বৈদিক সাহিত্য মহাভারত ও মৎসপুরানের পুরাকাহিনী থেকে বলিরাজা নামক এক প্রজাবৎসল প্রসিদ্ধ রাজার কথা জানা যায়। কিন্তু রাজা অপুত্রক হওয়ায় বংশ রক্ষার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে প্রখ্যাত অন্ধমুনি দৃঘতমাসের শরণাপন্ন হন। রাজার প্রবল কাকুতি-মিনতিতে এক সময় মুনি করুণা করে তাঁর ঔরসে রাণীর গর্ভে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম নামক পাঁচ পুত্র সন্তান দান করেন। পরবর্তীতে এঁদের বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ নামে পাঁচটি সমৃদ্ধ জনপদের সৃষ্টি হয়। Ñএ গল্পটি নিছক পুরাণালেখ্য হলেও খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে রচিত সাহিত্যে এ সকল জনপদের নাম থেকে এগুলোর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থাকেনা। বাংলাদেশের বর্তমান উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্র অঞ্চল উল্লিখিত পুন্ড্র জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি পুন্ড্র জনপদ এ অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন হওয়ায় এখানকার উঁচু ভূমিতেই প্রথম মানববসতি ও সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ বলেছেন- বাংলার রাঢ়-বরেন্দ্রই প্রাচীন। পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গ অর্বাচীন। রাঢ় ছিল অনুন্নত ও অজ্ঞাত। তাই বরেন্দ্র নিয়েই বাংলার ইতিহাসের শুরু। মানুষের আদি নিবাস ছিল সাইবেরিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। সেখান থেকেই নানা পথ ঘুরে আসে ভূমধ্যসাগরীয় দ্রাবিড়, নিগ্রো, সাইবেরীয়, নর্ডিক-মোঙ্গল। এরাই অষ্ট্রীক, দ্রাবিড়, শামীয়, নিগ্রো, আর্য, তাতার, শক, হূন, কুশান, গ্রীক, মোঙ্গল, ভোটচীনা প্রভৃতি নামে পরিচিত। আমাদের গায়ে আর্য-রক্ত সামান্য, নিগ্রো-রক্ত কম নয়, তবে বেশি আছে দ্রাবিড় ও মোঙ্গল-রক্ত, অর্থাৎ আমাদেরই নিকট জ্ঞাতি হচ্ছে কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল, নাগা, কুকী, তিব্বতী, কাছাড়ী, অহোম প্রভৃতি। ক্স
কেবল ঐতিহাসিক নয়, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সমৃদ্ধতর সুজলা-সুফলা এ দেশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন জাতির বিশেষ আকর্ষণ ছিল, যার পরিণতিতে নানাবিধ উপলক্ষে এখানে তাঁদের আগমন বা আগ্রাসন। এদেরই একটি দল মধ্য এশিয়ার যাযাবর আর্য জাতি। আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, বৈদিক যুগের শেষ দিকে বহিরাগত আর্যরা অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় ভুখন্ডে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য যে ভারত ভূখন্ডে প্রবেশের এক হাজার বছরের মধ্যে তারা বাংলায় স্থানু হতে পারেনি। আর্য-রচিত বৈদিক সাহিত্যে এর কারণ হিসেবে বাংলায় বসবাসকারী আদি জাতিগোষ্ঠীর অনুন্নত সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিন্দা জ্ঞাপন থাকলেও তা যে পরাজিতের ক্ষোভ ভিন্ন অন্য কিছু নয় তা সহজেই অনুমেয়। বাংলার মানুষ এসকল বহিরাগত আর্যদের কাছে সহজে তাদের আত্মমর্যাদাবোধ বিকিয়ে দেয়নি।
ইতিহাসের সূত্র ধরে জানা যায়, ভারতে আগমনের পর আর্যরা বার বার এ ভূখন্ড অধিকার করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, আর বার বার তাদের আগ্রাসনকে রুখে দিয়েছে এখানকার অদি অধিবাসী কোল, ভিল, মুন্ডা, সাঁওতালগণ। আর্যরা প্রথমদিকে কৃতিত্ব দেখাতে না পারায় বঙ্গের লোকদের ম্লেচ বলে উপহাস করত এবং এদের ভাষা নিয়ে ব্যঙ্গ করত। কিন্তু একসময় যুদ্ধজ্ঞানে দক্ষ আর্যরা যুদ্ধে ঘোড়া ও লোহার ব্যবহার শুরু করলে এখানকার স্থানীয়দের পরাভব ঘটে। এরপর কালক্রমে হিন্দু বর্ণব্যবস্থার উপরের স্তরে আসীন হয় আর্যরা। স্থানীয় নরগোষ্ঠীদের দিয়ে তৈরি হয় নীচের স্তর।
এখান থেকেই শুরু স্বাধীনতা খুঁজে ফেরার ইতিহাস। এরপর আর নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি এদেশের মানুষ। ৩২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে উত্তর বাংলা দখল করে সর্বভারতীয় মৌর্যসাম্রাজ্য। সে সময় সমগ্র উত্তরবঙ্গ বা উত্তর বাংলা পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্র জনপদ নামে পরিচিত ছিল্। পরবর্তীতে এ অঞ্চল বরেন্দ্র নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। বর্তমান বগুড়ার মহাস্থাগড়কে কেন্দ্র করে পুন্ড্রনগরের পত্তন ঘটায় মৌর্য্যরা। কিন্তু বাংলার মানুষ এ বিদেশী শাসনকে মেনে নিতে না পেরে স্বাধীন রাজ্য গড়ার প্রয়াস পায়। মৌর্য্যযুগেই তারা গঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে তোলে স্বাধীন ও শক্তিশালী গঙ্গারিডি রাজ্য।
গ্রীক ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সম্রাট আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে এ ভূখন্ডে গঙ্গারিডি নামক রাজ্যটি পরাক্রান্ত ছিল। এ রাজ্যের তখন ৬০ হাজার পদাতিক সেনা, ১ হাজার অশ্বারোহী সেনা এবং ৭ শত রণহস্তি ছিল। মহাবীর আলেকজান্ডার নাকি গঙ্গারিডির এ ধরনের পরাক্রম-শক্তির কথা জানতে পেরে এ রাজ্য পরাভূত করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেছিলেন। প্লিনি, টলেমি এবং রোমান কবি ভার্জিলের লেখাতেও গঙ্গারিডি রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধির উল্লেখ রয়েছে। অবশ্য খ্রিষ্টাব্দ শুরুর তিনশ বছর পূর্ব থেকে খ্রিষ্টাব্দ শুরুর পরবর্তী তিনশ বছর পর্যন্ত মোট ছয়শ বছরের বাংলার ইতিহাস এখনো উদঘাটন করা যায়নি।
মৌর্যদের পরে তিন শতকের মধ্যে সর্বভারতীয় রাজবংশের পত্তন ঘটায় গুপ্তরা। মহারাজ শ্রীগুপ্তের শাসনামলে বরেন্দ্র গুপ্ত-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু বর্হিদেশীয় রাজাদের শাসন এদেশের মানুষকে স্বস্তি দেয়নি বলে তারা নিজেদের স্বাধীনচেতা ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছে বিভিন্ন স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ অঞ্চলে গুপ্তশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বাংলার মানুষ কয়েকটি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটায়, যেমন- দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সমতট রাজ্য, পশ্চিম বাংলার পুষ্করণ রাজ্য। এরইমধ্যে ৬ শতকের দিকে গুপ্তসাম্রাজ্যে অরাজকতা শুরু হলে এবং পতন ঘটলে এদেশের মানুষ মুক্তির প্রত্যাশায় বঙ্গরাজ ও গৌড়রাজ নামে আরও দুটি স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটায়।
৭ শতকের প্রথম দিকে রাজা শশাঙ্ক নিজ যোগ্যতাবলে গৌড়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। গৌড় তথা বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা হিসেবে খ্যাত শশাঙ্কর মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় পরবর্তী প্রায় একশ বছরের অরাজকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এ বঙ্গভূখন্ড। একদিকে বিদেশী শত্রর আক্রমণের আশঙ্কা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিদ্রোহ, ঠিক মাৎস্যনায় যুগের মতো। তবে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অর্জিত সংগ্রামী অভিজ্ঞতা এখানকার মানুষকে হতাশায় বিপর্যস্ত না করে নতুন প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটাতে প্রেরণা যোগায়। ৮ শতকের মধ্যভাগে তারা নিজেদের মধ্য থেকে গোপাল নামক একজনকে রাজা নির্বাচিত করে। জানা যায়, গোপাল দেব-এঁর রাজ্যাভিষেক এবং রাজধানীস্থল ছিল বর্তমান বরেন্দ্র অঞ্চল তথা তৎকালীন পুন্ড্রবর্ধনে। রাজপদ অলকৃত করার পর তিনি অচিরেই সকল অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী ৪শ’ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। গোপালের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র ধর্মপাল সিংহাসনে বসেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে মগধে বিক্রমশীল বিহার এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁ পাহাড়পুরে সুবিশাল সোমপুর বিহার (তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়), জগদ্দল বিহার, আগ্রাদ্বিগুণ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ শাসনামলে পাল রাজাগণ এ ধরনের বেশকিছু গৌরবজনক অবদান রাখলেও দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়। বাংলার ইতিহাসে এটি একটি তমসাচ্ছন্ন ক্রান্তিকাল। রাজা জনগণের স্বার্থ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ১১ শতকের শেষ লগ্নে রাজা ২য় মহীপালের সময় এ অবস্থা চরম আকার ধারণ করে। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের পাশাপাশি বিদেশী আক্রমণ এক সময় পাল সাম্রাজ্যকে ভঙ্গুর করে ফেলে। বরেন্দ্র অঞ্চলের চাষী কৈবর্ত্যগণ রাজার প্রধান সেনাপতি দিব্যোক কৈবর্তের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহে রাজা পরাজিত এবং নিহত হন। বিদ্রোহীরা বরেন্দ্র দখল করে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করে। অবশ্য সন্ধ্যাকর নন্দীর সাহিত্যে দিব্যোককে দস্যু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ সময় বর্তমান নওগাঁ জেলার পতœীতলা উপজেলার দিবর নামক স্থানে একটি জলাশয় খনন করে বিজয়ী কৈবর্ত্য নেতা দিব্যোক একটি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এদেশের মানুষ তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে এদেশের মানুষ।
সংগ্রাম এদেশের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়ানো, জীবনের অপিরহার্য অঙ্গ। এমনি সময় দক্ষিণাত্যের কর্নাট থেকে আসা বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন শাসকরা উপর্যুপরি আক্রমণে উত্তর-পশ্চিম বাংলা থেকে পাল শাসন এবং পূর্ব-দক্ষিণ বাংলা থেকে বর্ম শাসনের অবসান ঘটায়। শুরু হয় শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের ওপর তীব্র শোষন ও অত্যাচার। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, এ সময়কার মানুষের লেকায়ত জীবনধারা ও ধর্মীয় আচারের ওপর বৈষম্যমন্ডিত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিপন্নতার অনূভব থেকে বিক্ষুব্ধ হতে থাকে জনসাধারণ। এ বিক্ষোভের চরম প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় ১৩ শতকের শুরুতে। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে সামান্য কিছু সেনা নিয়ে সেন সাম্রাজ্য দখল করে নেয় বহির্ভারতীয় মুসলমান সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খলজি। প্রতিবাদের পরিবর্তে মুসলিম শাসকদেরকে মুক্তির কান্ডারী ভেবে তাদের এ আগ্রাসনকে স্বাগত জানায় বাংলার মানুষ। প্রথমে মুসলিম শাসকগণ দিল্লীর সুলতানের গভর্নর হয়ে এদেশে আসলেও ক্রমইে তাঁদের অধিকাংশ এদেশের মাটি ও মানুষকে ভালবেসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে নাসির উদ্দিন ইব্রাহীম শাহের সময় থেকে এ স্বাধীনতা স্থিতিশীলতা পায়। এরপর প্রায় ২শ বছর স্বাধীন সুলতানদের শাসনাধীনে কাটে বাংলার রাজনৈতিক পরিমন্ডল।
স্বাধীন সুলতানী শাসন আবসান এদেশের মানুুষের জন্য আরেকটি বিপর্যয় নিয়ে আসে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে আফগান শের খান সুর এদেশে আফগান-শাসন প্রতিষ্ঠা করলে এদেশের মানুষ সুলত্নাী আমলের ধারাবাহিক সমৃদ্ধির ধারা থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে। এরপর ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আফগান নরপতি দাউদ কররানী মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হলে এ ভূখন্ড মোগল সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়। বিদেশী মোগলদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এখানকার স্থানীয় জমিদারগণ প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বারো ভুঁইয়া নামে খ্যাত বাংলার জমিদারদের এ জোট প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত এদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
মোগল শাসনাধীনের এক পর্যায়ে এখানকার নবাবগণ বাংলার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে সম্মান জানিয়ে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে সচেষ্ট হয়। নবাব মুর্শিদকুলি খান থেকে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন জগৎ শেঠের নীলনক্সা, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ ও ইয়ার লতিফের ষড়যন্ত্র এবং মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রায় ২ শত বছরের অন্ধকার নেমে আসে এদেশের মানুষের জীবনে। শুরু হয় বেনিয়া বৃটিশ শাসন-শোষণে পরাধীনতার নির্মম এক কালো অধ্যায়।
১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশেমের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতায় পরিণত হয় বৃটিশ বণিকরা। শুরু হয় কোম্পানী-শাসন। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড ক্লাইভ বাংলার কোম্পানী গভর্নর হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দ্বৈতশাসন প্রবর্তিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে চরম দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে এদেশের মানুষ। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে কুখ্যাত এ বিপর্যয়ে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যবরণ করে। তবে বিদেশী বেনিয়াদের এসকল অনাচার মুখ বুজে সহ্য করেনি এদেশের মানুষ। অর্ধজাহানের মালিক, বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধর বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হেরে যাবে জেনেও বিদ্রোহ করেছে, জীবন দিয়েছে। আর এ বৃটিশবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে সম্মানিত হয় এ বঙ্গভূখন্ড। বৃটিশ শাসনের পুরো সময়টি এদেশের মানুষের উত্তাল সংগ্রামের সময়, যেমন- সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০- ১৮০০), মাঝি বিদ্রোহ (১৭৬৬-১৭৮৩), সমরেশ গাজীর বিদ্রোহ (১৭৬৭-১৭৬৮, ১৮৪৪-১৮৯০), সন্ধীপের বিদ্রোহ (১৭৬৯, ১৮১৯, ১৮৭০), চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৭০, ১৭৭৯), কৃষক তন্তুবায় বিদ্রোহ (১৭৭০-১৭৮০), গারো বিদ্রোহ (১৭৭৫-১৮০২), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), নীল চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৭৮-১৮০০, ১৮৩০-১৮৪৮, ১৮৫৯-১৮৬১), লবণ চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০৪), রেশম চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৮০-১৮০০), রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩), খাসি বিদ্রোহ (১৭৮৩), বরিশালের বিদ্রোহ (১৭৯২), গঞ্জাম বিদ্রোহ (১৭৯৮), নায়ার বাহিনীর বিদ্রোহ (১৮০৪), খান্দেশের বিদ্রোহ (১৮০৮), জাঠ বিদ্রোহ (১৮০৯), ময়মনসিংহের কৃষক বিদ্রোহ (১৮১২-১৮৩০), গুজরান বিদ্রোহ (১৮১৩), ভীল বিদ্রোহ (১৮১৮), বুন্দেল খান্দী বিদ্রোহ (১৮২৪), কিটুর বিদ্রোহ (১৮২৪), ভূমিজ বিদ্রোহ (১৮৩২), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৩২), নাগা বিদ্রোহ (১৮৩৯), কোলাপুর বিদ্রোহ (১৮৪৪), খোন্ড বিদ্রোহ (১৮৪৬) সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৭), সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৫৭), সুন্দরবন অঞ্চলের বিদ্রোহ (১৮৬১), সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭২-১৮৭৩), রাজশাহীর প্রজা-বিদ্রোহ (১৮৮৩-১৮৮৮), তেভাগার দাবিতে কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪৬-১৯৪৭) প্রভৃতি।
তবে সিপাহী বিদ্রোহ নামে খ্যাত ১৮৫৭ সালে বৃটিশবিরোধী মহাঅভ্যুত্থান ইংরেজ-শাসনের ভিত নড়বড়ে করে তোলে। এরপর দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে নীল বিদ্রোহ। নওগাঁ, রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় নীলচাষীগণ ইংরেজ নীলকরদের নীলকুঠি আক্রমণ করে এবং নীলচাষকে ইচ্ছাধীন চাষযোগ্য ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে বৃহত্তর রাজশাহীর প্রজা বিদ্রোহ (১৮৮৩-১৮৮৮)। ইংরেজ শাসকদের ক্রমবর্ধমান খাজনা-নীতির প্রতিক্রিয়ায় তাদের দোসর স্থানীয় রাজা হরনাথের নিপীড়নের প্রতিবাদে প্রায় ৫ বছর এ আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এভাবেই একের পর এক সচেতন গণজাগরণের কারণে পরাভব মানে বৃটিশ শাসকরা। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই বৃটিশ পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন পাশ করে এদেশ থেকে তারা বিদায় নেয়। সা¤প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে ২৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৫ আগস্ট জন্ম নেয় ভারত।
ভারত থেকে বিযুক্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান ধর্মের একতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও সে ধর্ম যে কেবল স্বার্থবাদী অভিজাতদের ব্যবহারধর্ম, তা বুঝতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি এই ভূখন্ডের অধিবাসীদের। সেন যুগে ব্রাহ্মণ শাসকদের অত্যাচার থেকে যেমন স্বধর্মের মানুষেরা রক্ষা পায়নি, তেমনি ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষেরাও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই পায়নি। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অর্জিত সংগ্রামী অভিজ্ঞতা এদেশের মানুষকে আবার প্রাণিত করে নব্য ব্রাহ্মণ্যবাদী পাকিস্তানীদের রুখে দাঁড়াতে। রূখে দাঁড়ায়, রক্ত ও প্রাণ সঁপে দেয়, স্বাধীনতা অর্জন করে এ বঙ্গভূখন্ড, বাংলাদেশ।
রবিবার, ২৫ মার্চ, ২০১২
শনিবার, ৩ মার্চ, ২০১২
একাত্তরের উত্তাল মার্চের ছাব্বিশটি দিন
