নিগ্রহে নিপতিত একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত আদিবাসী এই যোদ্ধা নিজেকে একরকম আড়াল করেই রেখেছেন। আড়ালে রয়েছি আামরাও তাঁর কাছ থেকে বহুদিন।

‘ইপিআর’- যে জীবন অন্য জীবন
প্রশ্ন: পাহাড়ের কোলে কেমন কাটতো জীবনের প্রথম বেলা?

উত্তর: নিজের লোকালয়ের পাহাড়গুলোকে ভালবাসতে গিয়ে ভালবেসে ফেলেছিলাম পৃথিবীর সব পাহাড়মাতাকে। বুঝতে না পারার মতো ছোট যখন তখন ভাবতাম- আমার আর আমাদের জন্ম বুঝি বা ঐ পাহাড়কোল ফুঁড়েই। তাইতো তারা মানুষদের আশ্রয় দেয়, আহার দেয়। সত্যিই বুঝতে পারার মতো সময়ের অনেকটা পেরুনোর পর ভাবতে পারতাম না পাহাড় ছেড়ে আমি পালাতে পারব।

প্রশ্ন: কিন্তু শেষপর্যন্ত পালাতে পারলেন কী করে?

উত্তর: স্বভাবতই প্রকৃতিতে আমি ছিলাম এক আদর্শ দুষ্টু ছেলে। পড়াশোনা কিছুটা করেই তাতে ান্ত দিয়েছিলাম। সবছেড়ে ছন্নছাড়া আমি কাজের চেয়ে অকাজেই লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতাম। সেই দশা থেকে মুক্ত করার জন্যে আমার এক ভগ্নিপতি আমাকে জোর করে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ইপিআর-এ ভর্তি করে দেন। এটাকে পালানো না বলা গেলেও এ্টাই ছিল পলায়ন প্রক্রিয়ার শুরুর পর্ব। কেননা, কিছু দিন গত হতেই আমি আমার প্রাচীন সংস্কারকে এড়াতে পেরেছিলাম।

প্রশ্ন: ইপিআর-এ যোগ দেবার পর প্রথমজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর: আমি তখন নিতান্তই এক পাহাড়ি কিশোর। ভেতরে সর্বদা ভয় ভয়। আমার জš§স্থান বান্দরবানে থাকাকালে সমতলের মানুষদের সঙ্গে তেমন করে মেশার অভিজ্ঞতাও তেমন ছিল না। তাছাড়া, আমি পাহাড়ি, আমাদের খাদ্যাভাসও আলাদা। খাবারের সময়গুলো পাহাড়ি সমাজে খুব তাড়াতাড়ি পার হয়ে যায়। প্রথম দিকে এসব ব্যাপারে অনভ্যাসহেতু কিছু সংকোচ ও সমস্যা মানসিকভাবে পীড়া দিত বৈকি! কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা অচিরেই কাটিয়ে উঠতে সম হই ট্রেনিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ায়। ট্রেনিংয়ে শেখানো কৌশলগুলো ও শরীরগঠন করার পদ্ধতিগুলো আমার কাছে মজার কোনো খেলার মতোই মনে হয়েছে। কারণ, আমি পাহাড়ি ছেলে, পাহাড়িদের জীবন আরো অনেক কঠিন ও কৌশলময়। তাই আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে সম হতাম। এমনকি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ১৯৭১ সালে এবং অন্যান্য সময়ে বিভিল্পু দলকে ট্রেনিং দেওয়ারকালে আমি আমার শিা ও অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে দেখেছি। আমার অধীনস্থরা সেগুলো ভালোভাবেই গ্রহণ এবং প্রায়োগ করতে পেরেছে।

মুক্তির মহানযুদ্ধে
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি কোথায় অবস্থান করেছিলেন?

উত্তর: তখন আমি রংপুরের হাতিবান্ধায় ইপিআর-এর বর্ডার আউটপোস্টে নায়েক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। যুদ্ধ শুরু হলে আমাকে হাবিলদার পদে উন্নীত করা হয়।

প্রশ্ন: সে সময়ে আপনি উল্লেখযোগ্য কোন্ কোন্ অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন?

উত্তর: আমার অধীনস্থ দলে ৬৫ জন সৈনিক ছিল। আমি তাদের নিয়ে রংপুর, লালমনিরহাট, পাখিউড়া, কাউয়াহাগা, বাঘবান্ধা, হাতিবান্ধা, চৌধুরীহাট, ভুরুঙ্গামারী, কুলাঘাট প্রভৃতি অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।

প্রশ্ন: এবার এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো অপারেশনের বর্ণনা করুন।

উত্তর: কাউয়াহাগার অপারেশন দিয়ে শুরু করা যায়। যুদ্ধ দেশব্যাপি বিস্তৃত হয়েছে কিছুদিন হল। লালমনিরহাট নদীটির ওপারে আমরা একদিন দেখতে পেলাম আগুন জ্বলছে। আমার সঙ্গে গার্ড হিসেবে ছিল দু’জন সেপাই। ওদের বললাম, কোনো ফায়ার-টায়ার করার দরকার নেই, শুধু দেখতে থাকো। এর আগে অবশ্য আমরা ওখানে অ্যামবুশ করেছিলাম। এক সময় দেখলাম, দু’জন পাকিস্তানি প্যান্ট-শার্ট কোজ করে শাড়ি পরে ঘরে ঢুকছে। ভাবলাম, যদি গুলি করি তাহলে হয়তো মারা যাবে, নয়তো পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওদের জীবিত ধরতে হবে নয়তো জানা যাবে না মূল ঘটনাটা। তাই ওদের দু’জনকে জীবিত ধরে আনার জন্য ৪ জনকে পাঠালাম, সঙ্গে গরু বাঁধার দড়ি। বলে দিলাম, যদি ঘরে দুটি দরজা থাকে তাহলে দুই দরজায় দু’জন দাঁড়াবে আর দু’জন ঘরে ঢুকবে। আর যদি একটি দরজা থাকে তাহলে দু’জন দরজায় দাঁড়াবে, আর দু’জন ঘরে ঢুকবে। যেই কথা সেই কাজ। কিন্তু একজন তবুও পালিয়ে গেল, আর একজন জীবিত ধরা পড়ল। ওটা ছিল একজন পাঞ্জাবি সেনা। সেনাটিকে ধরে এনে গাছের সঙ্গে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলোÑকি জন্য ছ™§বেশ ধরেছে, তার দলের নেতা কে? দলের কে কোথায় আছে ইত্যাদি। সে সবই বলে দিয়েছিল। কারণ, তাকে বলা হয়েছিল যে সে বাঁচতে চায়, নাকি মরতে চায়! যদি বাঁচতে চায় তাহলে আমাদের সব কথা শুনতে হবে, আর মরতে চাইলে এখনই তাকে বেয়নেট চার্জ করা হবে। তাই সে বাঁচার জন্য সবই বলে দিয়েছিল।