স্বশাসনভিত্তিক ৬ দফা ইস্যুতে পাকিস্তানের পর্ব অংশের জনতা সাধারণ নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধিদের জয়যুক্ত করে। অভূতপূর্ব এ গণরায়ে ভীত হয়ে পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও পুঁজিবাদী চক্র। ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের পরিবর্তে চলমান ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ বজায় রাখার জন্য পেশাগত প্রবণতার কারণে তারা বেছে নেয় দমন-পীড়ন আর হত্যার সামরিক পন্থা। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে ঘটে এর চরম প্রকাশ। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে নামে জনতা।
১ মার্চ ’৭১, সোমবার
দুপুর ১ টার বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব-ঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করেন। এ ভাষণে তিনি পাকিস্তান পিপল্স পার্টির অনাগ্রহ এবং ভারত-সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। একইদিনে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্ণর পদ থেকে এসএম আহসানকে অপসারণ করে তার স্থলে সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুবকে গভর্নরের অতিরিক্ত বেসামরিক দায়িত্ব প্রদান করেন।
বেতারে এ অনাকাক্সিক্ষত ঘোষণা শোনামাত্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ও ছাত্রলীগে নেতাদের নেতৃত্বে সকল শিক্ষার্থী দলে দলে তাদের ক্লাস ও আবাসিক হল থেকে বটতলায় এসে জড়ো হয়। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে প্রতিবাদসভার পরিকল্পনা ঘোষিত হয়। অন্যদিকে ঢাকা শহরের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সহযোগে বিক্ষুব্ধ মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে রাজধানী শহরের রাস্তাগুলো, ’স্লোগান- তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা’, জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, জয় বাংলা’। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, যানবাহন। বিমানবন্দরে ব্যরিকেড। পরিত্যাক্ত হয় স্টেডিয়ামে চলতে থাকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। বিকাল ৩ টায় মিছিলসমেত হাজার হাজার মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে জড়ো হয়, সেখানে আওয়ামীলীগের সভা চলছিল। সভায় উপস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইয়াহিয়া কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি ২ মার্চ ঢাকা শহরে, ৩ মার্চ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার কথা ঘোষণা করেন। ছাত্রনেতৃবৃন্দকে ডেকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ মেতাবেক বিকেলে ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আসম আব্দুর রব এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন এক গোপন বৈঠকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন।
ছাত্রনেতাদের আহ্বানে বিকেলে পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত তোফায়েল আহমেদ, আবদুল মান্নান, সিরাজল আলম খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ দেশের সকল মানুষকে শেখ মজিবের নেতৃত্ব ও নির্দেশ মেনে সকল কর্মসূচী বাস্তবায়নে আহ্বান করেন।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের বেতার ঘোষণাকে পাকিস্তান মুসলীগ লীগের প্রধান খান আব্দুল কাইউম খান সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানালে এর প্রতিবাদে দলের মহাসচিব খান এ সবুর খান দলের সম্পাদক ও সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
পাকিস্তান-রাষ্ট্রের অখন্ডতার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে কোনো খবর প্রকাশ করা যাবেনা এই মর্মে নতুন আদেশ জারি করা হয়।
২ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঢাকা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। রাজাধানী জুড়ে স্তব্ধতা। সকাল ১১ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমবেত সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের নেতা আসম আব্দুর রব প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা উত্তোলন করেন।
নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্ত্বে এ সভায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী অসহযোগ আন্দোলন শুরু এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভাশেষে বায়তুল মোকাররম অভিমুখে এক বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে এ বায়তুল মোকররম এবং পার্শ্ববর্তী পল্টন ময়দানে অনির্ধারিত এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জনতার ঢল শহরের সর্বত্র। দেশবাসীর এ ধরনের স্বতস্ফূর্ত কর্মকান্ডে ভীত হয়ে এদিন সন্ধ্যা ৭টায় আকস্মিকভাবে কারফিউ জারি করে পাকিস্তান সরকার। কারফিউ-র প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। মিছিলের পর মিছিল সারা শহরে। গর্জে ওঠে স্বৈরাচার সরকারের আগ্নেয়াস্ত্র। কারফিউ ভঙ্গকারী মিছিলের মানুষকে নির্বিচারে গুলি করা হয়। ঢাকার সকল রাজপথ বিক্ষোভকারী জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। হাসপতালগুলোতে বাড়তে থাকে বুলেটবিদ্ধ আহত মানুষের ভিড়। সরকারের সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারী জনতার ওপর গুলিবর্ষণে কেবল ঢাকাতেই ২৩ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়। চট্টগ্রামে পুলিশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালিদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। সংঘর্ষ, হামলা, অগ্নিকান্ড ও গুলিতে প্রায় ৪ শত মানুষ হতাহত হয়।
শেখ মুজিবর রহমান সাধারণ মানুষের ওপর সরকারের এ গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। এক বিবৃতিতে ৩ মার্চকে জাতীয় শোকদিবস ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল ঘোষণা করেন।
সরকার ১১০ নম্বর সামরিক আদেশবলে পত্রপত্রিকার প্রকাশিত সংবাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সকাল ১১ টার দিকে ফার্মগেট এলাকা সংগঠিত মিছিলে সামরিক বাহিনী গুলিবর্ষণ বেয়নেট চার্জ করলে ৯ জন হতাহত হয়। এ ঘটনায় ন্যাপ ও জাতীয় লীগের উদ্যোগে পল্টন ও বায়তুল মোকাররমে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তৃতা করেন ন্যাপের মতিয়া চৌধুরী, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, নূরুল ইসলাম প্রমুখ এবং জাতীয় লীগের সভায় আতাউর রহমান। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে সমাগত এক জনসভার ভাষণে বাংলার জনগণের আন্দোলন সংগ্রামকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পাক সরকারের সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাইকে সাবধান থাকতে বলেন। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আন্দোলনরত জনতা রাতে কারফিউ ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে বেরিকেড রচনা করে। শহীদের লাশ নিয়ে ইকবাল হল (বর্তমান জহরুল হক হল, ঢাবি) থেকে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে চূড়মার করে বিক্ষোভ মিছিল চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
অন্যদিকে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের জন্য কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান। পাশাপাশি সত্যিকার ফেডারেশনে দুই কক্ষবিশিষ্ট পরিষদ গঠন হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন। সন্ধ্যায় করাচিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পিপল্স পার্টি বাদে বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর এক বৈঠকে চলমান পরিস্থিতিতে ভুট্টোর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়। আগামী ৫ দিনের মধ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবশেন আহ্বানের দাবি জানানো হয়। একইভাবে লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিল লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) নূর খান জাতীয় পরিষদ স্থগিত হওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতির কথা উল্লেখ করে মার্চ মাসের মধ্যে জাতীয় পরিষদের নতন তারিখ ধার্য করার আহ্বান করেন।
৩ মার্চ ’৭১, বুধবার
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারাদেশে স্বতস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে লাশের সারির পাশে হাজারো মানুষের কান্নার মিছিল। সকালের শোকমিছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষেরা অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদমিনারে সমবেত হন। সকাল ১১ টার দিকে গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বটতলায় মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে শিক্ষকদের এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। শুরু হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ মিছিল।
জেনারেল ইয়াহিয়া বেতার মারফত শেখ মুজিবসহ জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারি গ্র“পের ১২ জন নেতাকে ১০ মার্চ ঢাকায় এক বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে এক বিৃবতি প্রদান করেন। এতে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পাকিস্তানী সেনাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং অব্যাহত সামরিক প্রস্তুতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিকেলে পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভায় পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন- ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল। সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং জনগনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ট্যাক্স ও খাজনা বন্ধ থাকবে। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষকে বেলা ২ টার পর রিকশাওয়ালাদের অপেক্ষাকৃত বেশি ভাড়া এবং আহত ব্যক্তিদের রক্ত দান এবং সাংবাদিকদের নির্ভিকভাবে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানান। তিনি সেনাবাহিনীর হামলায় দেশব্যাপী নিহত শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।
ছাত্রলীগ আয়োজিত পল্টন জনসভায় যোগদানকারী লাখ লাখ মানুষ যে-স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাশা করেছিল সে-প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জনসভায় এ বহুল প্রতিক্ষিত ঘোষণাপত্র সর্বসমুখে পাঠ করা হয়। এ ঘোষণাপত্রে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদশের ঘোষণা ও কর্মসূচী, স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য কর্মপন্থা, স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা বর্ণনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শহীদমিনারে আয়োজিত এক জনসভায় ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, ’বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে।’
এই দিন ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পাকবাহিনীর গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ শহীদ হয়। সিলেট, রাজশাহী ও রংপুরে কারফিউ জারি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত এমভি সোয়াত থেকে সৈন্য ও গোলবারুদ নামাতে অস্বীকৃতি জানালে পাকসেনা ও নৌবাহিনী বন্দরের শ্রমিক-জনতার ওপর গুলি চালায়। শতাধিক শ্রমিক-জনতা শহীদ হয়।
অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাব পাকিস্তান ফ্রন্ট পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর চলমান ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন এবং এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খান করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন- আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই বর্তমান সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
৪ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
সারাদেশে পূর্ব-ঘোষিত সর্বাত্মক হরতাল পালিত। রেডিও পাকিস্তান’ পরিণত হয় বাংলাদেশ বেতার’-এ। বেতার ও টেলিভিশনে হরতালের সমর্থনে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়। খুলনা ও রংপুরে কারফিউ বহাল থাকলেও ঢাকায় তুলে নেওয়া হয়েছে। খুলনায় হরতাল পালনকালে পাকবাহিনীর হামলায় বহু মানুষ হতাহত। ঢাকায় গত দুই দিনে গুলিতে আহতদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু-সংবাদ পাওয়া গেছে। দুই দিনে ঢাকায় মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয় মোট ১২১ জন। যশোরে পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হয় মিছিলে অংশগ্রহণকারী চারুবালা ধর। জনতা তাঁর লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালিদের অব্যাহত আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩ মার্চ ও ৪ মার্চ- এই দুই দিনে এখানে ১২০ জন শহীদ এবং ৩৩৫ জন আহত হয়।
সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশ ও শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর ব্যারাকের বাঙালি জওয়ানরা জয় বাংলা’ স্লোগানোর মাধ্যমে রাজপথের মিছিলকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। দেশের সর্বত্র বেসামরিক প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চট্ট্রগামের লালদিঘি ময়দানে পাকসেনা কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে এক গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমআর সিদ্দিকী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকায় জাতীয় লীগের এক জরুরি সভায় অলি আহাদ অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্য্হাার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।
মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জানান। বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রেও বিরদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বানে দেশের প্রতিটি মানুষ যে স্বতস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছে সেজন্য বীর জনতাকে অভিনন্দন জানান। রাত ১১ টায় রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর কাছে কতিপয় প্রস্তাব নিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এসএম আহসান এদেশের মানুষের অধিকারের ন্যায়সঙ্গত বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের চরশান কর্মকান্ডের সমালোচনা করলে তাঁকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তাঁর স্থলে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেলিফোন মারফত এ ঘটনা জানতে পেরে তিনি এদেশ থেকে বিদায় নেন এবং বিদায় নেবার প্রাক্কালে বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে শভেচ্ছা জানান।
অন্যদিকে, করাচিতে ভুট্টো এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, দেশের সংহতির জন্য তাঁর দল যতদূর-সম্ভব হয় ৬ দফার কাছাকাছি যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মুসলিম লীগ (কনভেনশন) এর সাধারণ সম্পাদক এএনএম ইউসুফ ১০ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডাকার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। জমিয়তুল উলামা-ই ইসলামের নেতা মাওলানা গোলাম গাউস হাজারভি পিপিপি নেতা ভুট্টোর সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত না থাকার জন্য হুমকির কঠোর সমালোচনা করেন। বেলুচিস্তান ন্যাপ (ওয়ালি) জাতীয় সংসদ অধিবশেন স্থগিত করার প্রতিবাদে সমগ্র বেলুচিস্তানে ১২ মার্চ হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
৫ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প-এলাকায় সেনাদের গুলিবর্ষণে বহু শ্রমিক হতাহত হওয়ার প্রতিবাদে সমগ্র এলাকা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা টঙ্গীর কাঠের সেতুটিতে আগুন জ্বালায় এবং গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। নিহত শ্রমিকদের লাশ নিয়ে রাজধানীতে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। চট্টগ্রামে পাকসেনাদের গুলিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৮ জনে। নিহতদের স্মরণে হরতাল পালিত। হরতাল চলাকালে গুলিতে ৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়। শহর জুড়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল, গণজমায়েত।
ফরিদপুরের স্থানীয় জনতা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে এবং বিরাট মিছিল নিয়ে সার্কিট হাউস ঘেরাও করে। সেখানে অবস্থানকারী পাকবাহিনী ঘেরাও কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী নাগরিকের দিকে মেশিনগান তাক করলে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকগণ জনতার চলমান সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শহীদমিনারে গিয়ে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করেন। এ সময় ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি লাঠিমিছিল বের করা হয়। মতিয়া গ্র“প ছাত্র ইউনিয়ন শহীদমিনারে এক সমাবেশ আয়োজন করে। পুরানা পল্টনে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় কার্যালয়সহ দেশের প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও শান্তি-শৃক্সক্ষলা রক্ষার জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ এক বিৃবতিতে অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানান। এ সময় বিদেশী গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি- এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং পাকসেনা কর্তৃক নির্যাতন ও গণহত্যা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এদিন করাচি থেকে আসগর খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন এবং পাক সরকারের ভবিষ্যত কর্মপন্থা সম্পর্কে ধারণা বিনিময় করেন। একইদিনে জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঢাকায় পৌঁছান। সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবার ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষনায় বলা হয়, শেখ মুজিবর রহমান শান্তির জন্য আহ্বান জানানোর পর গত ২৪ ঘন্টায় দেশে সাধারণ আইন-শৃক্সক্ষলা পরিস্থিতিতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর দীর্ঘ ৫ ঘন্টা শলাপরামর্শ শেষে দলের মুখপাত্র মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিষদ স্থগিত রাখার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া যুক্তিযুক্ত নয়।’