সারা রাত আগুন জ্বলল নদীর ওপারের গ্রামটায়। তবুও আমরা রাতে কোনো ফায়ার ওপেন করলাম না। কারণ, জানতে পেরেছিলাম পাকিস্তানিদের কেউই আর ওখানে নেই। তাই আমি রাতে সেনাটাকে ভারতীয় ফোর্সের কাছে পৌঁছে দিতে যাই। অবশ্য ওকে বাঁচিয়ে রাখার বিরুদ্ধে আমার দলের অনেক সেনা আপত্তি তুলেছিল। আমি তখন ঠাণ্ডা মাথায় তাদের বুঝিয়ে বলেছিলামÑ ওকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের স্বার্থেই। তাছাড়া পাকিস্তানিদের হাতে আমাদের দেশের অনেক মানুষ বন্দি হয়ে আছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও ওদের জেলে বন্দি। ওকে আমরা তখনই ফিরিয়ে দেব যখন ওরা আমাদের কমপে ২০-২৫ জনকে ফিরিয়ে দেবে। তাই রাতেই আমি পাঞ্জাবি সেনাটিকে ভারতীয় ফোর্সের কাছে হ্যান্ডওভার করে আসি। ওকে পৌঁছে দিয়ে এসে আমি আমার দু’জন সেনা নিয়ে আবার নদীর ঘাটে গেলাম। কান পেতে শুনলাম, মহিলা ও বাচ্চাদের কান্না শোনা যাচ্ছে। সেপাইরাও শুনল। সারা গ্রাম তো পুড়ে ছাই, বাচ্চারা আসল কীভাবে? তাড়াতাড়ি করে মাঝিকে খুঁজে বের করে এনে বললাম, নদীর ওপারে গিয়ে তোমাকে জানতে হবে কারা ওখানে কাঁদছে, কেনইবা কাঁদছে! মাঝি তো ভয়ে অস্থির। কারণ, ওখানে পাকিস্তানিরা থাকতে পারে। যাই হোক, তাকে অভয় দিয়ে পাঠালাম নদীর ওপারে। ফিরে এসে সে বলল, স্যার ওপারে কোনো পাকিস্তানি নাই, অনেক মহিলা আর বাচ্চা বালির মধ্যে গর্ত করে বসে বসে কাঁদছে। তাকে বললাম, যে করেই হোক ওদেরকে এপারে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। মাঝিকে বললাম, তুমি গিয়ে বলো যে, মুক্তিফৌজের হাবিলদার সাহেব আপনাদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন। এভাবে ৬টি পে দিয়ে ৩২ জন মহিলা আর তাদের সন্তানগুলোকে নদী পার করে এনে গ্রামের স্কুলে নিয়ে ওঠালাম। গ্রামের মাতুব্বর, স্কুলের শিকদের ডেকে সব বাড়ি থেকে কাঁথা, শাড়ি, চাল, ডাল তুলে ওদের সব কিছুর ব্যবস্থা করলাম। এরপর ওদের সবার নাম রেজি¯িট্র করে ক্যা¤েপ পৌঁছে দিয়ে এসে আবার নদীর ওপারে গেলাম আমার দল নিয়ে। তার আগে অবশ্য নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে ওখানে কোনো পাকিস্তানি নেই। গিয়ে দেখি কোনো জীবিত প্রাণীর অস্তিত্ব নেই সেখানে। কেবলি আগুনে পুড়ে যাওয়া কালো কালো ছাইয়ের স্তুপ। এর মধ্যে আমাদের দেখে কচু েেতর মাঝ থেকে একজন বুড়ো আর একটি বাচ্চা বেরিয়ে এলো। ওরা দু’জন গোপনে লুকিয়ে ছিল। তাদের কাছ থেকে শুনলাম, যত বাঙালি পুরুষ ছিল, সবাইকে ব্রাশ করে মেরে ঘরের চাল তাদের উপরে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে পাকসেনারা। ওদের কথামত টিনগুলো উঁচু করে দেখি সেই বিভৎস দৃশ্য। কাউকে চেনার উপায় নেই, কেবলি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া মাংসের কালো কালো স্তুপ। ওই অবস্থায়ই গর্ত করে তাতে দু’জন দু’জন করে সমাহিত করে আমরা আমাদের ব্যারাকে ফিরে আসি। আমার স্মরণে এটা ছিল এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।

প্রশ্ন: একজন স্বাধীনতাকামী যোদ্ধার কাছে নিঃসন্দেহে এটা একটা দুর্বিষহ স্মৃতি। এরকম কি আরও ঘটেছে?

উত্তর: এরকম অসংখ্য অঘটনের জন্ম দিয়েছে ঐ বেজন্মা পাকিস্তানিরা। আমার আরও মনে পরছেÑ যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে আমি তখন রংপুরে অবস্থানরত। এক সকালে সঙ্গে কয়েকজন সেপাই নিয়ে গেলাম শহরের পাশে। সেখানে একটি ছোট ব্রিজ ছিল। দেখলাম ব্রিজের নিচে অনেক চাটাই স্তুপ করা। সঙ্গীদের নিয়ে একে একে ৭টি চাটাই তুললাম। চাটাই তুলে যা দেখলাম তা বলতে আজও আমি শিহরিত হই। সেই বীভৎস দৃশ্য ভোলার নয়Ñ প্রতিটি চাটাইর নিচে রক্তে ভেজা ত-বিত মানুষের লাশ। সব লাশই ছিল মেয়েদের। হাতে ঘড়ি, পায়ে জুতা দেখে বুঝলাম স্কুল-কলেজের ছাত্রী। চেহারা দেখে চেনার কোনো উপায়ই ছিল না। কারণ, সবারই মুখের আর বুকের মাংস খুবলে নিয়েছে পাকিস্তানি শয়তানের বাচ্চারা। পাশর্^বর্তী আরেকটি ব্রিজের নিচে দেখলাম কচুরিপানাগুলো কেমন যেন এলোমেলো। সন্দেহ জাগায় সেনাদের বললাম কচুরিপানাগুলো তুলে দেখতে। সেই একই দৃশ্যের অবতারণা হলোÑ বাঙালি নারীদের বিভৎস মৃতদেহ। কারোই শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আস্ত নেই। খুবলে খেয়েছে জনমুধার্ত হানাদাররা। হাতের ঘড়ি, পায়ের জুতা, আঙ্গুলের আংটি সবই ঠিক আছে, শুধু দেহটা যেন শকুনের পাল্লায় পড়া মৃতগরুর। মেয়েদের লাশগুলো তুলে এনে সারা শহরে মাইকিং করলাম যে, এরকম মেয়ে কারো আছে কিনা, বা ছিল কিনা। কেউই সাড়া দিল না, তাই রংপুর টাউন হলের পাশে ওদের একত্রে দাফন করি। এর কয়েকদিন পর আবার হাঁটতে হাঁটতে অবস্থা পর্যবেণ করার সময় একদিন দেখলাম কাঁচা মাটির তৈরি হালকা উঁচু ঢিবি। কেমন যেন সন্দেহ হলো আমার। সেপাইদের বললাম, মাটির উপর ঘা দিয়ে দেখতে। ওরা ঘা দিয়ে দেখল নরম নরম লাগে। মাটি খুঁড়তে বললাম ওদের। দেখতে পেলাম ২টি করে লাশ একেকটি গর্তে হাত-পাত বাঁধা। এরকম ৩-৪টি গর্ত খুঁড়লামÑ একই অবস্থা। লাশগুলোর চেহারা দেখে বুঝলাম ওরা হয়তো উচ্চবিত্তস¤পন্ন পরিবারের মানুষ ছিলেন। আর না খুঁড়ে সেনাদের বললাম, পুনরায় মাটি চাপা দিয়ে রাখতে, অনর্থক মৃতদের কষ্ট দিলে পাপ হবে।

প্রশ্ন: অন্য কোনো এলাকায়?

উত্তর: এছাড়াও দিনাজপুর এলাকায় দেখেছিলাম বিহারিদের অকথ্য নৃশংসতা। ওরা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে পানির মধ্যে চুবিয়ে মারত। প্রথমে গলার উপরে পা দিয়ে পানির মধ্যে চেপে ধরে রাখত। যখন বাচ্চাগুলোর আর ছোট ছোট শরীর নড়াচড়া করত না, ঠিক তখনই ছেড়ে দিত। অর্থাৎ মরে যাওয়ার পর ছেড়ে দিত পানির মধ্যে। এভাবে অসংখ্য শিশুকে মেরেছে বিহারিরা। এই বিহারিরাই আবার কোথাও নদীর ধারে নারীদের লল্ফ^া লাইন করে দাঁড় করিয়ে ইচ্ছেমত বেঘোরে পেটাত। যখন মহিলারা অজ্ঞান হয়ে যেত বা মারা যেত তখন ধাক্কা মেরে নদীতে ফেলে দিত। এমনি করে নৃশংসভাবে অসংখ্য মহিলাকে খুন করেছে বিহারিরা।

প্রশ্ন: কোনো প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলেন কি এইসব ঘটনার?

উত্তর: হ্যাঁ পেরেছিলাম। একবার দিনাজপুরেই স্বামী-স্ত্রী আর দু’টি মেয়ে মোট ৪ জন বিহারিকে ধরলাম। ১টি মেয়ে কাস সিক্সে পড়ত, আরেকটি কাস নাইনে। খুবই মায়াবী চেহারার মেয়ে দু’টো। আমাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে স্বামী-স্ত্রী অনেক কান্নাকাটি করে বলল, আল্লাহরওয়াস্তে আমাদের বড় মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখুন। ওকে আপনারা বিয়ে করতে পারেন, সে খুবই ভালো মেয়ে। আমাদের তিন জনের জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার এ মেয়েটিকে বাঁচান। আমার স্মৃতিতে তখন ভাসছে পাকিস্তানিদের নৃশংসতার দৃশ্য। তাই কান দিলাম না ওদের আবদারে। প্রথমে বাচ্চা দুটো মেরে পরে মারলাম স্বামী-স্ত্রীকে। চারজনকে একটি গর্তের মধ্যে মাটিচাপা দিয়ে একটি প্রতিশোধের শান্তি পেয়েছিলাম সেদিন।

প্রশ্ন: এমন কি হয়েছে- কাউকে কাউকে বাগে পেয়েও মেরে ফেলেন নি বা প্রতিশোধ নেন নি?

উত্তর : হ্যাঁ ঘটেছে। কাউকে কাউকে হাতের কাছে পেয়েও মারতে পারি নি। কারণ, যুদ্ধ শুরুর আগে আমরা একই সঙ্গে থেকেছি, খেয়েছি, গল্প করেছি। ওদের মধ্যে কেউ কেউ খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের আমি মারতে পারি নি। কিন্তু যাদের নামে আমার কানে অভিযোগ এসেছে তাদের মা করিনি, তারা যতই পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ হোক। তারপরও কোনো কোনো পাকিস্তানি অফিসারকে মারার সময় সেনাদের মধ্যে কেউ কেউ আপত্তি করত, কাঁদত। আমি তখন ওদের পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচারের কথা শুনিয়ে শান্ত করতাম।


সহযোদ্ধা হারানোর বেদনা
প্রশ্ন: যুদ্ধ চলাকালে হারিয়ে ফেলা কোনো সহযোদ্ধার স্মৃতি কি আপনাকে কাতর করে কখনও?

উত্তর : যুদ্ধ যখন চলে তখন সহযোদ্ধাদের সবার প্রাণ এক প্রাণে পরিণত হয়। তাই সে সময়ে হারানো কোনো বন্ধুর কথা মানুষ সহজে ভুলতে পারে না। আমিও পারি নি। বাঘবান্ধায় অবস্থানকালে আমার ডিফেন্সে দু’জন আনসার ছিলেন-আপন দুই ভাই। যুদ্ধের মাঝখানেই বড় ভাই এক ডেলিভারি কেস থাকায় বাড়িতে যায়। বাড়ি থেকে ফেরার সময় সে খাওয়ার জন্যে একটি মুরগি নিয়ে আসে। বহুদিন পর বাড়ির সবাইকে দেখতে পেয়ে সে তখন খুব উৎফুল্ল। মুরগিটি জবাই করার জন্য বাংকারের সামনে যায় ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। ওদিকে পাকিস্তানিরা অদূরেই তাদের ক্যাম্প থেকে সব সময় আমাদের বাংকারে দৃষ্টি রাখত। আমি বুঝতে পেরে ওদের দুই ভাইকে বকাঝকা করে বাংকারে ঢুকতে বললাম। ঠিক তখুনি বোমা নিপে করে পাকবাহিনী। প্রথম বোমাটি পড়ল ওদের ২৫ গজ ডানে, ™ি^তীয়টি ২৫ গজ বামে। এই অবস্ট’া দেখে ওরা ভয় পেয়ে বাংকারের মুখের দিকে দৌঁড় দিল। তবুও শেষ রা হলো না ভাই দু’টির। তৃতীয় বোমাটি পড়ল ঠিক বাংকারের মুখবরাবর। ঘটনাস্ট’লেই দুই ভাই শহীদ হন সেদিন। আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম সেই সহোদরদের মৃত্যুতে। এরপর ভুরুঙ্গামারীতে হারিয়েছিলাম একজন সৈনিক। এক পাকিস্তানিকে সে নিজ হাতে মেরে খুশি মনে লাশ আনতে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেও লাশ হয়ে ফিরে এসেছিল।

তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম চৌধুরীরহাট অপারেশনের সময়। সেই অপারেশনে আমাদের সঙ্গে এক লেফটেন্যান্ট ছিলেন। খুবই সুদর্শন, বিএ পাস একজন যুবক। বুদ্ধিমত্তা ও নৈপুণ্যের কারণে ভারত থেকে তাকে এই উপাধি দেয়া হয়েছিল। তো রাতের বেলা আমরা পাশ^বর্তী পাকিস্তানি ঘাটিতে অ্যাটাক করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তিনি আমাকে দিলেন ডান দিক, আর নিজে নিলেন বাম দিক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাম দিকে কয়েক গজ এগুতে না এগুতেই একটি বোমা এসে পড়ে তার ওপর, সঙ্গে সঙ্গে মারা যান তিনি। কতটা কষ্ট যে সেদিন মুখ বুঁজে সহ্য করতে হয়েছিল সেই রাতের আঁধারে, তা আর বলে বোঝানো যাবে না। তাঁর নাম ছিল আব্দুস সামাদ। ভুরুঙ্গামারী বাজারের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়েছিল। আজো সেই অঞ্চলে সামাদনগর নামে একটি এলাকার পরিচিতি রয়েছে। লেফটেন্যান্ট সামাদ সাহেব আজো বেঁচে আছেন ওই এলাকার মানুষের মুখে মুখে।


অপ্রীতিকর ঘটনা
প্রশ্ন: যুদ্ধ চলাকালে কি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে আপনাকে ?

উ: মনে পরছে, আমি আমার দল নিয়ে তখন অবস্থান করছি কুলাঘাটে। অতি সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছি। অন্যদিকে নিকটবর্তী পাকিস্তানি টিম একের উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে যাচ্ছে। দিনেরবেলা ভারতীয় ফৌজ আসল। জিজ্ঞাসা করল, হালচাল কী, ওদের অবস্থন এখান থেকে কতদূরে...ইত্যাদি। আমি তাদের অভয় দিয়ে বললাম, শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা আমাদের মতো নিরাপদ দূরত্বে আছি, এবং আরও গুছিয়ে নিচ্ছি। এরপর সকাল তখন ১০-১১টা হবে। মেশিনগান বসালাম একটি গাছের ওপর। ব্রাশ মারলাম পর পর কয়েকটা। দেখলাম সব নিশ্চুপ, সাড়াশব্দ নেই। সেদিন সারাদিন আমরা বাংকারে অবস্থান নিয়ে থাকলাম। রাত ৯টার দিকে ওরা প্রথমে ফায়ার ওপেন করল, এরপর শুরু করল বোম্বিং। এই অবস্থাায় আমি সেনাদের প্রস্তুত হতে বলার জন্য বাংকারে যাই। গিয়ে দেখি বাংকারে কেউ নেই, সবাই হেড কোয়ার্টারে চলে গেছে। সারারাত একাই ওদের রেসপন্স করে সকালে গেলাম হেড কোয়ার্টারে। দেখলাম, সবাই খোশ-গল্পে মেতে চা-নাস্তা খাচ্ছে। রাগে-ােভে তখন আমার সারা শরীর কাঁপছে। রাগের মাথায় কয়েকজনকে লাথি মেরে জিজ্ঞাসা করলাম, যুদ্ধ করতে এসেছো, নাকি পেট পুরতেই এসেছো? আমাকে একা বাংকারে ফেলে রেখে তোমরা কীভাবে আসতে পারলে? যুদ্ধের ময়দানে এত ভয় পেলে চলবে কী করে? আমি তো মরিনি, এখনো বেঁচে আছি। এক সিলেটি হাবিলদার ছিলেন আমার দলে। দেখি তিনি রিসিভার হাতে নিয়ে আরামে চা খাচ্ছেন। টেলিফোনের রিসিভারটা তাঁর কাছ থেকে নিয়ে বললাম, যতদিন এখানে আছেন ততদিন আপনি আর রিসিভার ধরবেন না, সেই যোগ্যতা আপনি আজ থেকে হারিয়ে ফেলেছেন।

এর পর
প্রশ্ন: এর পর?