৬ মার্চ ’৭১, শনিবার
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত। ঢাকার কেন্দ্রিয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১ জন বন্দি পলায়ন করে, তাদের মধ্যে পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বাঁশের লাঠি, লোহার রড ও কালো পতাকা নিয়ে নারী সমাজ এক বিরাট জঙ্গি মিছিল বের করে। মিছিল বের করে পেশাদার শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল, বামপন্থী শিক্ষার্থীগণ। অলি আহাদের সভাপতিত্বে পল্টন ময়দানে জনসভা এবং মোজাফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কাজী জাফরের সভাপতিত্বে শ্রমিকসভা ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দ এক বিৃবতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণ রেডিওতে সরাসরি স¤প্রচারের দাবি জানায়। সন্ধ্যায় ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্র-সংগঠন এক বিরাট মশাল-মিছিল বের করে। প্রায় ৪ লাখ লোকের এক বিশাল গণবাহিনী যশোর আক্রমণ করে। এতে পাকবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে ক্যান্টনমেন্টে পালিয়ে যেতে থাকলে অনেকে জনতার হাতে ধরা পড়ে। একইসঙ্গে লুটতরাজে লিপ্ত অনেক অবাঙালি বিহারী জনতার হাতে ধরা পড়ে।
অন্যদিকে, লাহোরে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং পাঞ্জার প্রদেশের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ জনকে একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সরকার। জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের খবর সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ জনতাকে দু®কৃতকারী আখ্যা দেন এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান করেন। বেতার ভাষণের পর পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির এক জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রেসিডেন্টের বেতার ঘোষণা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
৭ মার্চ ’৭১, রবিবার
আজ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ। গতকাল থেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র থেকে মানুষ নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে দলে দলে স্রোতের মতো এসে জড়ো হয় রেসকোর্সের বিস্তৃত ময়দানে। হাতে বাঁশের লাঠি আর কন্ঠে জয় বাংলা’ ধ্বনি। লক্ষ্য অভিন্ন- স্বাধীকার ও মুক্তি। তারা সকলে মুক্তির বাণী শুনতে এসেছে।
বেলা সোয়া তিনটায় বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। সঙ্গে সঙ্গে দশ লক্ষাধিক মানুষের জনসমুদ্র থেকে জয় বাংলা’র উত্তাল স্লোগানে আপ্লুত হন নেতা। স্বভাবসুলভ জলদগম্ভীর কন্ঠে ঘোষণা করেন জনতার প্রাণের কথা : এবারের সংগ্রামÑ আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’ বঙ্গবন্ধু এ ভাষণে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখা এবং যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করার আহ্বান জানান।
সারা দেশের মানুষ যারা জনসভায় উপস্থিত হতে পারেননি তারা তাদের নিকটস্থ রেডিওসেট নিয়ে অধীর আগ্রহে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকে। বেলা ২-১০ থেকে ৩-২০ পর্যন্ত ঢাকা বেতারে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রিলে করে স¤প্রচার করার মুহূর্তেই আকস্মিকভাবে ঢাকা বেতারের অধিবশেন সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মস্থল পরিত্যাগ করে এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে প্রচার করা না হলে তারা কাজে যোগদান করবে না বলে জানিয়ে দেয়। অতপরঃ গভীর রাতে সামরিক কতৃপক্ষ এ ভাষণ প্রচার করার অনুমতি প্রদান করে এবং পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়েই ঢাকা বেতারকেন্দ্র পুনরায় চালু হয়।
বিকেলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সমাপ্ত হওয়ার পরপরই পাকিস্তানের এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খান অবিলম্বে শামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং সংখ্যাগরিষ্ট দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যে শর্ত দিয়েছে তাকে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত বলে উল্লেখ করেন। রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে বিবৃতি দিতে গিয়ে অবিলম্বে সেনাদের ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়া, বেসামরিক মানুষদের প্রতি গুলিবর্ষণ বন্ধ করা, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাসদস্য আনা বন্ধ করা, পুলিশ ও বাঙালি ইপিআরদের ওপর আইন-শৃক্সক্ষলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করার জোর দারি উত্থাপন করেন। একইসঙ্গে হুশিযার করে দিয়ে বলেন, সামরিকভাবে মোকাবেলার নীতি যদি অব্যাহত থাকে এবং নিরস্ত্র জনসাধারণ যদি বুলেটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে, তাহলে জাতীয় পরিষদ যে কখনোই কাজ করতে পারবেনা এতে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয়।’
৮ মার্চ ’৭১, সোমবার
বঙ্গবন্ধুর গতকালের ভাষণ থেকে সংগ্রামের নতুন পর্যায়ের সূত্রপাত। সারাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে। পুনরায় চালু ঢাকা বেতার কেন্দ্র। সরকারি প্রেসনোট প্রকাশ করা হয়। এতে নিহতের সংখ্যা ১৭২ জন এবং আহতের সংখ্যা ৩৫৮ জন বলে উল্লেখ করা হয়। জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ সঙ্গে সঙ্গে সরকারি প্রেসনোটের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেন এবং ৭ মার্চের ভাষণে উল্লিখিত বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এক সভায় কতিপয় প্রস্তাব গৃহিত হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আগামী কাউন্সি অধিবেশন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পরিবর্তে কেবল ছাত্রলীগ নাম ব্যবহার, প্রতিটি জেলা থেকে শুরু করে সারাদেশে ছাত্রলীগের প্রাথমিক ইউনিট পর্যন্ত ১১ সদস্যবিশিষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন, আঞ্চলিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন, দেশের সকল সিনেমা হলে পাকিস্তানী সঙ্গীত বাজানো ও পাকিস্তানী পতাকা প্রদর্শন বন্ধ, উর্দু গ্রন্থ প্রকাশ বন্ধ ইত্যাদি।
এদিন ঢাকায় কর্মরত ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীর ১৭৮ জন নাগরিক দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা পূর্বক ঢাকা ত্যাগ করে। অন্যদিকে, পাক-সরকারের একান্ত অনুগত হিসেবে খ্যাত নূরুল আমীন এবং খান এ সবুর পৃথক পৃথক বিবৃতিতে পাক-সরকারকে অবিলম্বে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান।
৯ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
সারাদেশে পূর্বঘোষিত হরতাল পালিত। জেনালে টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। ফলে টিক্কা খান এ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকায় আসবেন- সরকারীভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
রাজশাহীতে ৮ ঘন্টার জন্য কারফিউ জারি করা হয়। ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানায়। ন্যাপ-প্রধান মওলানা ভাসানী পল্টনের এক জনসমুদ্রে দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেন যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবেনা। কোনো প্রকার আপোষও সম্ভব নয়।
দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ৬ মার্চ প্রেসিডেন্টের বেতার-ভাষণের নিন্দা জ্ঞাপন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দেশ রক্ষার্থে শেখ মুজিবরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এ সভায় আরও বক্তৃতা করেন আতাউর রহমান খান। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অবিলম্বে জাতীয় সরকার ঘোষণার জন্য আহ্বান করেন। মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে বৈঠক।
১০ মার্চ ’৭১, বুধবার
দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত স্বাধীন পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক ইশতিহারে দেশের সকল বাড়ি ও যানবাহনে কালো পতাকা নির্দেশের ঘোষণা প্রদান করে। একইসঙ্গে তাঁরা বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ, আইবি, সিআইডি-কে পাকিস্তানী প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাঙালি ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজ বাসভবনে একদল বিদেশী সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার-বৈঠকে মিলিত হন। এ সময় তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, শুধু জাতিসংঘ সদস্যদের ঢাকা সরিয়ে নিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, কারণ আজকের এই হুমকি গণহত্যারই হুমকি। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৭ কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার পর্যদস্ত করার হুমকি...।’
সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৪ নং সামরিক নির্দেশ জারি করে তাতে উল্লেখ করে- যদি কেউ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সরকারি সম্পত্তি বিনাশ, অথবা সেনাবাহিনীর চলাচল কিংবা সেনাবাহিনী সংরক্ষণে বাধা সৃষ্টি করে--- এরকম সড়ক, রেল ও বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহে অন্তরায় সৃষ্টি করে তাহলে তাদের তৎপরতা হামলার সমতুল্য এবং সামরিক বিধিতে দন্ডনীয় বলে গণ্য করা হবে। এই দিন নারায়নগঞ্জের কারাগার থেকেজ ৪০ জন কয়েদির পলায়ন করে, পুলিশের গুলিতে ২৭ জন আহত হয়।
পল্টন ময়দানে এক জনসভায় জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুকে কালবিলম্ব না করে জাতীয় সরকার ঘোষণার জন্য আহ্বান করেন। ন্যাপ সম্পাদক মশিয়ুর রহমান বলেন, আজ রাজনৈতিক কোন্দলের দিন নয়। ন্যাপ কোন্দলে বিশ্বাস করেনা। তাই আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ।’
দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে আর দেরি নয়’ শিরোনামে লেখা হয়, গত এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ববাংলার বুকে প্রচন্ড গণআন্দোলনের মধ্য দিয়া যেসব শিক্ষা উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে সেইগুলি হইল : (এক). বল প্রয়োগ করিয়া জনগণকে দমান যাইবে না, (দুই). জনপ্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে হইবে, (তিন). ক্ষতা হস্তান্তরের জন্য সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে, এবং (চার). জনসমর্থিত ছয় ও এগার দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পথ বাধামুক্ত করিতে হইবে...।’
একইদিনে লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পিডিএম প্রধান নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান বঙ্গবন্ধুর দাবির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের সভাপতি এম খুরশিদ প্রেসিডেন্ট ই্য়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গণঐক্যের নেতা আসগর খান করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
১১ মার্চ ’৭১, রৃহস্পতিবার
বরিশাল কারাগার থেকে ৪০ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। সংঘর্ষে ২ জন কয়েদি নিহত এবং ১০ জন আহত হয়। কুমিল্লা কারাগার থেকে কয়েদিদের পলায়ন এবং গুলিতে ৩ জন নিহত। নারায়নগঞ্জে সিনেমা হলে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তে জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি পরিবেশিত হয়। টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানী এক বিশাল জনসভায় বলেন, স্বাধীনতা ছাড়া আপোষের আর কোনো পথ খোলা নাই।
স্বাধীন বাংল্ াছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা এক যুক্ত বিৃবতিতে বাংলাদেশের জনগণকে পাক-সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খতাব ও পদক বর্জনের আহ্বান করেন। একইসঙ্গে তাঁরা কতিপয় ব্যাংকের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এই দিন সিএসপি ও ইপিসিএস সমিতির পদস্থ বাঙালি সরকারি কর্মচারীরা শেখ মুজিবের আহ্বানে আওয়ামী লীগের তহবিলে তাঁদের ১ দিনের বেতন প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ন্যাপ বাংলাদেশ শাখার সভাপতি মোজাফ্ফর আহমেদ ও ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারি আবাসিক প্রতিনিধি মিস্টার উল্ফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন।
অন্যদিকে, করাচিতে মোহাম্মদ আসগর খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য হাতে আর মাত্র ক’টি দিন আছে; যদি ঢাকায় একটি গুলি চলে কিংবা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে।’
১২ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন, সভা-সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত। সারাদেশের সিনেমা হলের মালিকরা চলমান আন্দোলনের সমর্থনে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সিনেমা হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুদ্দীন পাকিস্তানী খেতাব বর্জন করেন। পূর্ব রেলওয়ে কর্মচারী এবং চারু ও কারুশিল্পীগণ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। বগুড়া জেলখানা ভেঙ্গে ২৭ জন কয়েদির পলায়ন এবং গুলিতে কয়েকজন হতাহত। আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে খাদ্যবোঝাই চট্টগ্রামমুখী মার্কিন জাহাজের গতি পরিবর্তন করে করাচী প্রেরণের ঘটনায় উৎকণ্ঠা ও নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ময়মনসিংহের এক জনসভায় মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবের ওপর আস্থা রাখার জন্য জনগণকে আহ্বান করেন। জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান ও পাঞ্জাবের মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মুলতানে পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, পাকিস্তানের অখন্ডতা ও সংহতি রক্ষার জন্য আমার দল সবরকমের সাহায্য করতে প্রস্তত। আমি ক্ষমতালোভী নই।’ রাওয়ালপিন্ডিতে সরকারি ঘোষণায় আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের নির্ধারিত সম্মিলিত সশস্ত্রবাহিনীর কুচকাওয়াজ, খেতাব বিতরণ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। রেডিও পাকিস্তান করাচি কেন্দ্রের বাংলা খবর পাঠক সরকার কবিরউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর খবরে নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান বর্জন করেন।
১৩ মার্চ ’৭১, শনিবার
শিল্পাচার্য জয়নল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য আবদুল হাকিম পাক-সরকার প্রদত্ত সকল খেতাব ও পদক বর্জন করেন। চট্টগ্রামে নারীসমাজের সমাবেশে বিলাসদ্রব্য বর্জন ও কালো ব্যাজ ধারনের আহ্বান জানানো হয়। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মানী দূতাবাসের কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারবর্গসহ ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক বিশেষ বিমানে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।
১১৫ নং সামরিক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে পাক-সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫ মার্চ সকাল ১০ টার মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এবং ব্যর্থতায় চাকরি থেকে বহিষ্কারসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের কথা উল্লেখ করা হয়। বঙ্গবন্ধু সামরিক কর্তৃপক্ষেও প্রতি এ ধরনের উস্কানিমূলক তৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক জনসভায় মওলানা ভাসানী বলেন, ভুট্টোর উচিত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা। আমরা আমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করব।’
জাতীয় পরিষদের সংখ্যালঘিষ্ঠ দলগুলো আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানায়। লাহোরে জামিয়াতুল উলামা-ই-ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ-এঁর সভাপতিত্বে এ সংখ্যালঘু দলগুলোর এক সভায় বঙ্গবন্ধুর ৪ দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। মুফতি মোহাম্মদ বলেন, পাকিস্তানের নীতিগত ও ব্যবহারিক ধারণার অস্তিত্ব থাকবে না যদি-না পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের ঐক্য থাকে।’ এ সভায় জামিয়াতুল উলামা-ই-ইসলাম ছাড়াও জামাত-ই-ইসলাম, কনভেনশন লীগ, কাউন্সিল লীগ প্রভৃতি দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এই দিন পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর দাবি সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
১৪ মার্চ ’৭১, রোববার
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ২য় পর্যায়ের অসহযোগ আন্দোলনের আজ শেষ দিন। নতুন বিবৃতির মাধ্যমে তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত বাংলাদেশের প্রশাসনভার গ্রহণ করেন। নিজ বাসভবনে ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে রূদ্ধদ্বার বৈঠক। আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দিন আহমদ ও ন্যাপ নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো।