উত্তর: আমি তখন রিসিভারটা নিয়ে ভারতে কল করলাম। ধরলেন এক মেজর। তাঁর বাড়ি ছিল পাবনায়, এক হিন্দু অফিসার। সব বৃত্তান্ত শুনে তিনি বললেন, ঠিক আছে কমান্ডার সাহেব আমি এুণি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনারা সবাই হাতিয়ার রেখে গাড়িতে উঠে চলে আসেন। মেজর সাহেবের কথামত গাড়ি আসলে আমরা সবাই বেডিংসহ গাড়িতে উঠে ভারতে চলে গেলাম। গিয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছলাম, সেখানে ১টি অফিস ও ১টি ক্যান্টিন আছে, আর আছে ‘একটি বিশালাকার গোডাউন’। প্রথমে ভেবেছিলাম, খাবারের গোডাউন হবে। কিন্তু না, পুরোগুদাম ভর্তি হাতিয়ার। রাশিয়ান অস্ত্র। মেজর সাহেবের নির্দেশমত সবাই যে যার ইচ্ছেমত হাতিয়ার নিয়ে আমরা চলে এলাম ভুরুঙ্গামারী ও বাঘবান্ধার মাঝামাঝি একটি জায়গায়। সেখানে ডিফেন্স নিয়ে আমরা পাকা রোডের ওপর দুটি এলএমজি বসালাম। বাংকার বানালাম গাছের আড়ালে। সেখানে খাট পাতা, খাটের ওপর মশারি ও হারিকেন। বাংকার থেকে ৫০ গজ দূরে রোডব্লক দিলাম যাতে পাকিস্তানিরা গাড়ি নিয়ে আসলে রাস্তা ক্রস করতে না পারে। পার্শ্ববর্তী ক্যাম্পের পাকিস্তানিদের দুটি আর্টিলারি ছিল। রাতে খুব আর্টিলারি মারল। ওদের অটোমেটিক ভালো ছিলÑবোমাগুলো সব আশপাশে পড়ত। আমি আমার সেনাদের বললাম, ফায়ার ওপেন করার দরকার নেই। ওরা যদি সামনা সামনি আসে তবেই আমরা যুদ্ধ করব। তবুও তোমরা সব সময় প্রস্তুত থাকবে। সেই রাতে পাকিস্তানিরা আমাদের একটানা খুব ফায়ার করল। আমরা চুপচাপ রাত কাটিয়ে দিলাম। সকালবেলা ভারতীয় ফৌজ নিয়ে মেজর সাহেব আসলেন। পাক সেনাদের অবস্থান জানতে চাইলে বললাম ভুরুঙ্গামারী বাজারের পাশে আছে ওরা। মেজর ওদের দেখতে চাইলে তাঁকে নিয়ে একটি ঢালু জায়গা থেকে বাইনোকুলার দিয়ে দেখলাম পাকিস্তানিদের। সকালবেলা ওদের চা-নাস্তা খাওয়াচ্ছে এক বাঙালি মহিলা। দেখে-শুনে মেজর বললেন, যে করেই হোক ওদের খতম করতে হবে। এরপর তিনি আমাদের বাংকার দেখতে গেলেন। বাংকার দেখে খুব উৎফুল্ল হয়ে বললেন, আজ রাতেই শুরু হবে আখেরি অপারেশন। তোমরা ততণ নিশ্চিন্তে বসে থাকো। রাতের বেলা আমরা ১০-১২টা তিন ইঞ্চি মর্টার, ১০-১২টা চার ইঞ্চি মর্টার, আর মেশিনগান নিয়ে আমরা তৈরি হলাম। এরপর সারা রাত ধরে চলল ফায়ারিং, বোম্বিং। সকালে আসলেন জেনারেল অরোরা। আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন, শুনলাম ভুরুঙ্গামারী অঞ্চল কিয়ার, তাই না? আমারও সেরকম মনে হয়েছিল তাই মাথা নাড়ালাম। রাস্তার উপর দেয়া বাঁধটি খুলে দিলাম জেনারেলের গাড়ি যাওয়ার জন্য। যেই উনি বাঁধটি ক্রস করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ফায়ারের উপর ফায়ার। জিপের ওপর দিয়ে, আরোরা সাহেবের মাথায় ওপর দিয়ে গুলি ছুটে চলল একের পর এক। ভাগ্য নিতান্তই ভালো যে গাড়ির চাকা এবং ওনার মাথায় কোনো গুলি লাগেনি। তড়িঘড়ি করে জিপ থেকে নেমে এসে জেনারেল বললেন, ইউ কে তোমার সন্দেহই বোধ হয় ঠিক। ওরা এখনো স্ট্রং আছে। এরপর আমরা পাকিস্তানিদের ল্য করে পর পর ৩০টি বোমা মারলাম। দেখি কোনো সাড়া-শব্দ নেই আর। শেষে যখন ওখানে গেলাম, দেখি ৪টি লাশ ছাড়া আর কিছু নেই। ৪ জনই ছিল সেখানে।
আরেকটি অপারেশনের কথা মনে পড়ছে। ওই পাকিস্তানি দলটিরও দ’ুটি আর্টিলারী ছিল। খুবই নিরাপদ স্থানে থেকে আমাদের ফায়ার করত একের পর এক। ভারতীয় ফৌজের মেজর এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ওদের অবস্থান কোথায়! ওদের অবস্থান জানার পর বললেন, ৩ মাইল দূর দিয়ে ঘুরে গিয়ে ওদের কাউন্টার-অ্যাটাক করতে হবে, সামনাসামনি নয়। তার কথা অনুযায়ী কয়েকজন সাহসী রাজপুত সেনা নিয়ে ৩ মাইল ঘুরে ওদের বাঙ্কারের কাছাকাছি গেলাম। রেল লাইনের স্লিপারের নিচে গর্ত করে বাংকার বানিয়েছিল ওরা। সেই গর্ত থেকেই ফায়ার ও বোম্বিং করত। আমাকে কিছু বুঝতে না দিয়েই রাজপুত সেনারা একেবারে বাংকারের মুখে গিয়ে বলল, হ্যান্ডসআপ। হাতিয়ার রেখে একে একে বেরিয়ে এলো সাতজন। একজন কমান্ডার ছয়জন সেপাই। ওই সাতজনকে আমরা গুলি করে মারি নি। মেরেছিলাম বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে। একটি ইনজেকশনই যথেষ্ট। এভাবে সাতজনকে মেরে রাস্তার ওপর লাইন করে শুইয়ে দিয়েছিলাম আমরা।

গ্রামবাসীদের সহযোগিতা
প্রশ্ন: যুদ্ধ চলাকালে স্থানীয় গ্রামবাসীদের কেমন সহায়তা পেয়েছেন?

উত্তর: অবশ্যই। সম্ভবপর সব ধরণের সহযোগিতা করেছেন তারা। কেননা, যুদ্ধের সময় শত্রু ছাড়া বাকি সবাই একে অন্যের মিত্র। আমরা যেমন গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছি। পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি। গ্রামবাসীরা আমাদের জন্য তার চেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে। চাল, ডাল, কাঁথা, কাপড়, আশ্রয়Ñসবকিছু দিয়েই পাশে থেকেছে তারা। ভাত না থাকলে ভাতের ফ্যান দিয়েছে, ঘরে চাল না থাকলে গ্রামের সবার থেকে চাল উঠিয়ে আমাদের দিয়েছে। এমনকি গরু, হাঁস, মুরগি, ছাগল এগুলোও দিয়েছে। তবে আমাদের দলটি যেহেতু ইপিআর-এর সৈনিকদের নিয়ে, ফলে আমরা খাবার-দাবারের ব্যাপারে তেমন চিন্তা-ভাবনা করতাম না। এমনকি আমি যেখানেই আমার দল নিয়ে গেছি সেখানেই টেলিফোন পর্যন্ত চলে গেছে।

প্রশ্ন: আর সাধারণ মুক্তিবাহিনীরা?

উত্তর: যখন পেট্্রলে যেতাম, চোখে পড়ত অসহায় ুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ। আমাকে দেখে আবদার করত, অভাব-অভিযোগ জানাত। বলত, বাবা আমরা মুক্তিযোদ্ধা, না খেয়ে লড়তেছি। আমাদের ভাত নেই, তরকারি নেই, শুধু গুলি-বোমা আছে। আমি তখন আমার দলের তরফ থেকে, গ্রামের মুরুব্বীদের থেকে চেয়ে নিয়ে ওদের খেতে দিতাম।

স্বপ্ন শুধু স্বাধীনতা
প্রশ্ন: তখন নিশ্চয়ই কোন স্বপ্ন বাস্তবায়নের অনুপ্রেরণা কাজ করত?

উত্তর: স্বপ্ন তখন একটাই ছিলÑ দেশটা কেমন করে আজাদ হবে, মানে স্বাধীন হবে। কেননা, এই দেশকে আমার নিজের দেশই মনে করতাম, করেই যাব আমৃত্যু। এখানেই আমার তিন পুরুষের নাড়ি পোঁতা। তাই দেশ আমাকে যাই মনে করুক, আমি নিজেকে এই দেশের বাইরের ভাবতে পারি না। মায়ের মতোই ভালোবাসি এই মাতৃভূমিকে। আর এই ভালোবাসা থেকেই আমি প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। আমার স্মরণে ১৯৭১-র ভয়াবহ যুদ্ধের উত্তাল সময়গুলোতে কখনোই ভাবতে পারিনি আগামীকাল আমি বেঁচে থাকব। প্রত্যেকটি দিন জীবনের বোনাস টাইম মনে হতো। তাই যত বিপদেই পড়েছি ঘাবড়ে যাইনি, ভয় পাইনি। আমার সেক্টর কমান্ডার আবুল বাশার সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইউ কে আপনি কি মনে করেন দেশটা স্বাধীন হবে! জবাবে বলেছিলাম, অস্ত্র যখন হাতে নিয়েছি স্যার যতণ আমার অস্ত্র ধরে রাখার শক্তি থাকবে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, সাহস আছে তো লড়ে যাওয়ার? বলেছিলাম, আমাকে সাহস দেয়া না দেওয়ার ব্যাপার আমার সৃষ্টিকর্তার। তবে স্যার এখনো আমি কিছুতে সাহস হারাইনি, ভয়ও পাইনি। এভাবেই আমি আমার দেশমাতার মুক্তির স্বপ্নকে সামনে রেখে এগিয়ে গিয়েছি সব ভয়-ভীতি বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে। কেননা, মুক্তির প্রশ্নে ভীতি কখনো সাফল্য আনতে পারে না। স্বপ্নের মূল্যায়ন করতে হয় সাহস দিয়ে।

বিজয় বাংলাদেশ
প্রশ্ন: ডিসেম্বর মাসের বিজয়পর্বে কোথায় অবস্থান করছিলেন?