১১৫ নং সামরিক নির্দেশের প্রতিবাদে দেশরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরা নগরীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন শেষে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিৃবতিতে বঙ্গবন্ধু সামরিক কর্তৃপক্ষকে অবিবেচক হিসেবে উল্লেখ করে বেসামরিক কর্মচারীদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার প্রচেষ্টার নিন্দা করেন এবং সামরিক হুমকির কাছে মাথা নত না করতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
ঢাকায় নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) ইমাম হোসেন এক বিৃবতিতে অবিলম্বে বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল অবাঙালি সেনা প্রত্যাহার করে বাঙালি সেনাদের স্থলাভিষিক্ত করার আহ্বান জানান। ঝিনাইদহে কয়েকজন সিএসপি ও পিএসপি কর্মকর্তা প্রয়োজনে দেশের জন্য অস্ত্র ধারণ করার শপথ গ্রহণ করেন। বরিশালে এক জনসভায় আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর প্রতি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করার আহ্বান জানান। সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকার লালবাগ বালুরমাঠে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্যবাহী মন্টেসেলো ডিক্টরি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে, ওসান এগুরাস নামক সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ চট্টগ্রগ্রাম বন্দরে নোঙর করা হয়। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আর সময় নেই’ শিরোনামে এক যৌথ সম্পাদকীয়তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছার জন্য নিবেদন করেন। একইসঙ্গে বহির্শত্র“দের হাত থেকে দেশকে রক্ষা এবং শেখ মুজিব ও তাঁর দলকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, করাচিতে পিপিপি নেতা জলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, সাংবিধানিক সমঝোতার পূর্বে শেখ মুজিবের দাবি অনুযায়ী যদি ক্ষমতা অর্পন করা হয়, তবে পাকিস্তানের দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’
১৫ মার্চ ’৭১, সোমবার
কঠোর সামরিক প্রহরায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, সঙ্গে জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা, জেনারেল হামিদ খান, জেনারেল খোদাদাদ খান, জেনারেল মিঠঠা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল ওমর, জি ডব্লিউ চৌধুরী প্রমুখ ঢাকায় এসে পৌঁছেন। বিমান বন্দরে এ সময় কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
সারাদেশে সরকারি, আধা-সরকারি অফিস আদালতে পূর্ণ কর্মবিরতি পালিত। সকল ভবন ও যানবাহেন কালো পতাকা ও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত। কঠোর সামরিক নির্দেশ উপেক্ষা করে সকালে বেসরকারি কর্মচারীদের সভা ও রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল। শহীদমিনারে চিকিৎসকদের সভা ও নগরীতে শোভাযাত্রা। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তোপখানা রোডে মহিলাদের সমাবেশ। ভ্রাম্যমান ট্রাকে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর গণসঙ্গীত ও পথনাটক পরিবেশন। সন্ধ্যায় শহীদমিনারে বেতার ও টেলিভিশন শিল্পীদের দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন। তাজউদ্দিন আহমদ হরতাল ও ৩৫ দফা কর্মসূচীর সপক্ষে বিবৃতি প্রদান করেন। চলমান পরিস্থিতিতে পূর্ববাংলার কেন্দ্রিয় ও প্রাদেশিক সরকারের সমস্ত শাসনযন্ত্র আওয়ামী লীগের নির্দেশে চলতে থাকে। সকল নির্দেশ জারি করা হয় বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ি থেকে।
স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বায়তুল মোকাররম চত্বরে এক জনসভায় ১১৫ নং সামরিক বিধির কঠোর নিন্দা করেন। বাংলাদেশকে রক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। খুলনার এক জনসভায় আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব্ েএকতাবদ্ধ।’ প্রবীণ রাজনীতিক আবুল হাশিম বলেন, ভুট্টোর কথামতো ইয়াহিয়া চললে পাকিস্তানের বিভক্তি অনিবার্য।’
পিপিপি নেতা ভুট্টো করাচিতে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, কেন্দ্রের ক্ষমতা দেশের দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ... কায়েমি স্বার্থবাদীমহল নির্বাচনে জনগণের বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্য পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। তাছাড়া এখন পাকিস্তান যে অবস্থার সম্মুখীন তাতে দুই অংশের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের প্রশ্ন প্রযোজ্য নয়।’
পিডিপি নেতা নূরুল আমীন ভুট্টোর এ প্রস্তাব অবাস্তব ও নৈরাশ্যকর বলে বিৃবতি দেন। জমিয়াতে ওলামায়ে পাকিস্তান, ন্যাপ (ওয়ালি), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, পিডিপি ও জামাতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতা করাচিতে এক বিবৃতি বর্তমান গুরুতর পরিস্থিতির জন্য ভুট্টোকেই দায়ী করেন।
পিআইএ বোয়িং এবং পাক বিমানবাহিনীর সি-১৩০ বিমানগুলো নিয়মিতভাবে যুদ্ধের সরঞ্জামসহ পাকসেনা বয়ে আনতে থাকে। ঢাকা বিমানবন্দরকে মেশিনগান ও বিমানবিধ্বংসী কামানে সজ্জিত করা হয়। বিমান বন্দর পরিণত হয় যদ্ধ বিমান ঘাঁটিতে।
১৬ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
অসহযোগ আন্দোলনের এই ১৬তম দিনে আন্দোলনের সমর্থনে রাজপথে নামে- কেন্দ্রিয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসেস ফেডারেশন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ব্রতচারী আন্দোলন, স্টেটব্যাংক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ, ঢাকা জিলা সমবায় ইউনিয়ন, নোয়াখালী অ্যাসোসিয়েশন, চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, তাঁতশিল্প উন্নয়ন সমিতি, মগবাজার সংগ্রাম পরিষদ প্রভৃতি।
বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে আইনজীবী, লেখক, শিল্পী, চাকুররিজীবীও সকল শ্রেনীর মেহনতি মানুষ অসহযোগ আন্দোলন অব্রাহত রাখার জন্য দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। কবি আহসান হাবিব তাঁর সিতারা-ই-খেদমত খেতাব বর্জন করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক ইস্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক কেন্দ্রিয় সরকারের সমস্ত রাজস্ব গ্রহণ করতে শুরু করে। এর মধ্যে কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধিন আবগারি ও বিক্রয়কর ছিল।
হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শহীদমিনারে সমাবেশ ও মিছিল। গাজীপুরের টঙ্গী, নারায়নগঞ্জ ও চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের সমাবেশ ও শোভাযাত্রা।
গাজীপুুরের জয়দেবপুরে জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। সামরিক বাহিনী অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালায়- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোহা হল ও মুন্নুজান হল, যশোর ও রংপুর সেনানিবাস এলাকা, ঢাকার পিলখানা- ফার্মগেট- রামপুরা- কচুক্ষেত, খুলনা চট্টগ্রাম এ।
বঙ্গবন্ধু কালো পতাকা-শোভিত একটি গাড়িতে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। পুলিশের গাড়িগুলোতেও ছিল কালো পতাকা। জনতা প্রেসিডেন্ট ভবনের পথে জমায়েত হয়ে জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে নিরস্ত্র ইপিআর বাহিনী। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু জানান, আলোচনা আরও চলবে।
ময়মনসিংহের জনসভায় মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলকৃত করার জন্য শেখ মজিবকে আহ্বান করেন। মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। এমএম আহমদ, মৌলানা শাহ আহমদ নূরানী প্রমুখ কয়েকজন নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ প্রতিনিধি ঢাকায় উপস্থিত হন।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানযোগে ক্রমাগত সেনা ও যুদ্ধাস্ত্র আনা বন্ধ করতে ভারত তাদের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানগামী সকল বিদেশি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করে। বিশেষ ব্যবস্থায় দুই হাজারের বেশি অবাঙালি নাগরিক নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে একটি জাহাজ করাচির উদ্দেশ্যে গমন করে। রাওয়ালপিন্ডির ৩১ জন আইনজীবী কোয়ালিশন সরকার গঠনসংক্রান্ত ভুট্টোর প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন। ভুট্টোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে লাহোরে তিনটি ছাত্র সংগঠনের ১২ ঘন্টার প্রতিকী অনশন ধর্মঘট পালন।
ভারতের প্রখ্যাত নেতা জয়প্রকাশ নারায়ন নয়াদিল্লীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধীর পরে প্রধান অহিংস শক্তির অধিকারী হিসেবে আখ্যা দেন এবং বিশ্বের সকল মানুষ ও তাদের সরকারকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমর্থন প্রদানে আহ্বান জানান।
১৭ মার্চ ’৭১, বুধবার
বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন ; ভোর থেকে তাঁকে শভেচ্ছা জানাতে আসার মানুষের ঢল ধামন্ডির ৩২ নং বাসভবনে। সকাল ১০ টায় ইয়াহিয়ার সঙ্গে ২য় দফা বৈঠক। কড়া সামরিক প্রহরায় আড়াই ঘন্টা অসমাপ্ত রূদ্ধদ্বার বৈঠক। আলোচনার পরবর্তী সময় ঠিক করা হয়নি।
চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব বাংলা এখন স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এখন স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। তিনি শেখ মজিবের কাছে এক তারবার্তায় চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর গণহত্যার তদন্তের দাবি জানান এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের চট্টগ্রামে পাঠাতে বলেন। সামরিক কর্তৃপক্ষ মার্চের প্রথম সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। সামরিক আদেশবলে তৈরি এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে এর রিপোর্ট পেশের শর্ত থাকায় বঙ্গবন্ধু এ কমিশনের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে গণহত্যার তদন্তের জন্য ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবিদুর রেজা খানকে সদস্য করে চট্টগ্রাম তদন্ত কমিশন গঠন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করে। ঐদিন সরকারি-বেসরকারি ভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করে।
ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান বিকেলে ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাংবাদিকদের কাছে তিনি শেখ মুজিবের ৪ দফার পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পিপিপি নেতা ভুট্টো ও প্রধান বিচারপতি হামদুর রহমানকে ঢাকায় আসার আমন্ত্র জানান।
১৮ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
আজ বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো নির্ধারিত বৈঠক না থাকায় জনমনে উৎকন্ঠা। সারাদিনভর মিছিলের পর মিছিল। সেনাসদস্যরা মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর প্রতিবাদে এ ধরনের উসকানি আর সহ্য কার হবেনা বলে জানান। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে সরেজমিন তদন্তের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত ৩ সদস্যের দল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গমন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে আসন্ন গণহত্যা ও যুদ্ধ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে নিবৃত্ত করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠায়। স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি শক্তির প্রতি তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্রের দ্বারা বাঙালিদের হত্যা চালানোর প্রয়াস বন্ধ করার আবেদন জানায়। বিমান বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকরা স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ, সংগ্রাম কমিটি গঠন এবং শহীদমিনারে সমাবেশ করে।
আগামী ২৩ মার্চ উপলক্ষ্যে আতাইর রহমান খান এক বিবৃতিতে বলেন, শোষণহীন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রকৃষ্ট সময় হচ্ছে ২৩ মার্চ।’ চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী সাংবাদিকদের কাছে অসহযোগ আন্দোলনে জনগণের বর্তমান অংশগ্রহণকে তাঁর দীর্ঘ ৮৯ বছরের জীবনে আর কখনো দেখেননি বলে জানান। একইসঙ্গে তিনি ইয়াহিয়াকে ভুট্টোর কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা অর্পনের আহ্বান জানান। ভুট্টো শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে গোপন আলোচনার জন্য পরদিন ঢাকায় আসতে ইয়াহিয়া তাঁকে যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাতে সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়, আগামীকাল সকাল ১১ টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
১৯ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
গাজীপুর জয়দেবপুরের রাজবাড়ি থেকে ইপিআর বাঙালি জওয়ানরা সেনানিবাসে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে সামরিক কর্তৃপক্ষ পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে জয়দেবপুরে একদল সেনা পাঠায়। সকাল ১১ টার দিকে এ দলটি সেখানে পৌঁছে অসহযোগ আন্দোলনে রত ইপিআর ও সাধারণ বাঙালিদের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণ করে বোর্ড বাজারের নিরস্ত্র মানুষের ওপর। সম্মিলিতভাবে এ হামলা প্রতিরোধে চেষ্টা করে বাঙালি ইপিআর ও স্থানীয় মানুষ। কিন্ত পাকসেনাদের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের কাছে অচিরেই দূর্বল হয়ে পড়ে প্রতিরোধ। শহীদ হয় ১২৫ জন বাঙালি। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে সান্ধ্যা-আইন জারি করে বহু স্থানীয় মানুষকে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যায়, তাঁদের কেউ আর ফিরে আসেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর এ নির্বিচার হত্যাকান্ডকে পশুত্বের সঙ্গে তুলনা করে এর তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেড় ঘন্টা ব্যাপী ৩য় দফা বৈঠক করেন। কোনো সমঝোতা হয়নি। সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগ উভয় পক্ষেও উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২ ঘন্টা ব্যাপী এ বৈঠকে উপদেষ্টাগণ কী ফর্মুলার ভিত্তিতে আলোচনা হবে তা নির্ধারণ করেন।
শিল্পী কামরুল হাসানের পরিকল্পনা ও নকশায় তৈরি বাংলা স্টিকার একেকটি বাংলা অক্ষর একেকটি বাঙালির জীবন’ প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী বলেন, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা অর্পণ ছাড়া পাকিস্তানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানা, শওকত হায়াৎ খান ও মুফতি মাওলানা মাহমুদ ঢাকায় আসেন। করাচিতে ভুট্টো বলেন, ক্ষমতার হিস্যা থেকে বঞ্চিত হলে তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না। তিনি শক্তি প্রদশর্নে বাধ্য হবেন।’ তিনি এ সময় গণআন্দোলনের হুমকি প্রদান করেন।
২০ মার্চ ’৭১, শনিবার
গতকালের গুলিবর্ষণে আহতদের মধ্যে হাসপাতালে আরও কয়েকজনের মৃত্যু। জয়দেবপুরে সান্ধ্য-আইন অব্যাহত।
সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে ৪র্থ দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত। এ বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইএম কামারুজ্জামান, এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং ড. কামাল হোসেন। ইয়াহিয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এ কে ব্রোহি, শরফুদ্দিন পীরজাদা, মি. কর্নেলিয়াস। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু বলেন, বৈঠকে অগ্রগতি হয়েছে। কাল আবার বৈঠক হবে। তিনি সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জনতাকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃক্সক্ষলভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আহ্বান করেন। অন্য একটি বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২৩ মার্চ লাহোর দিবস উপলক্ষে ছুটি থাকবে সারা বাংলাদেশে। ১৪ মার্চ ঘোষিত নির্দেশ ও ব্যাখ্যা মতো সবকিছু চলবে। আগামীতে যেসব নির্দেশ দেওয়া হবে সে-মতে সব কর্মসূচি পালন করতে হবে।’ মওলানা ভাসানী চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ২৩ মার্চ স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস হিসেবে পালিত হবে।
চারু কারুশিল্পীরা বুকে স্বাধীনতা পোস্টার বেঁধে অসহযোগ আন্দোলনে রাস্তায় নামে। শহীদমিনারে প্রাক্তন নৌসেনারা সমাবেশে অবাঙালি সেনা অপসারনের দাবি জানায়। ছাত্র ইউনিয়নের সশস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী রাজপথে সশস্ত্র প্যারেড করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র-বোঝাই বিমান চলাচল বন্ধের জন্য প্রতিবেশি দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ৬টি থেকে ১৭টি পর্যন্ত পিআইএ ফ্লাইট, বোয়িং ৭০৭ বিমানে সেনা ও যুদ্ধরসদ শ্রীলঙ্কা হয়ে ঢাকায় এবং অসংখ্য জাহাজ-ভর্তি সেনা ও আগ্নেয়াস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সামরিক শক্তি এখন মার্চের শুরুও দিকের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। জেনারেল ইয়াহিয়া তার সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে সচেষ্ট হন।
২১ মার্চ ’৭১, রোববার
দেশব্যাপী চলমান অসহযোগ আন্দোলনের আজ ২১ তম দিন। সরকারি-বেসরকারি ভবনে কালো পতাকা। মিছিল প্রতিটি জেলাশহরে, শহরের প্রতিটি রাস্তায়। জয়দেবপুরে ১৯ মার্চ জারিকৃত সান্ধ্য-আইন ৬ ঘন্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। বিকেলে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য এ আইন বলবৎ করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী পণ্য বর্জন সপ্তাহ পালনের কর্মসূচী ঘোষণা দেয়। মহিলা সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত মহিলা সমাবেশে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে প্যারামিলিটারি গঠনের আহ্বান। নারায়নগঞ্জে মহিলাদের মৌন মিছিল। বিক্ষুব্ধ লেখক-শিল্পীরা শহীদমিনারে বিপ্লবী সাহিত্য ও গণসঙ্গীতের আয়োজন করেন। শত শত মিছিল শহীদমিসার হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে। বঙ্গবন্ধু মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন- জনতার জয় অবধারিত।’ চট্টগ্রামে মজলম জননেতা মওলানা ভাসানী বলেন, জেনারেল ইয়াহিয়ার উচিত মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে সরে পড়া। তিনি আরও বলেন, মুজিব যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তাহলে বিশ্বের সমস্ত স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।’
বঙ্গবন্ধু পেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেড় ঘন্টা ব্যাপী এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। নিজ বাসভবনে মিলিত হন বিশিষ্ট আইনজীবী এ. কে ব্রোহির সঙ্গে। বিকেলে ইয়াহিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মিলিত হওয়ার জন্য ভুট্টো অত্যন্ত কড়া প্রহরায় তাঁর দলীয় ১২ জন নেতা নিয়ে ঢাকায় আসেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ তখন কালো পতাকা উত্তোলিত। হোটেলের যাত্রাপথে জনতার ভুট্টোবিরোধী বিক্ষোভ স্লোগান। সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া-ভুট্টো ২ ঘন্টা ব্যাপী রূদ্ধদ্বার বৈঠক। রাতে হোটেলে দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক। পরে কাউন্সিল মুসলীগ লীগ নেতার কক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের মধ্যে মত-বিনিময় সভা।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ৬টি থেকে ১৭টি পিআইএ ফ্লাইট, বোয়িং ৭০৭ বিমান ও জাহাজযোগে সেনা ও যুদ্ধরসদ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ঢাকা আসতে থাকে। জেনারেল ইয়াহিয়া তাঁর সামরিক উপদেষ্টা জেনালের হামিদ খান, জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা প্রমুখদের নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে (ইস্টার্ন হেডকোয়ার্টারস) সামরিক প্রস্তুতিতে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে প্রয়াস পান।
২২ মার্চ ’৭১, সোমবার
২২তম দিনে গড়িয়ে যাচ্ছে অসহযোগ আন্দোলন; মিছিলে মিছিলে সয়লাব দিন থেকে রাত রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথ। প্লটন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ। বায়তুল মোকাররমে কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী সৈনিকদের সমাবেশ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ধানমন্ডিতে মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আহমদ শরীফের সভাপতিত্ব ও আহসান হাবীব, শামসর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসল হক প্রমুখের অংশগ্রহণে কবিতাপাঠের আসর।
পূর্বনিধারিতভাবে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক থাকলেও আকস্মিকভাবে ইয়াহিয়া-বঙ্গবন্ধু-ভুট্টো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার কয়েকটি সংবাদপত্রে বাংলার স্বাধীকার শিরোনামে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। প্রথম পাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা। এ ক্রোড়পত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত একটি বাণী এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, রেহমান সোবহান, এএইচএম কামারুজ্জামান প্রমুখের প্রবন্ধ ছাপা হয়।
রাতে ভুট্টো ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা মমতাজ দৌলতানা, ওয়ালি খান, মুফতি মাহমুদ মীর, গাউস বক্স, সর্দার হায়াত খানের সঙ্গে ইয়াহিয়ার পৃথক পৃথক বৈঠক। ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে তিনি এক বাণীতে বলেন, পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। একইদিনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা খান আব্দুল কাইয়ুম খান ও মাওলানা শাহ আহমেদ নূরানীকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান।
২৩ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
২৩তম অসহযোগ দিবসেও দেশের সর্বত্র প্রতিটি গৃহ ও যানবাহনে কালো পতাকা উত্তোলিত। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক আজ সারাদেশে প্রতিরোধ দিবস পালিত। এ প্রতিরোধ আন্দোলনের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর নিজ বাসভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় তিনি আওয়ামীলীগের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সালাম গ্রহণ করেন। তথাকথিত এ পাকিস্তান দিবসে প্রেসিডেন্টভবন, ক্যান্টনমেন্ট ও বিমানবন্দর ছাড়াও কোথাও পাকিস্তানী পতাকা দেখা যায়নি। ঢাকাস্থ ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশন এবং সোভিয়েত কনস্যুলেটে সকাল থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীন থাকে। চীন, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল প্রথমে তাদের জাতীয় পতাকার সঙ্গে পাকিস্তানী পতাকা উত্তোলন করলেও পরে জনতার রূদ্ররোষে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে নেয়। আর মার্কিন দূতাবাসে কোনো পতাকাই তোলা হয়নি। ঢাকা টেলিভিশনেও পাকিস্তানী পতাকা উড়েনি, উর্দু সঙ্গীত বাজেনি।
সকালে পল্টন ময়দানে পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশ প্লাটুন গণবাহিনী কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করে। এ সময় তাঁরা স্বাধীন বাংলার পতাকাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম ও মার্চপাস্ট করে সম্মান জানায়। এরপর তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবনে গিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু তাঁদের সালাম গ্রহণ করেন। পল্টন ময়দানে ভাসানী ন্যাপ-এর উদ্যোগে সমাবেশ এবং শহীদমিনারে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বায়তুল মোকাররমে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে এক বিশাল জনসমাবেশ অনষ্ঠিত হয়। এ সভায় স্বাধীনতা রক্ষায় সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে জনসাধারনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। চট্টগ্রামে অধ্যাপক আজিজুর রহমান মল্লিক, অধ্যাপক সৈয়দ আহসান, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সৈয়দপুরে সেনাবাহিনী ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। সন্ধ্যায় সেখানে কারফিউ জারি করে অবাঙালি ও সেনাবাহিনী যুক্তভাবে স্থানীয় মানুষের জীবন ও সম্পত্তির উপর হামলা, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে থাকা লে. জেনারেল মাসুদুল হককে ঢাকা সেনানিবাসে গৃহবন্দী করা হয়। তাঁর স্থলে জয়দেবপুরে পাঠানো হয় ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট কমান্ডার লে. জেনারেল রকিবকে।
প্রেসিডেন্টভবনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা এমএম আহমেদ, বিচারপতি কর্নেলিয়াস, লে. জে. পীরজাদা ও কর্নেল হাসানের সঙ্গে সকাল-বিকাল দুই দফা বৈঠক করেন। এতে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ একটি খসড়া শাসনতন্ত্র পেশ করেন। লে. জে. পীরজাদা এ শাসন্তন্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো মেনে নেওয়া হবে বলে আভাস দেন। পাকিস্তানী বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এ.কে ব্রোহি সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে আইনগত কোনো বাধা নেই।’ পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ভবনের এক মুখপাত্র বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণের পদ্ধতি চলছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে ঘোষণা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সেনাকর্মকর্তাদের সঙ্গে ইস্টার্ন কমান্ড সদর দপ্তরে আলোচনা বৈঠক এবং বৈঠক-পরবর্তী ভাষণ দান করেন। করাচিতে ভুট্টো-সমর্থকদের বাঙালি কলোনিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, গুলিবর্ষণ ও লুটতরাজ চলে, হতাহত হয় বেশ কয়েকজন।
২৪ মার্চ ’৭১, বুধবার
অসহযোগ আন্দোলনের ২৪ দিনের মাথায় একইররকম বিক্ষুব্ধ মিছিলে মিছিলে উত্তাল শহরের রাজপথগুলো বঙ্গবন্ধুর অভিমুখে গমন করে। বঙ্গবন্ধু তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার মাথা কেনার শক্তি কারো নেই। বাংলার মানুষের সাথে, শহীদের রক্তের সাথে আমি বেঈমানি করতে পারব না। আমি কঠোরতর নির্দেশ দেয়ার জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানিনা। দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’ যশোর পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেলস-এর হেডকোয়ার্টারসে জওয়ানরা জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান গেয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং পতাকাকে অভিবাদন করে।
এদিন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট-ভবনে প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের নব নতুন নাম নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে লে. জে. পীরজাদা টেলিফোনে পরবর্তী বৈঠকের সময় ধার্য এবং তখন নাম নিয়ে কথা বলা হবে বলে জানান। কিন্ত সে টেলিফোন আর আসেনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকে বিদায় জানিয়ে করাচি ফিরে যান।
চট্টগ্রাম পোর্টের ১৭ নং জেটিতে এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে যুদ্ধাস্ত্র নামানো নিয়ে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিক, বাঙালি সৈনিক ও সাধারণ মানুষ চট্টগ্রামে ব্যারিকেড রচনা করে। এক জরুরি বৈঠকের কথা বলে লে. জে. টিক্কা খান দুপুরবেলা হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম থেকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। তাঁদেরকে সেনানিবাসে বন্দী করে রাখা হয়। ঢাকার বাইরে হত্যালীলা শুরু করে দেয় পাকবাহিনীর এরিয়া কমান্ডাররা। সৈয়দপুরে পাকসেনা ও অবাঙালি বিহারীরা যৌথভাবে গণহত্যা শুরু করে। দিনের প্রথমভাগের মধ্যেই রংপুরে পাকসেনাদের কয়েকটি হেলিক্পটার অবতরণ করে। এখানে বিগ্রেড কমান্ডারের বাসভবনে গোপন শলাপরামর্শ করে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠঠা খান প্রমুখ। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী দটি হেলিকপ্টারে চড়ে সবকটি সেনানিবাসে গিয়ে ব্রিগেডকমান্ডারদের নীলনকশা সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানপথে আরো দুই ডিভিশন সেনা ও যুদ্ধরসদ আসছে।
চট্টগ্রাম জেলা সংগ্রাম কমিটি রাত দশটায় জনাব এম আর সিদ্দিকীর বাসায় বৈঠককালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এক জরুরী রার্তা এসে পৌঁছে। বার্তার মূল বিষয়বস্তু ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলো।
২৫ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
ইতিহাসের এক তমসাক্লিষ্ট ভয়াল অশুভক্ষণ নামে এই বাংলায়, এই ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে। নিরস্ত্র দেশবাসীর ওপর হানাদার পাকসেনাদের অতর্কিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি ঘুমন্ত মানুষ।
দিনটি ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২৫তম দিন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সর্বত্র শোকের কালো পতাকা আর পাশপাশি আশাদীপ্ত স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন। সারাদিন সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্র-মিছিল-মিটিং। সকালে প্রেসিডেন্টভবনে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও উভয় দলের উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক। বিকেলে পল্টন ময়দানে পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে বিশাল জনসভা। বিকেলেই সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু রংপুর, সৈয়দপুর, জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যার প্রতিবাদে আগামী ২৭ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন।
অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে শেষবারের মতো ঢাকা ত্যাগ করার সময় সেনাবাহিনীর ওপর এ কাপুরোষোচিত নির্দেশ জারি করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি প্রেসিডেন্টভবন থেকে সেনানিবাসে যান। রাত ৮ টায় করাচি রওয়ানা দেন। রাত ৯ টার মধ্যে এ খবর ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর কাছে এ খবর আগেই পৌঁছে। রাত ৯টার পর তাঁর বাসভবনে উপস্থিত নেতা-কর্মী-সমর্থক-সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট অখন্ড পাকিস্তানের সমাপ্তি টানতে চলেছেন।’ তিনি আরও বলেন, আমাকে হয়তো ওরা হত্যা করতে পারে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার সমাধির ওপর একদিন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করবেই।’
রাত ১১ টায় পাকসেনারা তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অপারেশন সার্চলাইটের’ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। রাত সাড়ে ১১ টায় সেনারা সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে। মাইকযোগে সারা শহরে কারফিউ জারি করে। এরপর প্রথমইে তারা ফার্মগেট এলাকায় প্রেিতরাধের মুখোমুখি হয়। গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। অতপর গর্জে ওঠে পাকিস্তানী সেনাদের মেশিনগান। পাখির মত লুটিয়ে পড়তে থাকে স্বাধীনতাকামী মানুষ। এভাবেই খন্ডযুদ্ধ চলতে থাকে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। ডিনামাইড ব্যবহৃত হয় ব্যারিকেড সরানোর জন্য। ইয়াহিয়ার সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষক কলোনি, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, নীলক্ষেতসহ ঢাকার নতুন ও পুরাতন আবাসিক এলাকা, এমনকি বস্তিবাসীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ করে গণহত্যা সংঘটিত করে।
পাকসরকারের সেনারা এদেশের জনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন : আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। আমার এ ঘোষণা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিন। শত্র“র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।” এ ঘোষণা লিখিত আকারে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক ও অন্যান্য স্থান থেকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে বার্তা আকারে সারাদেশে পাঠানো হয়।
একের পর এক প্রতিরোধব্যূহ ভেঙ্গে হানাদাররা রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে। ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাথারিভাবে গুলিবর্ষণ করতে করতে। এরপর শত্র“সেনারা বন্দি বঙ্গবন্ধুকে সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর শেরে বাংলায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে সেনানিবাস এবং এরপর আদমজী কলেজের একটি একটি কক্ষে সকাল পর্যন্ত বন্দি করে রাখে।
২৬ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
পাকসেনারা দলে দলে রাস্তায় নেমে মেশিনগান আর কামানের গোলার আঘাতে জর্জরিত করতে থাকে নাগরিকদের আবাসস্থল, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার অফিস, শহীদমিনার। তারা দুপুর থেকে মধ্যরাত অবধি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হানাদারদের সহায়তা করে অবাঙালি বিহারীরা। এদিন সকালে কড়া সামরিক প্রহরায় ঢাকা ত্যাগকারী পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছে ঢাকায় সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যাকে প্রশংসা করেন। রাত ৮ টার বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবর রহমান অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাজ করেছেন। ... শেখ মুজিবর রহমান সবসময়ই গঠনমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।... লোকটি এবং তাঁর দল পাকিস্তানের শত্র“। ... এ অপরাধের জন্য তাঁকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’
সমগ্র ঢাকাশহর পাকসেনাদের কাছে অবরুদ্ধ। সারাদেশে এখনো স্বাধীন পতাকা উড্ডীণ। গত রাতের গণহত্যার খবরে দেশের সর্বত্র সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। এ সংগ্রামের অন্যতম স্থল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সেখানে বঙ্গবন্ধু-ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা বাংলা ও ইংরেজিতে হ্যান্ডবিল আকারে ছাপিয়ে বিলি করা হয়। বিলি করা হয় রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ বড় বড় শহরগুলোতে। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্বপাদক এম.এ হান্নান দুপুর ২ টা ১০ মিনিট এবং ২ টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশকে সাহায্যের জন্য বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ ও রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহ্বান জানান। এরপর রাত ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপর্ণ স্থানগুলোতে ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিক-পুলিশ-ইপিআর বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত বিপ্লবী বাহিনী স্থানীয় পাকসেনাদের প্রতিহত করার প্রয়াস পায় এবং অধিকাংশ স্থানেই প্রাথমিকভাবে সফলতা লাভ করে।
১ মার্চ ’৭১, সোমবার
দুপুর ১ টার বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব-ঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করেন। এ ভাষণে তিনি পাকিস্তান পিপল্স পার্টির অনাগ্রহ এবং ভারত-সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। একইদিনে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্ণর পদ থেকে এসএম আহসানকে অপসারণ করে তার স্থলে সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুবকে গভর্নরের অতিরিক্ত বেসামরিক দায়িত্ব প্রদান করেন।