উত্তর: ১৪ ডিসেম্বর থেকে আমি আমার গ্রুপ নিয়ে তিস্তা ব্রিজ এলাকায় অবস্থান করছিলাম। টানা দু’দিন হালকা-পাতলা গোলাগুলি হলো। এরপর ১৬ ডিসেম্বর সকালে হঠাৎ করে আমাদের জানানো হলো ৯টা পর্যন্ত সময়, আর ফায়ার করা যাবে না। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, বিজয় ঘোষিত হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা সকাল ৯টার আগেই ছোট্ট একটি অপারেশন সারলাম। চারজন পাকিস্তানি একটি বাংকারের সামনে বসে চা খাচ্ছিল। সবকিছু পজিশন করে দিলাম ব্রাশ। চারজনের মধ্যে দু’জন মারা গেল আর দু’জন পালিয়ে গেল। এর কিছুণ পর ৯টা বাজলে আশপাশের পাকিস্তানিরা সাদা পতাকা টানিয়ে দেয়।


প্রশ্ন: সেই সময়কার অনুভূতি সম্পর্কে কিছু বলুন?

উত্তর: ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে’- এই কথাটুকুর তাৎপর্য যে কত ব্যাপক ও বিস্তৃত তখনও আমি বুঝে উঠতে পারি নি। বুঝতে পারলাম যখন আমরা তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে রেল স্টেশনে গেলাম। গিয়ে দেখি রেল স্টাফরা আনন্দে কথা বলতে না পারার মত সময়ের সন্ধিণেও গরু-খাশি জবাই করে আমাদের জন্য খাবার তৈরি করেছে। চারদিকে তখন বিজয়ের সুগন্ধি বাতাসের সন্তরন। পৃথিবীর দরিদ্রতম এই দেশটির মানুষের আনন্দের কত ধরনের প্রকাশ যে থাকতে পারে সেদিন দেখেছিলাম।

প্রশ্ন: এর পর অবস্থান গ্রহণ করেন কোথায়?

উত্তর: স্টেশনের খাওয়া সমাপ্ত করে দু’টি গরুর গাড়িতে আমাদের সব বেডিং আর অস্ত্র নিয়ে আমি রংপুরে রওনা হলাম, বাকিরা সবাই হেঁটে আসল। রাত ৯টায় গিয়ে উঠলাম রংপুর কলেজে। সেই রাতেই গ্রামের লোকজন আমাদের অভ্যর্থনা জানায় এবং গরু জবাই করে খেতে দেয়।


প্রশ্ন: সেই সময়ের কোনো স্মরণীয় স্মৃতি?

উত্তর: হ্যাঁ স্মরণীয়ই বটে। রাতেই জানতে পেরেছিলাম আÍসমর্পণকারী পাকিস্তানি সেনাদের অনেকে কলেজ গেটে অবস্থান করছে। সকালে সেখানে গিয়ে তাদের মধ্যে অনেককেই চিনতে পারলাম। কেননা, যুদ্ধের আগে আমরা একসঙ্গে থেকেছি, খেলেছি, খেয়েছি। আমাকে দেখেই তাদের কয়েকজন হাসিমুখে এগিয়ে আসল। অনেকদিন পরে ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে যেমন হয়। তেমনিভাবে বলে উঠল, শালা ইউকে, তুমি এখনো মরোনি দেখছি। জবাবে আমি বললাম, শালা আমি এখনো বেঁচে আছি বলেই তোমাদের জীবিত দেখছি। এভাবে কিছুণ বাক্যুদ্ধ করে হাত মেলালাম। ওরা বলল, ভাই তোমাদের দেশ তোমাদেরই থাক। সবকিছু ভুলে যাও, যা হয়েছে হয়তো বা ভালোই হয়েছে। তোমরা তো যাই হোক খেতে পেরেছ। আর আমরা না খেয়ে মরেছি। যাই হোক, এসব শেষ হয়েছে ভালো হয়েছে। তোমাদের শুভ হোক। আমিও ওদের কল্যাণ কামনা করে পরস্পর বিদায় নিলাম।

অনাকািঙ্ক্ষত
প্রশ্ন: সেই সময়ের কোন অনাকাক্সিত ঘটনার কথা কি মনে পড়ে যা তাৎণিকভাবে আপনাকে পীড়া দিয়েছিল?

উত্তর: যুদ্ধে অনাকাক্সিত ঘটনা অনভিপ্রেত নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক। এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিল যারা আদৌ যুদ্ধ করার ইচ্ছায় যায় নি, প্রাণ বাঁচাতে আর লুটপাটের সুযোগ নিতে গিয়েছে। তেমনি একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। সেটা অবশ্য বাংলাদেশীরা করেনি, মিত্রবাহিনীর সদস্যরা করেছিল। ঘটনাটা ঘটে ১৬ ডিসেম্বর রাতে। বাংলাদেশ তখন আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। তবুও লোকজন অনেকেই ঘর থেকে বেরুতে ভয় পেত। শহরগুলো সব প্রায় ফাঁকাই ছিল। বেশিরভাগ মানুষ তখনও গ্রামাঞ্চলে, নিরাপদ আশ্রয়ে। যাই হোক, ১৬ ডিসেম্বর যখন আমি আমার দলের বেডিং ও অস্ত্র নিয়ে দু’টি গরুর গাড়ি বোঝাই করে রংপুর শহরে আসি তখন শহর ক্রস করে কলেজে যাব এমন সময় দেখি বড় রাস্তার উপর ৪-৫টি আর্মির গাড়ি লাইন করে দাঁড়ানো। গাড়িগুলো দাঁড়ানো ছিল শহরের বড় দোকানগুলোর সামনে, যেগুলোতে দামি দামি জিনিসপত্র বিক্রি হত। দেখলাম দোকানগুলোর ঝাপ খুলে ইচ্ছেমত গাড়িতে মালামাল লুট করে ভরে নিচ্ছে। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, শেষে আগুনটা যেন লাগাবেন না। অন্তত এই অনুরোধটা রাখতে বলে আমি মনের কষ্ট মনে নিয়েই চলে আসি।

স্বাধীনতা-উত্তর ভাবনা
প্রশ্ন: স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশ নিয়ে কি ভেবেছেন?

উত্তর: ভেবেছিলাম, পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করতে পারলেই আমাদের দেশটাকে আমরা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেব। আমরা দেশের সবাই একসঙ্গে গড়ে তুলব আমাদের ভবিষ্যৎ। সুখে থাকার জন্যই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভেবেছি এবার সেই আকাক্সিত সুখ নিশ্চিত হবে। আমি মনে করি আমি যে আজো বেঁচে আছি এটা আমার বোনাস লাইফ। শুধু আমি নই যু™েব্দর ময়দান থেকে ফিরে আসা সব যো™ব্দারই বোধ হয় একই ভাবনা আমার মতো। স্বপ্ন জš§ দেয় সম্ভাবনা, আর সম্ভাবনা রূপ পায় বাস্তবে। আমাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা শুধু একটি শব্দ নয়, সব ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্তি। নিপীড়ন, অত্যাচার, লুণ্ঠন, সা¤প্রদায়িকতা থেকে মুক্তি। আমরা চেয়েছি, এমন একটি দেশ যে দেশ তার সব নাগরিককে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে দেবে, ুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবে, সুশাসন কায়েম করবে, আইন-কানুন প্রণয়ন করবে, যার পরিণতি একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।


প্রশ্ন: ভাবনা আর বাস্তবতার সমন্বয় ঘটেছে কি?