বেতারে এ অনাকাক্সিক্ষত ঘোষণা শোনামাত্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ও ছাত্রলীগে নেতাদের নেতৃত্বে সকল শিক্ষার্থী দলে দলে তাদের ক্লাস ও আবাসিক হল থেকে বটতলায় এসে জড়ো হয়। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে প্রতিবাদসভার পরিকল্পনা ঘোষিত হয়। অন্যদিকে ঢাকা শহরের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সহযোগে বিক্ষুব্ধ মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে রাজধানী শহরের রাস্তাগুলো, ’স্লোগান- তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা’, জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, জয় বাংলা’। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, যানবাহন। বিমানবন্দরে ব্যরিকেড। পরিত্যাক্ত হয় স্টেডিয়ামে চলতে থাকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। বিকাল ৩ টায় মিছিলসমেত হাজার হাজার মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে জড়ো হয়, সেখানে আওয়ামীলীগের সভা চলছিল। সভায় উপস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইয়াহিয়া কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি ২ মার্চ ঢাকা শহরে, ৩ মার্চ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার কথা ঘোষণা করেন। ছাত্রনেতৃবৃন্দকে ডেকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ মেতাবেক বিকেলে ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আসম আব্দুর রব এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন এক গোপন বৈঠকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন।
ছাত্রনেতাদের আহ্বানে বিকেলে পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত তোফায়েল আহমেদ, আবদুল মান্নান, সিরাজল আলম খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ দেশের সকল মানুষকে শেখ মজিবের নেতৃত্ব ও নির্দেশ মেনে সকল কর্মসূচী বাস্তবায়নে আহ্বান করেন।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের বেতার ঘোষণাকে পাকিস্তান মুসলীগ লীগের প্রধান খান আব্দুল কাইউম খান সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানালে এর প্রতিবাদে দলের মহাসচিব খান এ সবুর খান দলের সম্পাদক ও সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
পাকিস্তান-রাষ্ট্রের অখন্ডতার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে কোনো খবর প্রকাশ করা যাবেনা এই মর্মে নতুন আদেশ জারি করা হয়।
২ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঢাকা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। রাজাধানী জুড়ে স্তব্ধতা। সকাল ১১ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমবেত সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের নেতা আসম আব্দুর রব প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা উত্তোলন করেন।
নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্ত্বে এ সভায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী অসহযোগ আন্দোলন শুরু এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভাশেষে বায়তুল মোকাররম অভিমুখে এক বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে এ বায়তুল মোকররম এবং পার্শ্ববর্তী পল্টন ময়দানে অনির্ধারিত এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জনতার ঢল শহরের সর্বত্র। দেশবাসীর এ ধরনের স্বতস্ফূর্ত কর্মকান্ডে ভীত হয়ে এদিন সন্ধ্যা ৭টায় আকস্মিকভাবে কারফিউ জারি করে পাকিস্তান সরকার। কারফিউ-র প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। মিছিলের পর মিছিল সারা শহরে। গর্জে ওঠে স্বৈরাচার সরকারের আগ্নেয়াস্ত্র। কারফিউ ভঙ্গকারী মিছিলের মানুষকে নির্বিচারে গুলি করা হয়। ঢাকার সকল রাজপথ বিক্ষোভকারী জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। হাসপতালগুলোতে বাড়তে থাকে বুলেটবিদ্ধ আহত মানুষের ভিড়। সরকারের সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারী জনতার ওপর গুলিবর্ষণে কেবল ঢাকাতেই ২৩ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়। চট্টগ্রামে পুলিশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালিদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। সংঘর্ষ, হামলা, অগ্নিকান্ড ও গুলিতে প্রায় ৪ শত মানুষ হতাহত হয়।
শেখ মুজিবর রহমান সাধারণ মানুষের ওপর সরকারের এ গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। এক বিবৃতিতে ৩ মার্চকে জাতীয় শোকদিবস ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল ঘোষণা করেন।
সরকার ১১০ নম্বর সামরিক আদেশবলে পত্রপত্রিকার প্রকাশিত সংবাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সকাল ১১ টার দিকে ফার্মগেট এলাকা সংগঠিত মিছিলে সামরিক বাহিনী গুলিবর্ষণ বেয়নেট চার্জ করলে ৯ জন হতাহত হয়। এ ঘটনায় ন্যাপ ও জাতীয় লীগের উদ্যোগে পল্টন ও বায়তুল মোকাররমে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তৃতা করেন ন্যাপের মতিয়া চৌধুরী, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, নূরুল ইসলাম প্রমুখ এবং জাতীয় লীগের সভায় আতাউর রহমান। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে সমাগত এক জনসভার ভাষণে বাংলার জনগণের আন্দোলন সংগ্রামকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পাক সরকারের সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাইকে সাবধান থাকতে বলেন। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আন্দোলনরত জনতা রাতে কারফিউ ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে বেরিকেড রচনা করে। শহীদের লাশ নিয়ে ইকবাল হল (বর্তমান জহরুল হক হল, ঢাবি) থেকে রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে চূড়মার করে বিক্ষোভ মিছিল চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
অন্যদিকে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের জন্য কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানান। পাশাপাশি সত্যিকার ফেডারেশনে দুই কক্ষবিশিষ্ট পরিষদ গঠন হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন। সন্ধ্যায় করাচিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পিপল্স পার্টি বাদে বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর এক বৈঠকে চলমান পরিস্থিতিতে ভুট্টোর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়। আগামী ৫ দিনের মধ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবশেন আহ্বানের দাবি জানানো হয়। একইভাবে লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিল লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) নূর খান জাতীয় পরিষদ স্থগিত হওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতির কথা উল্লেখ করে মার্চ মাসের মধ্যে জাতীয় পরিষদের নতন তারিখ ধার্য করার আহ্বান করেন।
৩ মার্চ ’৭১, বুধবার
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারাদেশে স্বতস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে লাশের সারির পাশে হাজারো মানুষের কান্নার মিছিল। সকালের শোকমিছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষেরা অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদমিনারে সমবেত হন। সকাল ১১ টার দিকে গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বটতলায় মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে শিক্ষকদের এক প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। শুরু হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ মিছিল।
জেনারেল ইয়াহিয়া বেতার মারফত শেখ মুজিবসহ জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারি গ্র“পের ১২ জন নেতাকে ১০ মার্চ ঢাকায় এক বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে এক বিৃবতি প্রদান করেন। এতে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পাকিস্তানী সেনাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং অব্যাহত সামরিক প্রস্তুতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিকেলে পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভায় পরবর্তী আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন- ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল। সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং জনগনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ট্যাক্স ও খাজনা বন্ধ থাকবে। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষকে বেলা ২ টার পর রিকশাওয়ালাদের অপেক্ষাকৃত বেশি ভাড়া এবং আহত ব্যক্তিদের রক্ত দান এবং সাংবাদিকদের নির্ভিকভাবে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানান। তিনি সেনাবাহিনীর হামলায় দেশব্যাপী নিহত শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।
ছাত্রলীগ আয়োজিত পল্টন জনসভায় যোগদানকারী লাখ লাখ মানুষ যে-স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাশা করেছিল সে-প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জনসভায় এ বহুল প্রতিক্ষিত ঘোষণাপত্র সর্বসমুখে পাঠ করা হয়। এ ঘোষণাপত্রে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদশের ঘোষণা ও কর্মসূচী, স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য কর্মপন্থা, স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা বর্ণনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শহীদমিনারে আয়োজিত এক জনসভায় ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, ’বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে।’
এই দিন ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পাকবাহিনীর গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ শহীদ হয়। সিলেট, রাজশাহী ও রংপুরে কারফিউ জারি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত এমভি সোয়াত থেকে সৈন্য ও গোলবারুদ নামাতে অস্বীকৃতি জানালে পাকসেনা ও নৌবাহিনী বন্দরের শ্রমিক-জনতার ওপর গুলি চালায়। শতাধিক শ্রমিক-জনতা শহীদ হয়।
অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাব পাকিস্তান ফ্রন্ট পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর চলমান ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন এবং এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খান করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন- আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই বর্তমান সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
৪ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
সারাদেশে পূর্ব-ঘোষিত সর্বাত্মক হরতাল পালিত। রেডিও পাকিস্তান’ পরিণত হয় বাংলাদেশ বেতার’-এ। বেতার ও টেলিভিশনে হরতালের সমর্থনে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হয়। খুলনা ও রংপুরে কারফিউ বহাল থাকলেও ঢাকায় তুলে নেওয়া হয়েছে। খুলনায় হরতাল পালনকালে পাকবাহিনীর হামলায় বহু মানুষ হতাহত। ঢাকায় গত দুই দিনে গুলিতে আহতদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু-সংবাদ পাওয়া গেছে। দুই দিনে ঢাকায় মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয় মোট ১২১ জন। যশোরে পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হয় মিছিলে অংশগ্রহণকারী চারুবালা ধর। জনতা তাঁর লাশ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অবাঙালিদের অব্যাহত আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩ মার্চ ও ৪ মার্চ- এই দুই দিনে এখানে ১২০ জন শহীদ এবং ৩৩৫ জন আহত হয়।
সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশ ও শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর ব্যারাকের বাঙালি জওয়ানরা জয় বাংলা’ স্লোগানোর মাধ্যমে রাজপথের মিছিলকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। দেশের সর্বত্র বেসামরিক প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চট্ট্রগামের লালদিঘি ময়দানে পাকসেনা কর্তৃক নির্বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে এক গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমআর সিদ্দিকী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ঢাকায় জাতীয় লীগের এক জরুরি সভায় অলি আহাদ অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্য্হাার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।
মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জানান। বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রেও বিরদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বানে দেশের প্রতিটি মানুষ যে স্বতস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছে সেজন্য বীর জনতাকে অভিনন্দন জানান। রাত ১১ টায় রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁর কাছে কতিপয় প্রস্তাব নিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এসএম আহসান এদেশের মানুষের অধিকারের ন্যায়সঙ্গত বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের চরশান কর্মকান্ডের সমালোচনা করলে তাঁকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তাঁর স্থলে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেলিফোন মারফত এ ঘটনা জানতে পেরে তিনি এদেশ থেকে বিদায় নেন এবং বিদায় নেবার প্রাক্কালে বিমান বন্দরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে শভেচ্ছা জানান।
অন্যদিকে, করাচিতে ভুট্টো এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, দেশের সংহতির জন্য তাঁর দল যতদূর-সম্ভব হয় ৬ দফার কাছাকাছি যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মুসলিম লীগ (কনভেনশন) এর সাধারণ সম্পাদক এএনএম ইউসুফ ১০ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডাকার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। জমিয়তুল উলামা-ই ইসলামের নেতা মাওলানা গোলাম গাউস হাজারভি পিপিপি নেতা ভুট্টোর সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত না থাকার জন্য হুমকির কঠোর সমালোচনা করেন। বেলুচিস্তান ন্যাপ (ওয়ালি) জাতীয় সংসদ অধিবশেন স্থগিত করার প্রতিবাদে সমগ্র বেলুচিস্তানে ১২ মার্চ হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
৫ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প-এলাকায় সেনাদের গুলিবর্ষণে বহু শ্রমিক হতাহত হওয়ার প্রতিবাদে সমগ্র এলাকা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা টঙ্গীর কাঠের সেতুটিতে আগুন জ্বালায় এবং গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। নিহত শ্রমিকদের লাশ নিয়ে রাজধানীতে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। চট্টগ্রামে পাকসেনাদের গুলিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৮ জনে। নিহতদের স্মরণে হরতাল পালিত। হরতাল চলাকালে গুলিতে ৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়। শহর জুড়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল, গণজমায়েত।
ফরিদপুরের স্থানীয় জনতা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে এবং বিরাট মিছিল নিয়ে সার্কিট হাউস ঘেরাও করে। সেখানে অবস্থানকারী পাকবাহিনী ঘেরাও কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী নাগরিকের দিকে মেশিনগান তাক করলে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকগণ জনতার চলমান সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শহীদমিনারে গিয়ে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করেন। এ সময় ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি লাঠিমিছিল বের করা হয়। মতিয়া গ্র“প ছাত্র ইউনিয়ন শহীদমিনারে এক সমাবেশ আয়োজন করে। পুরানা পল্টনে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় কার্যালয়সহ দেশের প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও শান্তি-শৃক্সক্ষলা রক্ষার জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ এক বিৃবতিতে অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানান। এ সময় বিদেশী গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজি- এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং পাকসেনা কর্তৃক নির্যাতন ও গণহত্যা বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এদিন করাচি থেকে আসগর খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন এবং পাক সরকারের ভবিষ্যত কর্মপন্থা সম্পর্কে ধারণা বিনিময় করেন। একইদিনে জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঢাকায় পৌঁছান। সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবার ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষনায় বলা হয়, শেখ মুজিবর রহমান শান্তির জন্য আহ্বান জানানোর পর গত ২৪ ঘন্টায় দেশে সাধারণ আইন-শৃক্সক্ষলা পরিস্থিতিতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর দীর্ঘ ৫ ঘন্টা শলাপরামর্শ শেষে দলের মুখপাত্র মন্তব্য করেন, জাতীয় পরিষদ স্থগিত রাখার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া যুক্তিযুক্ত নয়।’
৬ মার্চ ’৭১, শনিবার
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত। ঢাকার কেন্দ্রিয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১ জন বন্দি পলায়ন করে, তাদের মধ্যে পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বাঁশের লাঠি, লোহার রড ও কালো পতাকা নিয়ে নারী সমাজ এক বিরাট জঙ্গি মিছিল বের করে। মিছিল বের করে পেশাদার শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক, শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দল, বামপন্থী শিক্ষার্থীগণ। অলি আহাদের সভাপতিত্বে পল্টন ময়দানে জনসভা এবং মোজাফ্ফর আহমদের সভাপতিত্বে গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কাজী জাফরের সভাপতিত্বে শ্রমিকসভা ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দ এক বিৃবতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণ রেডিওতে সরাসরি স¤প্রচারের দাবি জানায়। সন্ধ্যায় ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্র-সংগঠন এক বিরাট মশাল-মিছিল বের করে। প্রায় ৪ লাখ লোকের এক বিশাল গণবাহিনী যশোর আক্রমণ করে। এতে পাকবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে ক্যান্টনমেন্টে পালিয়ে যেতে থাকলে অনেকে জনতার হাতে ধরা পড়ে। একইসঙ্গে লুটতরাজে লিপ্ত অনেক অবাঙালি বিহারী জনতার হাতে ধরা পড়ে।
অন্যদিকে, লাহোরে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং পাঞ্জার প্রদেশের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ জনকে একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সরকার। জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের খবর সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ জনতাকে দু®কৃতকারী আখ্যা দেন এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান করেন। বেতার ভাষণের পর পরই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির এক জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রেসিডেন্টের বেতার ঘোষণা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
৭ মার্চ ’৭১, রবিবার
আজ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ। গতকাল থেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সর্বত্র থেকে মানুষ নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে দলে দলে স্রোতের মতো এসে জড়ো হয় রেসকোর্সের বিস্তৃত ময়দানে। হাতে বাঁশের লাঠি আর কন্ঠে জয় বাংলা’ ধ্বনি। লক্ষ্য অভিন্ন- স্বাধীকার ও মুক্তি। তারা সকলে মুক্তির বাণী শুনতে এসেছে।
বেলা সোয়া তিনটায় বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। সঙ্গে সঙ্গে দশ লক্ষাধিক মানুষের জনসমুদ্র থেকে জয় বাংলা’র উত্তাল স্লোগানে আপ্লুত হন নেতা। স্বভাবসুলভ জলদগম্ভীর কন্ঠে ঘোষণা করেন জনতার প্রাণের কথা : এবারের সংগ্রামÑ আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’ বঙ্গবন্ধু এ ভাষণে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখা এবং যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করার আহ্বান জানান।
সারা দেশের মানুষ যারা জনসভায় উপস্থিত হতে পারেননি তারা তাদের নিকটস্থ রেডিওসেট নিয়ে অধীর আগ্রহে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকে। বেলা ২-১০ থেকে ৩-২০ পর্যন্ত ঢাকা বেতারে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রিলে করে স¤প্রচার করার মুহূর্তেই আকস্মিকভাবে ঢাকা বেতারের অধিবশেন সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে কর্মস্থল পরিত্যাগ করে এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে প্রচার করা না হলে তারা কাজে যোগদান করবে না বলে জানিয়ে দেয়। অতপরঃ গভীর রাতে সামরিক কতৃপক্ষ এ ভাষণ প্রচার করার অনুমতি প্রদান করে এবং পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়েই ঢাকা বেতারকেন্দ্র পুনরায় চালু হয়।
বিকেলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সমাপ্ত হওয়ার পরপরই পাকিস্তানের এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খান অবিলম্বে শামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং সংখ্যাগরিষ্ট দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যে শর্ত দিয়েছে তাকে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত বলে উল্লেখ করেন। রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে বিবৃতি দিতে গিয়ে অবিলম্বে সেনাদের ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়া, বেসামরিক মানুষদের প্রতি গুলিবর্ষণ বন্ধ করা, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাসদস্য আনা বন্ধ করা, পুলিশ ও বাঙালি ইপিআরদের ওপর আইন-শৃক্সক্ষলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করার জোর দারি উত্থাপন করেন। একইসঙ্গে হুশিযার করে দিয়ে বলেন, সামরিকভাবে মোকাবেলার নীতি যদি অব্যাহত থাকে এবং নিরস্ত্র জনসাধারণ যদি বুলেটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে, তাহলে জাতীয় পরিষদ যে কখনোই কাজ করতে পারবেনা এতে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয়।’
৮ মার্চ ’৭১, সোমবার
বঙ্গবন্ধুর গতকালের ভাষণ থেকে সংগ্রামের নতুন পর্যায়ের সূত্রপাত। সারাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে। পুনরায় চালু ঢাকা বেতার কেন্দ্র। সরকারি প্রেসনোট প্রকাশ করা হয়। এতে নিহতের সংখ্যা ১৭২ জন এবং আহতের সংখ্যা ৩৫৮ জন বলে উল্লেখ করা হয়। জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ সঙ্গে সঙ্গে সরকারি প্রেসনোটের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেন এবং ৭ মার্চের ভাষণে উল্লিখিত বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এক সভায় কতিপয় প্রস্তাব গৃহিত হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আগামী কাউন্সি অধিবেশন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পরিবর্তে কেবল ছাত্রলীগ নাম ব্যবহার, প্রতিটি জেলা থেকে শুরু করে সারাদেশে ছাত্রলীগের প্রাথমিক ইউনিট পর্যন্ত ১১ সদস্যবিশিষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন, আঞ্চলিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন, দেশের সকল সিনেমা হলে পাকিস্তানী সঙ্গীত বাজানো ও পাকিস্তানী পতাকা প্রদর্শন বন্ধ, উর্দু গ্রন্থ প্রকাশ বন্ধ ইত্যাদি।
এদিন ঢাকায় কর্মরত ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীর ১৭৮ জন নাগরিক দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা পূর্বক ঢাকা ত্যাগ করে। অন্যদিকে, পাক-সরকারের একান্ত অনুগত হিসেবে খ্যাত নূরুল আমীন এবং খান এ সবুর পৃথক পৃথক বিবৃতিতে পাক-সরকারকে অবিলম্বে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান।
৯ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
সারাদেশে পূর্বঘোষিত হরতাল পালিত। জেনালে টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। ফলে টিক্কা খান এ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকায় আসবেন- সরকারীভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
রাজশাহীতে ৮ ঘন্টার জন্য কারফিউ জারি করা হয়। ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানায়। ন্যাপ-প্রধান মওলানা ভাসানী পল্টনের এক জনসমুদ্রে দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেন যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবেনা। কোনো প্রকার আপোষও সম্ভব নয়।
দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ৬ মার্চ প্রেসিডেন্টের বেতার-ভাষণের নিন্দা জ্ঞাপন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দেশ রক্ষার্থে শেখ মুজিবরের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এ সভায় আরও বক্তৃতা করেন আতাউর রহমান খান। তিনি বঙ্গবন্ধুকে অবিলম্বে জাতীয় সরকার ঘোষণার জন্য আহ্বান করেন। মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মধ্যে বৈঠক।
১০ মার্চ ’৭১, বুধবার
দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত স্বাধীন পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক ইশতিহারে দেশের সকল বাড়ি ও যানবাহনে কালো পতাকা নির্দেশের ঘোষণা প্রদান করে। একইসঙ্গে তাঁরা বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ, আইবি, সিআইডি-কে পাকিস্তানী প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাঙালি ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজ বাসভবনে একদল বিদেশী সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার-বৈঠকে মিলিত হন। এ সময় তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, শুধু জাতিসংঘ সদস্যদের ঢাকা সরিয়ে নিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, কারণ আজকের এই হুমকি গণহত্যারই হুমকি। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৭ কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার পর্যদস্ত করার হুমকি...।’
সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৪ নং সামরিক নির্দেশ জারি করে তাতে উল্লেখ করে- যদি কেউ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সরকারি সম্পত্তি বিনাশ, অথবা সেনাবাহিনীর চলাচল কিংবা সেনাবাহিনী সংরক্ষণে বাধা সৃষ্টি করে--- এরকম সড়ক, রেল ও বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহে অন্তরায় সৃষ্টি করে তাহলে তাদের তৎপরতা হামলার সমতুল্য এবং সামরিক বিধিতে দন্ডনীয় বলে গণ্য করা হবে। এই দিন নারায়নগঞ্জের কারাগার থেকেজ ৪০ জন কয়েদির পলায়ন করে, পুলিশের গুলিতে ২৭ জন আহত হয়।
পল্টন ময়দানে এক জনসভায় জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুকে কালবিলম্ব না করে জাতীয় সরকার ঘোষণার জন্য আহ্বান করেন। ন্যাপ সম্পাদক মশিয়ুর রহমান বলেন, আজ রাজনৈতিক কোন্দলের দিন নয়। ন্যাপ কোন্দলে বিশ্বাস করেনা। তাই আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ।’
দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে আর দেরি নয়’ শিরোনামে লেখা হয়, গত এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ববাংলার বুকে প্রচন্ড গণআন্দোলনের মধ্য দিয়া যেসব শিক্ষা উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে সেইগুলি হইল : (এক). বল প্রয়োগ করিয়া জনগণকে দমান যাইবে না, (দুই). জনপ্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে হইবে, (তিন). ক্ষতা হস্তান্তরের জন্য সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে, এবং (চার). জনসমর্থিত ছয় ও এগার দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পথ বাধামুক্ত করিতে হইবে...।’
একইদিনে লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পিডিএম প্রধান নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান বঙ্গবন্ধুর দাবির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের সভাপতি এম খুরশিদ প্রেসিডেন্ট ই্য়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গণঐক্যের নেতা আসগর খান করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।
১১ মার্চ ’৭১, রৃহস্পতিবার
বরিশাল কারাগার থেকে ৪০ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। সংঘর্ষে ২ জন কয়েদি নিহত এবং ১০ জন আহত হয়। কুমিল্লা কারাগার থেকে কয়েদিদের পলায়ন এবং গুলিতে ৩ জন নিহত। নারায়নগঞ্জে সিনেমা হলে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তে জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি পরিবেশিত হয়। টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানী এক বিশাল জনসভায় বলেন, স্বাধীনতা ছাড়া আপোষের আর কোনো পথ খোলা নাই।
স্বাধীন বাংল্ াছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা এক যুক্ত বিৃবতিতে বাংলাদেশের জনগণকে পাক-সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খতাব ও পদক বর্জনের আহ্বান করেন। একইসঙ্গে তাঁরা কতিপয় ব্যাংকের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেন। এই দিন সিএসপি ও ইপিসিএস সমিতির পদস্থ বাঙালি সরকারি কর্মচারীরা শেখ মুজিবের আহ্বানে আওয়ামী লীগের তহবিলে তাঁদের ১ দিনের বেতন প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ন্যাপ বাংলাদেশ শাখার সভাপতি মোজাফ্ফর আহমেদ ও ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারি আবাসিক প্রতিনিধি মিস্টার উল্ফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন।
অন্যদিকে, করাচিতে মোহাম্মদ আসগর খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য হাতে আর মাত্র ক’টি দিন আছে; যদি ঢাকায় একটি গুলি চলে কিংবা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে।’
১২ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন, সভা-সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত। সারাদেশের সিনেমা হলের মালিকরা চলমান আন্দোলনের সমর্থনে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সিনেমা হল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুদ্দীন পাকিস্তানী খেতাব বর্জন করেন। পূর্ব রেলওয়ে কর্মচারী এবং চারু ও কারুশিল্পীগণ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। বগুড়া জেলখানা ভেঙ্গে ২৭ জন কয়েদির পলায়ন এবং গুলিতে কয়েকজন হতাহত। আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে খাদ্যবোঝাই চট্টগ্রামমুখী মার্কিন জাহাজের গতি পরিবর্তন করে করাচী প্রেরণের ঘটনায় উৎকণ্ঠা ও নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ময়মনসিংহের এক জনসভায় মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবের ওপর আস্থা রাখার জন্য জনগণকে আহ্বান করেন। জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান ও পাঞ্জাবের মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মুলতানে পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, পাকিস্তানের অখন্ডতা ও সংহতি রক্ষার জন্য আমার দল সবরকমের সাহায্য করতে প্রস্তত। আমি ক্ষমতালোভী নই।’ রাওয়ালপিন্ডিতে সরকারি ঘোষণায় আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের নির্ধারিত সম্মিলিত সশস্ত্রবাহিনীর কুচকাওয়াজ, খেতাব বিতরণ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। রেডিও পাকিস্তান করাচি কেন্দ্রের বাংলা খবর পাঠক সরকার কবিরউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর খবরে নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান বর্জন করেন।
১৩ মার্চ ’৭১, শনিবার
শিল্পাচার্য জয়নল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য আবদুল হাকিম পাক-সরকার প্রদত্ত সকল খেতাব ও পদক বর্জন করেন। চট্টগ্রামে নারীসমাজের সমাবেশে বিলাসদ্রব্য বর্জন ও কালো ব্যাজ ধারনের আহ্বান জানানো হয়। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মানী দূতাবাসের কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারবর্গসহ ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক বিশেষ বিমানে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন।
১১৫ নং সামরিক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে পাক-সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫ মার্চ সকাল ১০ টার মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এবং ব্যর্থতায় চাকরি থেকে বহিষ্কারসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের কথা উল্লেখ করা হয়। বঙ্গবন্ধু সামরিক কর্তৃপক্ষেও প্রতি এ ধরনের উস্কানিমূলক তৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক জনসভায় মওলানা ভাসানী বলেন, ভুট্টোর উচিত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা। আমরা আমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করব।’
জাতীয় পরিষদের সংখ্যালঘিষ্ঠ দলগুলো আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানায়। লাহোরে জামিয়াতুল উলামা-ই-ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ-এঁর সভাপতিত্বে এ সংখ্যালঘু দলগুলোর এক সভায় বঙ্গবন্ধুর ৪ দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। মুফতি মোহাম্মদ বলেন, পাকিস্তানের নীতিগত ও ব্যবহারিক ধারণার অস্তিত্ব থাকবে না যদি-না পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের ঐক্য থাকে।’ এ সভায় জামিয়াতুল উলামা-ই-ইসলাম ছাড়াও জামাত-ই-ইসলাম, কনভেনশন লীগ, কাউন্সিল লীগ প্রভৃতি দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এই দিন পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর দাবি সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
১৪ মার্চ ’৭১, রোববার
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ২য় পর্যায়ের অসহযোগ আন্দোলনের আজ শেষ দিন। নতুন বিবৃতির মাধ্যমে তিনি আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। এ নির্দেশের মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত বাংলাদেশের প্রশাসনভার গ্রহণ করেন। নিজ বাসভবনে ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে রূদ্ধদ্বার বৈঠক। আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দিন আহমদ ও ন্যাপ নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো।
১১৫ নং সামরিক নির্দেশের প্রতিবাদে দেশরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরা নগরীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন শেষে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিৃবতিতে বঙ্গবন্ধু সামরিক কর্তৃপক্ষকে অবিবেচক হিসেবে উল্লেখ করে বেসামরিক কর্মচারীদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার প্রচেষ্টার নিন্দা করেন এবং সামরিক হুমকির কাছে মাথা নত না করতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