উত্তর: না। সাধারণ মানুষের সেই সুখ যেন অচিন পাখি। দেশের সাধারণ মানুষ আজো তার নাগাল পায়নি। আজো তারা অসহায়, জিম্মি কতিপয় অসাধারণ মানুষের কাছে, যারা স্বাধীনতার অপব্যবহার করছে দুর্নীতি, খুন ও চাঁদাবাজির মধ্য দিয়ে। ভেবেছিলাম, দেশটা স্বাধীন হলে সংসদের সব মন্ত্রী-এমপি হবে

মুক্তিযুদ্ধ একাত্তর

“ফুলপাতা যে রকম সূর্যের দিকে মুখ ফেরায়, সে রকম কোনো অজানা সৌরাকর্ষণে অতীতও ইতিহাসের আকাশে উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ ফেরাবে বলে লড়াই করে।”
ভাল্টার বেনিয়ামিন (১৯৯২ : ২৪৬)



শত শত নদীবেষ্টিত ভূ-ভাগে প্রাচীন কৌম ও বঙ্গ-জন অধ্যুষিত বঙ্গ-জনপদ। বিচিত্র এর ভূ-প্রকৃতি, যা তার মানুষদের মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। সেই প্রকৃতি মনোহর আর দৃষ্টিনন্দন হলেও আচরণে অনেকটা প্রতিপ। দৃষ্টিসীমা সরলভাবে দিগন্তের সন্ধান পায় না। পথ-ঘাটও অসরল, আঁকা-বাঁকা। প্রলয়ঙ্কারী বন্যা এখানকার প্রায় প্রতিবছরের ঘটনা। নিত্য লড়াই চলে নদী আর তার পাড়ের মানুষদের মধ্যে। নদী ঘর ভাঙে, শস্য কেড়ে নেয়। সমুদ্র কূলে ওঠে গ্রাস করে সব কিছু। এমনিতর জল-স্থলে প্রতিপরে সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচেছে এই অঞ্চলের পরাক্রমশালী মানুষেরা। আর তাই লড়াই সংগ্রাম প্রতিবাদমুখরতা তাঁদের সংস্কার। আত্মবিস্মরণ বা অস্তিত্বকে ভোলার অবকাশ মেলেনি তাঁর। সভ্যতার বিকাশ বা বিকাশের উৎকর্ষতার বদৌলতে সেই প্রতিপসুলভ প্রকৃতিকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও প্রতিপ বা শত্র“র নব রূপে প্রত্যাবর্তন রোধ করা যায়নি। প্রতিকূলতার চটুল চরিত্র ও নব মাত্রিকতায় পাল্টে গেছে যুদ্ধের প্রকৃতি। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, উগ্র আগ্রাাসী জাতীয়তাবাদ, শোষণ সর্বস্ব, পুুঁজিবাদ, ধর্মান্ধতা প্রভৃতি তথাকথিত সভ্যতার ধারক মানুষদেরই সৃষ্টি, যে সৃষ্টির বিকাশ মানুষেরই চরম শত্র“রূপে। অন্যদিকে এই সব শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে মুক্তিকামী বিশ্ববাসী প্রগতির অস্ত্র হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেছে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, উদার জাতীয়তাবাদের ধারণা, ধর্মনিরপে মানবতাবাদী মূল্যবোধ, এবং সমাজতন্ত্রের দর্শন। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে প্রগতির উপরোক্ত অস্ত্রসমূহই মূল শক্তি ও প্রেরণার যোগান দিয়েছিল।

প্রায় দুইশো বছর শাসন-শোষণ শেষে ১৯৪৭’র আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান এ নামক দুই পৃথক রাষ্ট্রে ভাগ করে ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ব্রিটিশরা। এর মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে দৃশ্যশোভন হয়ে ওঠে স্বাধীনতা নামক এক মাকাল ফল, যা আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হয়ে খেয়েছিলাম। বারশো মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে একমাত্র ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো মিলই ছিল না। এই তথাকথিত স্বাধীনতা ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্বাধীনতা, পূর্ব পাকিস্তানকে অবাধ শোষণের স্বাধীনতা। পূর্ব পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশ বিবেচনা করে পশ্চিমারা এদেশের মানুষকে রাষ্ট্রজীবনের সর্বেেত্র উপেতি ও বঞ্চিত রাখে। এভাবেই পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের ২৬০০ কোটি টাকা (১৯৪৭-৭০) পাচার হয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। আশা বা মোহভঙ্গের প্রথম বছর ১৯৪৮ সালে ভাষার উপর আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে ঢাকায় এক গণবিােভের আয়োজন করা হয়। বিােভকারীদের উপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ কয়েকজন নিহত ও অনেকে আহত হন। ভাষার জন্য এই জীবন ও রক্তদানের মাধ্যমেই শুরু হয় এদেশবাসীর স্বাধিকার আদায়ের সুদীর্ঘ সংগ্রাম। এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের পরিণত প্রকাশই ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ।

পূর্বতন বছরগুলোতে সংগঠিত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া এদেশবাসীর মনস্তত্ত্বে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, তা আরো করুণভাবে আত্মগত হয়েছে ১৯৭০-র ১২ নভেম্বর। ইতিহাসের এক প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে পূর্ববাংলার দণিাঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেদিন। সর্বনাশা ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দশ লাখ বাঙালির জীবন ছিনিয়ে নেয়। সর্বস্বান্ত হয় অসংখ্য মানুষ। অথচ এই বিরাট জাতীয় দুর্যোগে ইয়াহিয়া সরকার দুর্গত জনসাধারণের প্রতি নিষ্ঠুর উদাসীনতা প্রদর্শন করে।

এরপর ১৯৭০-র ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ৩১৩ আসনের মধ্যে পুর্ব পাকিস্তানের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬৯, এবং আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়। ফলাফল বিবেচনায় কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করার কথা আওয়ামী লীগের। কিন্তু পাকিস্তান সরকার মতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১৯৭১-র ১ মার্চ রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদ স্থগিত ঘোষণা করলে রুখে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এরপর পরিস্থিতির পরম্পরায় আসে ঐতিহাসিক ৭মার্চ। রমনা-রেসকোর্সে বিশাল জনসমুদ্রের সম্মেলনে শেখ মুজিব গভীর আবেগ, নির্ভুল যুক্তি এবং ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনাপূর্ণ এক ভাষণ। এ ভাষণে অকুতোভয় নেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন
“.... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

মূলত সেদিন থেকেই ‘স্বাধীনতা” শব্দটি এদেশবাসীর। অন্যদিকে পূর্ব-পাকিস্তানের জেগে ওঠা জনতার কণ্ঠরোধ করতে সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত নেয় চূড়ান্ত আঘাত হানার। এ ল্েয ফেব্র“য়ারি বা তার আগে থেকেই মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে লুকিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষের উপর চলে মানবেতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। বর্বরোচিত এই হত্যালীলায় সোৎসাহে অংশগ্রহণ করে এদেশের বসবাসরত বিহারীদের একটি বড়ো অংশ এবং এদেশে জন্ম নেয়া কিছু বিশ্বাসঘাতক কুলাঙ্গার দালাল। প্রথমত তারা আক্রমণের ল্যবস্তু হিসেবে নিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যান্টনমেন্টসমূহ।
অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর সম্ভাব্য মৃত্যু মেনে নিয়েও জনগণের জীবন রার্থে মহাহত্যাযজ্ঞের প্রথম প্রহরেই গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। স্বাধীনতা হয়ে ওঠে সবার অভিন্ন ও একমাত্র ল্য। ২৬ মার্চ-ঢাকা এক ধ্বংসস্তূপের নগরী। এই ঘটনায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে শুরু হয অভাবনীয় প্রতিরোধ প্রক্রিয়া। ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানা এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকসেনারা এদেশীয় পুলিশ, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট’র সৈন্যদের নিরস্ত্র করে পাইকারি গণহত্যা চালালে সেই খবর অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। আত্মরার ও দেশাত্মবোধের তাগিদে অধিকাংশ সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য প্রতিরোধ-সংগ্রামে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন। সশস্ত্রবাহিনীর বিপ্তি বিদ্রোহের মধ্যে চট্টগ্রামস্থিত ৮-ইবি এবং ইপিআর বাহিনীর সসস্ত্র প্রতিরোধ একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। এতে স্বল্পকালের জন্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র দখলে আসলে ২৬ মার্চ স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এম. এ. হান্নান এবং ২৭ মার্চ ৮-ইবির মেজার জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে নরক হয়ে ওঠা বাংলার শহর-গ্রাম থেকে পাহাড়, জঙ্গল, নদী-নালা ডিঙিয়ে লাখ লাখ মানুষ বেরিয়ে পড়েন নিরাপত্তার খোঁজে। বেশিরভাগ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের স্থানে স্থানে তাঁবু খাটিয়ে তৈরি করা হয় শরণার্থী শিবির। প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বাংলাদেশী শরণার্থীদের ভার নিলেও পরবর্তীতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শরণার্থী আশ্রয় নিতে থাকলে এর ভার নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সে সময় প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নকশাল বিত জনবহুল পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অগণিত বিদেশী শরণার্থী বিশেষত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জন্যে উন্মুক্ত করা অসামান্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এেেত্র দ্ব্যর্থহীন ভূমিকা রাখেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। মুক্তিযুদ্ধের এ পর্বে অসামান্য ভূমিকা রাখেন সীমান্ত অতিক্রম করা আওয়ামী লীগ নেতা (সাধারণ সম্পাদক) তাজউদ্দিন আহমদ। প্রায় একক প্রচেষ্টায় তিনি সে সময় ভারতের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র সময় জুড়ে তিনি সমস্ত বিভ্রান্তি ও উপদলীয় কোন্দলের মধ্যে স্থির থেকে জাতিকে সঠিক নেতৃত্বে চালিত করার প্রয়াস রাখেন।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১-য়ে বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সম্মুখে প্রকাশ্য শপথ গ্রহণ করে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। এই সংবাদ প্রচারিত হলে কলকাতার পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত এম. হোসেন আলী বাংলাদেশ পে যোগ দেন। এরও আগে ৬ এপ্রিল দিল্লীর পাক হাইকমিশনের কর্মকর্তা কে. এম. সাহাবুদ্দিন ও আমজাদুল হক বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য জানান। এভােেবই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ক্যানবেরা, কাঠমুন্ডু, ম্যানিলা, লন্ডনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দূতাবাসে বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মাচারীদের পাকিস্তান প ত্যাগ করেন। এইসব ঘটনাবলি মুক্তিযুদ্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের সপে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি লন্ডনে তাঁর সদর সফতর স্থাপন করে পৃথিবীর দেশে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরূপে ছুটে বেড়ান, যা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের নাড়া দিয়েছিল। বিশ্ব জনমত আদায়ের ল্েয তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রধান শহরে নানা উপায়ে পাকিস্তানী নৃশংসতা তুলে ধরেন। ল্য হয়ে যায় একটিই, সেই নির্দিষ্ট ও দুর্নিবার ল্যÑ দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি। ফলে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের অভিপ্রায়ে দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে মুক্তি পিয়াসী সবুজের দল।
৩০ এপ্রিল, ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। ৯ মে তাঁদের হাতে ন্যস্ত করা হয় মুক্তিযুদ্ধে যোগদানেচ্ছু বাংলাদেশের তরুণদের প্রশিণ দানের দায়িত্ব। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে ভারত একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বরাদ্দ করলে ২৫ মে মুজিবনগর থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের’ অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। মুক্তি পাগল শব্দ সৈনিকদের নির্ভিক প্রচেষ্টায় এই বেতার-স¤প্রচার তার উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে উজ্জীবিত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও সমর্থনকারী সবাইকে। পাশাপাশি চিত্রসৈনিকেরাও তাঁদের শিল্পকর্মে পাকিস্তান শাসকদের ব্যঙ্গচিত্র উপস্থাপন করে জনমনে পাকিস্তানী শাসন সম্পর্কে তীব্র ঘৃণার সংক্রমণ ঘটাতে সম হন।

ঐতিহাসিক একাত্তরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সুগঠিত পাকসেনাদের বিপরীতে মুক্তিবাহিনী ছিল অনেকটা আগোছালো, অসংবদ্ধ। তবুও তাঁরা নিষ্ঠুর পাকসেনাদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। আশা ছিল, পৃথিবীর মানবতাবাদী সংস্থা ও বড়ো বড়ো সভ্য দেশগুলো এই অসম যুদ্ধ রোধে সচেষ্ট হবে। কিন্তু তা হয় নি। তাই মে মাসের মাঝামাঝি থেকে গেরিলাযুদ্ধের পথ বেছে নেয়া হয়। ১৩টি শিবিরে মে-জুন-জুলাই এই তিন মাস ধরে চলতে থাকে গেরিলা প্রশিণ। তাঁদের রণকৌশল- অতর্কিত আক্রমণে ছোটো ছোটো পাক সেনাদলকে পরাজিত করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নেয়া। জীবন বাজি রেখে এভাবেই চলতে থাকে এদেশবাসীর যুদ্ধ প্রক্রিয়া। ফলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ পুনর্দখলের ফলে সৃষ্ট পাকিস্তানী শাসকদের আত্মপ্রসাদ ক্রমশ ম্লান হয়ে আসতে থাকে জুন মাসের শেষ দিকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আগস্ট একাত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতে ট্্েরনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল দশ হাজারেরও কম, যা পাক সেনাদের প্রতিপ হিসেবে নিতান্তই অপ্রতুল। এই অবস্থার পরিবর্তনের ল্েয সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে কুড়ি হাজার করে আরো ষাট হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেনিং দেয়া হয় এবং বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর জন্যে গঠন করা হয় আরো নতুন তিনটি ব্যাটেলিয়ান। সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে চলমান অস্ত্রশস্ত্র সংকটের উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৬ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ নৌ-কমান্ডো বাহিনীর পৃথিবীকে চমক লাগানো নৌবিধ্বংসী তৎপরতার অভাবনীয় সাফল্য মুক্তিযুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ভারতের সহায়তায় ট্রেনিং প্রাপ্ত মাত্র ৩০০ জন নৌমুক্তিযোদ্ধা ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে সর্বমোট ৫০,৮০০ টন জাহাজ নিমজ্জিত করেন, ৬৬,০৪০ টন জাহাজ তিগ্রস্ত করেন, এবং বেশ কিছুসংখ্যক নৌযান দখল করে নেন। এই দুঃসাহসিক অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে পরিচিত।

প্রত্য তৎপরতার েেত্র তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা নভেম্বরের শুরুতে অনেক বেশি সক্রিয় ও আত্মবলে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। ল্য ও কৌশল সম্পর্কে যথোপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই তাঁরা দখলদার সৈন্যদের চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ হটাতে সম হন। এতে পাকিস্তানী বাহিনীর এদেশীয় সহযোগী রাজাকার বাহিনীর অপোকৃত দুর্বল ও সুবিধাবাদী অংশটি ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে, এবং এই অবস্থায় এই বাহিনী আয়তন বৃদ্ধির জন্যে দখলদার সামরিক শাসকরা জামায়াতে ইসলামী এবং বিহারী সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় গঠিত ‘আলবদর’ ও ‘আল শামস’ বাহিনীদ্বয়ের গোঁড়া সদস্যদের উপর অধিকতর নির্ভর করতে থাকে।

এই সকল নপুংসক রাজাকার স¤প্রদায় ছাড়াও পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী মিযোবাহিনী। এই মঙ্গোল-প্রতিম চেহারার মিজোদের আবাস লুসাই পর্বতপ্রধান ভারতের মিযোরাম প্রদেশে। সরল স্বভাবের কিন্তু বিপথে চালিত এই মিযোদের কয়েকটি নিরাপদ ঘাঁটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই ঘাঁটিগুলো পাকিস্তান ও চীনের দ্বারা প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে এমন পরিপূর্ণ হয়ে থাকত যে এই বৈরি ভূমিতে যে কোনো সম্ভাব্য ভারতীয় অনুপ্রবেশ তারা প্রতিরোধ করতে পারত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশস্থ পাকিস্তান প্যারা মিলিটারি ফোর্সেস-এর বেতনভূক্ত এই মিযোদের পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে মোতায়েন করা হয়। তারা চীনাদের দ্বারা গেরিলা যুদ্ধের প্রশিণ পেয়েছিল। তবুও পাক কর্তৃপ প্রতিটি পোস্টে মিযোদের পাশাপাশি বেলুচি, পাঠান ও পাঞ্জাবীদের ছোটো ছোটো ইউনিট রাখত এটা নিশ্চিত করার জন্যে যে তারা যেন সর্বশেষ লোক এবং সর্বশেষ রাউন্ড পর্যন্ত পাকিস্তানের স্বার্থে লড়াই করে।

এদিকে ঢাকার পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এলাকার জীবন্ত কিংবদন্তি কাদের সিদ্দিকী নবীন একদল সহকর্মী নিয়ে পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধ পরিচালনায় এক বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করেন। টাইগার সিদ্দিকী নামে পরিচিত মাত্র ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দতা, আত্মবিশ্বাস, অভূতপূর্ব রণকৌশল এবং বিরল সামরিক প্রতিভাবলে গড়ে তোলেন সতেরো হাজার সুদ মুক্তিযোদ্ধা এবং সত্তর হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এক বিরাট বাহিনী। ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ নামে খ্যাত এই দলটি কখনো অস্ত্র সাহায্য পাওয়ার আশায় বসে থাকেনি।
সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ও বহুগুণ শক্তিশালী পাক বাহিনীর উপর আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে অস্ত্র ছিনিয়ে এনে যুদ্ধে ব্যবহার করেছেন তাঁরা। এই বাহিনীর অসাধারণ রণনৈপুণ্যেই ডিসেম্বর মাসে মিত্রবাহিনী টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ মুক্ত এলাকা দিয়েই প্রথম ঢাকায় পৌঁছে।

আগস্ট মাসে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবের ফাঁসির ঘোষণা করেন ইয়াহিয়া। ইন্দিরা গান্ধীর প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ইয়াহিয়া বিশ্ববাসীকে জানাতে বাধ্য হনÑশেখ মুজিব বেঁচে আছেন এবং কারাভ্যন্তরেই রয়েছেন। অন্যদিকে ১ কোটি শরণার্থীর ও মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যান্য বঙ্গবাসীর যাবতীয় প্রয়োজনের যোগান দিতে গিয়ে মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে ইন্দিরা সরকার। সংগঠিত এই সমস্যাবলির সমাধানকল্পে ইন্দিরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মস্কো এবং ২৪ অক্টোবর থেকে তিন সপ্তাহের জন্যে বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানি ভ্রমণ করেন। কিন্তু বিশ্বনেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনায় কেমন ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ভারতকেই প্রত্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন। এভাবে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়। ৩ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তানী বিমানবাহিনী ভারতের ৭টি বিমান ঘাটিতে একযোগে হামলা চালালে অনিবার্য হয়ে যায় ভারতের সর্বাত্মক যুদ্ধ প্রস্তুতি। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই পর্বের ২দিনের যুদ্ধেই বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এই সময় কূট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে যখন বুঝতে পারেন যে এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী, তখন নতুন ষড়যন্ত্রের প্রচেষ্টা চালাতে প্রয়াসী হন। এপ্রিল মাস থেকেই হোয়াইট হাউস পাকিস্তানকে অস্ত্র না দেয়ার বিবৃতি দিলেও, গোপনে এ প্রক্রিয়া সচল থাকে যুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫ডিসেম্বর বিশেষ উদ্যোগে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকে। সঙ্গে সঙ্গে এই অন্যায় অধিবেশনে ভেটো দেয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরদিন ৬ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন ইন্দিয়া গান্ধী। এতে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়, এবং ভারতে সকল প্রকার মার্কিন অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যস্ত সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত তার সমুচিত জবাব দেয়। ইতোমধ্যে রণাঙ্গণে শুরু হয়ে যায় পাকসেনাদের পলায়ন পর্ব। ৭ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানীদের নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে আগাতে থাকে যুদ্ধের পরিণতি।

১৯৭১-র মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন সরকারের বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকার পাশাপাশি স্মরণযোগ্য নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্বয়ারে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’র কথা। ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে দর্শক ছিলেন ৪০ হাজার, এবং আয় হয়েছিল আড়াই লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের শিশুদের কাজে ব্যয় করার জন্যে জাতিসংঘের শিশু তহবিলে জমা দেয়া হয়। এছাড়াও এই অনুষ্ঠানটি মার্কিন জনগণসহ বিশ্বাবাসীর সহানুভূতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১০ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারদের অধীনে ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনীর এক যৌথ কমান্ড গড়ে তোলা হয়। যৌথ কমান্ডের পরিকল্পনা ছিল সম্ভাব্য বড়ো ঘাঁটিগুলোকে এড়িয়ে সর্বাপো কম য়তির মাধ্যমে ঢাকা দখল করা। এেেত্র এমন কৌশল অবলম্বন করা হয় যে, পাকিস্তানীরা ভুল করে ধারণা করেÑ চতুর্দিকে বিপুল শক্তি নিয়ে যৌথ কমান্ড এগিয়ে আসছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানীপ সমগ্র দেশে তাদের সামরিক শক্তি ছড়িয়ে দেয়। এতে পাকিস্তানবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশ্যম্ভাবী পরাজয় বুঝতে পেরে পাকিস্তানী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরের যুদ্ধ বিরতির আবেদন জানায়। নিরাপত্তা পরিষদে যখন এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে ইয়াহিয়া জাতিসংঘকে জানান এ প্রস্তাব অনুমোদিত নয়। তাই তা নাকচ করা হোক। ইয়াহিয়ার এই মত পরিবর্তনে মার্কিন সপ্তম নৌবহর ছিল যুদ্ধ জয়ে আশার আলো। এই সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে চীন, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি বিশ্বসংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়।

ডিসেম্বর ১০ থেকে ডিসেম্বর ১৫, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম লগ্ন। ততদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানীদের অবধারিত পরাজয়। এই আসন্ন পরাজয়ের কথা জেনেও পাকিস্তানী পশুরা ঘৃণ্য নৃশংসতা ও বিকৃত উল্লাসের সাথে হত্যা করে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কট্টরপন্থীদের সশস্ত্রবাহিনী ছিল ‘আলবদর’। গোস্টাপো স্টাইলের এই বাহিনী বিশিষ্ট বাংলাদেশীদের চিনিয়ে দেবার, ধরিয়ে দেবার এবং অবশেষে হত্যা করার ভার নেয়।
পাক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নক্সার প্রণেতা। যাঁরা ধর্ম নিরপেতা, শোষণমুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন তাঁরাই এই হত্যালীলার শিকার হয়েছেন। ‘জেনোসাইডের’ পাশাপাশি ‘এলিটোসাইডে’ অন্তর্ভুক্ত ছিলেনÑ বাংলাদেশের লেখক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী প্রমুখরা। ঢাকার এক বিরাট সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও উচ্চপদস্থ অফিসারদের গভর্নর হাউসে এক সভায় আমন্ত্রণ করে নির্বিচারে হত্যা করার একটি মহাপরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানীদের। পরবর্তীতে এই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়াই ছিল ওদের এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য।

একাত্তরের ইতিহাসে অত্যন্ত ঘটনাবহুল একটি দিন ১৪ ডিসেম্বর। ঢাকা শহর ও গুটিকয় ছোটো ছোটো এলাকা বাদে সারা দেশ তখন শত্র“ মুক্ত। আসন্ন যুদ্ধ ও সম্ভাব্য ধ্বংসের আশঙ্কায় থমথমে ঢাকা শহর। ঐদিনই ঢাকার গভর্নর হাউসের উপর আক্রমণ চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনীর ছয়টি মিগ ২১। এই ঘটনায় পাস্তিানের সর্বোচ্চ বেসামরিক প্রশাসন অর্থাৎ পরিষদ গভর্নর মালিক পদত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খানের চৈতন্যোদয় হয় সেদিন। ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাপতি লে. জেনারেল নিয়াজীকে বার্তা পাঠানÑ পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের সহযোগীদের জীবনরার্থে যুদ্ধ বন্ধ করার সকল প্রয়োজনীয় পদপে নেয়ার। শর্তহীন আত্মসমর্পণের দিকে তাড়িত হয় পরাস্ত পরিশ্রান্ত ইস্টার্ন কমান্ড। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত বাহিনী ঢাকা নগরীর উপকণ্ঠে সমবেত হয়। এরপর আসে ১৬ ডিসেম্বর। বাংলার ইতিহাসে এক হিরন্ময় মুহূর্ত।

১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশ ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্র“প ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার, এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিগণ ঢাকায় অবতরণ করেন। এর আধঘণ্টা পরেই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল হর্ষোৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর কাছে পাকিস্তানী সমরাধিনায়ক লে. জেনারেল নিয়াজী বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল পাকিস্তানী বাহিনীর (৯৩,০০০) পে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বার করেন। জন্ম হয় একটি দেশের, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এখনো দেশ যুদ্ধ করে চলছে তার অভ্যন্তরীণ ও আভ্যন্তরীণ অপশক্তিসমূহের বিরুদ্ধে। কেননা, মুক্তির যেমন শেষ নেই, তেমনি মুক্তিযুদ্ধেরও শেষ হয়নি। ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ১২০০ বছরের স্থবিরতার শেষ ঘোষণা করেছে মাত্র।