ঢাকায় নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) ইমাম হোসেন এক বিৃবতিতে অবিলম্বে বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল অবাঙালি সেনা প্রত্যাহার করে বাঙালি সেনাদের স্থলাভিষিক্ত করার আহ্বান জানান। ঝিনাইদহে কয়েকজন সিএসপি ও পিএসপি কর্মকর্তা প্রয়োজনে দেশের জন্য অস্ত্র ধারণ করার শপথ গ্রহণ করেন। বরিশালে এক জনসভায় আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর প্রতি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করার আহ্বান জানান। সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে ঢাকার লালবাগ বালুরমাঠে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্যবাহী মন্টেসেলো ডিক্টরি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে, ওসান এগুরাস নামক সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ চট্টগ্রগ্রাম বন্দরে নোঙর করা হয়। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আর সময় নেই’ শিরোনামে এক যৌথ সম্পাদকীয়তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছার জন্য নিবেদন করেন। একইসঙ্গে বহির্শত্র“দের হাত থেকে দেশকে রক্ষা এবং শেখ মুজিব ও তাঁর দলকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে, করাচিতে পিপিপি নেতা জলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, সাংবিধানিক সমঝোতার পূর্বে শেখ মুজিবের দাবি অনুযায়ী যদি ক্ষমতা অর্পন করা হয়, তবে পাকিস্তানের দুই অংশের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’
১৫ মার্চ ’৭১, সোমবার
কঠোর সামরিক প্রহরায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, সঙ্গে জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা, জেনারেল হামিদ খান, জেনারেল খোদাদাদ খান, জেনারেল মিঠঠা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল ওমর, জি ডব্লিউ চৌধুরী প্রমুখ ঢাকায় এসে পৌঁছেন। বিমান বন্দরে এ সময় কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
সারাদেশে সরকারি, আধা-সরকারি অফিস আদালতে পূর্ণ কর্মবিরতি পালিত। সকল ভবন ও যানবাহেন কালো পতাকা ও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত। কঠোর সামরিক নির্দেশ উপেক্ষা করে সকালে বেসরকারি কর্মচারীদের সভা ও রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল। শহীদমিনারে চিকিৎসকদের সভা ও নগরীতে শোভাযাত্রা। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে তোপখানা রোডে মহিলাদের সমাবেশ। ভ্রাম্যমান ট্রাকে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর গণসঙ্গীত ও পথনাটক পরিবেশন। সন্ধ্যায় শহীদমিনারে বেতার ও টেলিভিশন শিল্পীদের দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন। তাজউদ্দিন আহমদ হরতাল ও ৩৫ দফা কর্মসূচীর সপক্ষে বিবৃতি প্রদান করেন। চলমান পরিস্থিতিতে পূর্ববাংলার কেন্দ্রিয় ও প্রাদেশিক সরকারের সমস্ত শাসনযন্ত্র আওয়ামী লীগের নির্দেশে চলতে থাকে। সকল নির্দেশ জারি করা হয় বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ি থেকে।
স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বায়তুল মোকাররম চত্বরে এক জনসভায় ১১৫ নং সামরিক বিধির কঠোর নিন্দা করেন। বাংলাদেশকে রক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। খুলনার এক জনসভায় আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব্ েএকতাবদ্ধ।’ প্রবীণ রাজনীতিক আবুল হাশিম বলেন, ভুট্টোর কথামতো ইয়াহিয়া চললে পাকিস্তানের বিভক্তি অনিবার্য।’
পিপিপি নেতা ভুট্টো করাচিতে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, কেন্দ্রের ক্ষমতা দেশের দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ... কায়েমি স্বার্থবাদীমহল নির্বাচনে জনগণের বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্য পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। তাছাড়া এখন পাকিস্তান যে অবস্থার সম্মুখীন তাতে দুই অংশের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের প্রশ্ন প্রযোজ্য নয়।’
পিডিপি নেতা নূরুল আমীন ভুট্টোর এ প্রস্তাব অবাস্তব ও নৈরাশ্যকর বলে বিৃবতি দেন। জমিয়াতে ওলামায়ে পাকিস্তান, ন্যাপ (ওয়ালি), কাউন্সিল মুসলিম লীগ, পিডিপি ও জামাতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতা করাচিতে এক বিবৃতি বর্তমান গুরুতর পরিস্থিতির জন্য ভুট্টোকেই দায়ী করেন।
পিআইএ বোয়িং এবং পাক বিমানবাহিনীর সি-১৩০ বিমানগুলো নিয়মিতভাবে যুদ্ধের সরঞ্জামসহ পাকসেনা বয়ে আনতে থাকে। ঢাকা বিমানবন্দরকে মেশিনগান ও বিমানবিধ্বংসী কামানে সজ্জিত করা হয়। বিমান বন্দর পরিণত হয় যদ্ধ বিমান ঘাঁটিতে।
১৬ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
অসহযোগ আন্দোলনের এই ১৬তম দিনে আন্দোলনের সমর্থনে রাজপথে নামে- কেন্দ্রিয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসেস ফেডারেশন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ব্রতচারী আন্দোলন, স্টেটব্যাংক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ, ঢাকা জিলা সমবায় ইউনিয়ন, নোয়াখালী অ্যাসোসিয়েশন, চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, তাঁতশিল্প উন্নয়ন সমিতি, মগবাজার সংগ্রাম পরিষদ প্রভৃতি।
বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে আইনজীবী, লেখক, শিল্পী, চাকুররিজীবীও সকল শ্রেনীর মেহনতি মানুষ অসহযোগ আন্দোলন অব্রাহত রাখার জন্য দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। কবি আহসান হাবিব তাঁর সিতারা-ই-খেদমত খেতাব বর্জন করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক ইস্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক কেন্দ্রিয় সরকারের সমস্ত রাজস্ব গ্রহণ করতে শুরু করে। এর মধ্যে কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধিন আবগারি ও বিক্রয়কর ছিল।
হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শহীদমিনারে সমাবেশ ও মিছিল। গাজীপুরের টঙ্গী, নারায়নগঞ্জ ও চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের সমাবেশ ও শোভাযাত্রা।
গাজীপুুরের জয়দেবপুরে জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। সামরিক বাহিনী অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালায়- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোহা হল ও মুন্নুজান হল, যশোর ও রংপুর সেনানিবাস এলাকা, ঢাকার পিলখানা- ফার্মগেট- রামপুরা- কচুক্ষেত, খুলনা চট্টগ্রাম এ।
বঙ্গবন্ধু কালো পতাকা-শোভিত একটি গাড়িতে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। পুলিশের গাড়িগুলোতেও ছিল কালো পতাকা। জনতা প্রেসিডেন্ট ভবনের পথে জমায়েত হয়ে জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে নিরস্ত্র ইপিআর বাহিনী। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু জানান, আলোচনা আরও চলবে।
ময়মনসিংহের জনসভায় মওলানা ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলকৃত করার জন্য শেখ মজিবকে আহ্বান করেন। মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। এমএম আহমদ, মৌলানা শাহ আহমদ নূরানী প্রমুখ কয়েকজন নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ প্রতিনিধি ঢাকায় উপস্থিত হন।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানযোগে ক্রমাগত সেনা ও যুদ্ধাস্ত্র আনা বন্ধ করতে ভারত তাদের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানগামী সকল বিদেশি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করে। বিশেষ ব্যবস্থায় দুই হাজারের বেশি অবাঙালি নাগরিক নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে একটি জাহাজ করাচির উদ্দেশ্যে গমন করে। রাওয়ালপিন্ডির ৩১ জন আইনজীবী কোয়ালিশন সরকার গঠনসংক্রান্ত ভুট্টোর প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন। ভুট্টোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে লাহোরে তিনটি ছাত্র সংগঠনের ১২ ঘন্টার প্রতিকী অনশন ধর্মঘট পালন।
ভারতের প্রখ্যাত নেতা জয়প্রকাশ নারায়ন নয়াদিল্লীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধীর পরে প্রধান অহিংস শক্তির অধিকারী হিসেবে আখ্যা দেন এবং বিশ্বের সকল মানুষ ও তাদের সরকারকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমর্থন প্রদানে আহ্বান জানান।
১৭ মার্চ ’৭১, বুধবার
বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন ; ভোর থেকে তাঁকে শভেচ্ছা জানাতে আসার মানুষের ঢল ধামন্ডির ৩২ নং বাসভবনে। সকাল ১০ টায় ইয়াহিয়ার সঙ্গে ২য় দফা বৈঠক। কড়া সামরিক প্রহরায় আড়াই ঘন্টা অসমাপ্ত রূদ্ধদ্বার বৈঠক। আলোচনার পরবর্তী সময় ঠিক করা হয়নি।
চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব বাংলা এখন স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এখন স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। তিনি শেখ মজিবের কাছে এক তারবার্তায় চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর গণহত্যার তদন্তের দাবি জানান এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের চট্টগ্রামে পাঠাতে বলেন। সামরিক কর্তৃপক্ষ মার্চের প্রথম সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। সামরিক আদেশবলে তৈরি এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে এর রিপোর্ট পেশের শর্ত থাকায় বঙ্গবন্ধু এ কমিশনের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে গণহত্যার তদন্তের জন্য ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবিদুর রেজা খানকে সদস্য করে চট্টগ্রাম তদন্ত কমিশন গঠন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করে। ঐদিন সরকারি-বেসরকারি ভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করে।
ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান বিকেলে ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাংবাদিকদের কাছে তিনি শেখ মুজিবের ৪ দফার পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পিপিপি নেতা ভুট্টো ও প্রধান বিচারপতি হামদুর রহমানকে ঢাকায় আসার আমন্ত্র জানান।
১৮ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
আজ বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো নির্ধারিত বৈঠক না থাকায় জনমনে উৎকন্ঠা। সারাদিনভর মিছিলের পর মিছিল। সেনাসদস্যরা মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর প্রতিবাদে এ ধরনের উসকানি আর সহ্য কার হবেনা বলে জানান। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কে সরেজমিন তদন্তের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত ৩ সদস্যের দল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গমন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে আসন্ন গণহত্যা ও যুদ্ধ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে নিবৃত্ত করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠায়। স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি শক্তির প্রতি তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্রের দ্বারা বাঙালিদের হত্যা চালানোর প্রয়াস বন্ধ করার আবেদন জানায়। বিমান বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকরা স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ, সংগ্রাম কমিটি গঠন এবং শহীদমিনারে সমাবেশ করে।
আগামী ২৩ মার্চ উপলক্ষ্যে আতাইর রহমান খান এক বিবৃতিতে বলেন, শোষণহীন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রকৃষ্ট সময় হচ্ছে ২৩ মার্চ।’ চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী সাংবাদিকদের কাছে অসহযোগ আন্দোলনে জনগণের বর্তমান অংশগ্রহণকে তাঁর দীর্ঘ ৮৯ বছরের জীবনে আর কখনো দেখেননি বলে জানান। একইসঙ্গে তিনি ইয়াহিয়াকে ভুট্টোর কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা অর্পনের আহ্বান জানান। ভুট্টো শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে গোপন আলোচনার জন্য পরদিন ঢাকায় আসতে ইয়াহিয়া তাঁকে যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাতে সরকারি ঘোষণা দেওয়া হয়, আগামীকাল সকাল ১১ টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
১৯ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
গাজীপুর জয়দেবপুরের রাজবাড়ি থেকে ইপিআর বাঙালি জওয়ানরা সেনানিবাসে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে সামরিক কর্তৃপক্ষ পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে জয়দেবপুরে একদল সেনা পাঠায়। সকাল ১১ টার দিকে এ দলটি সেখানে পৌঁছে অসহযোগ আন্দোলনে রত ইপিআর ও সাধারণ বাঙালিদের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণ করে বোর্ড বাজারের নিরস্ত্র মানুষের ওপর। সম্মিলিতভাবে এ হামলা প্রতিরোধে চেষ্টা করে বাঙালি ইপিআর ও স্থানীয় মানুষ। কিন্ত পাকসেনাদের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের কাছে অচিরেই দূর্বল হয়ে পড়ে প্রতিরোধ। শহীদ হয় ১২৫ জন বাঙালি। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে সান্ধ্যা-আইন জারি করে বহু স্থানীয় মানুষকে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যায়, তাঁদের কেউ আর ফিরে আসেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর এ নির্বিচার হত্যাকান্ডকে পশুত্বের সঙ্গে তুলনা করে এর তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেড় ঘন্টা ব্যাপী ৩য় দফা বৈঠক করেন। কোনো সমঝোতা হয়নি। সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগ উভয় পক্ষেও উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২ ঘন্টা ব্যাপী এ বৈঠকে উপদেষ্টাগণ কী ফর্মুলার ভিত্তিতে আলোচনা হবে তা নির্ধারণ করেন।
শিল্পী কামরুল হাসানের পরিকল্পনা ও নকশায় তৈরি বাংলা স্টিকার একেকটি বাংলা অক্ষর একেকটি বাঙালির জীবন’ প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী বলেন, শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা অর্পণ ছাড়া পাকিস্তানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানা, শওকত হায়াৎ খান ও মুফতি মাওলানা মাহমুদ ঢাকায় আসেন। করাচিতে ভুট্টো বলেন, ক্ষমতার হিস্যা থেকে বঞ্চিত হলে তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না। তিনি শক্তি প্রদশর্নে বাধ্য হবেন।’ তিনি এ সময় গণআন্দোলনের হুমকি প্রদান করেন।
২০ মার্চ ’৭১, শনিবার
গতকালের গুলিবর্ষণে আহতদের মধ্যে হাসপাতালে আরও কয়েকজনের মৃত্যু। জয়দেবপুরে সান্ধ্য-আইন অব্যাহত।
সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে ৪র্থ দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত। এ বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইএম কামারুজ্জামান, এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং ড. কামাল হোসেন। ইয়াহিয়ার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এ কে ব্রোহি, শরফুদ্দিন পীরজাদা, মি. কর্নেলিয়াস। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু বলেন, বৈঠকে অগ্রগতি হয়েছে। কাল আবার বৈঠক হবে। তিনি সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জনতাকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃক্সক্ষলভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আহ্বান করেন। অন্য একটি বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২৩ মার্চ লাহোর দিবস উপলক্ষে ছুটি থাকবে সারা বাংলাদেশে। ১৪ মার্চ ঘোষিত নির্দেশ ও ব্যাখ্যা মতো সবকিছু চলবে। আগামীতে যেসব নির্দেশ দেওয়া হবে সে-মতে সব কর্মসূচি পালন করতে হবে।’ মওলানা ভাসানী চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ২৩ মার্চ স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস হিসেবে পালিত হবে।
চারু কারুশিল্পীরা বুকে স্বাধীনতা পোস্টার বেঁধে অসহযোগ আন্দোলনে রাস্তায় নামে। শহীদমিনারে প্রাক্তন নৌসেনারা সমাবেশে অবাঙালি সেনা অপসারনের দাবি জানায়। ছাত্র ইউনিয়নের সশস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী রাজপথে সশস্ত্র প্যারেড করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সামরিক বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র-বোঝাই বিমান চলাচল বন্ধের জন্য প্রতিবেশি দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ৬টি থেকে ১৭টি পর্যন্ত পিআইএ ফ্লাইট, বোয়িং ৭০৭ বিমানে সেনা ও যুদ্ধরসদ শ্রীলঙ্কা হয়ে ঢাকায় এবং অসংখ্য জাহাজ-ভর্তি সেনা ও আগ্নেয়াস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সামরিক শক্তি এখন মার্চের শুরুও দিকের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। জেনারেল ইয়াহিয়া তার সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে সচেষ্ট হন।
২১ মার্চ ’৭১, রোববার
দেশব্যাপী চলমান অসহযোগ আন্দোলনের আজ ২১ তম দিন। সরকারি-বেসরকারি ভবনে কালো পতাকা। মিছিল প্রতিটি জেলাশহরে, শহরের প্রতিটি রাস্তায়। জয়দেবপুরে ১৯ মার্চ জারিকৃত সান্ধ্য-আইন ৬ ঘন্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। বিকেলে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য এ আইন বলবৎ করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানী পণ্য বর্জন সপ্তাহ পালনের কর্মসূচী ঘোষণা দেয়। মহিলা সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত মহিলা সমাবেশে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে প্যারামিলিটারি গঠনের আহ্বান। নারায়নগঞ্জে মহিলাদের মৌন মিছিল। বিক্ষুব্ধ লেখক-শিল্পীরা শহীদমিনারে বিপ্লবী সাহিত্য ও গণসঙ্গীতের আয়োজন করেন। শত শত মিছিল শহীদমিসার হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে। বঙ্গবন্ধু মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন- জনতার জয় অবধারিত।’ চট্টগ্রামে মজলম জননেতা মওলানা ভাসানী বলেন, জেনারেল ইয়াহিয়ার উচিত মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে সরে পড়া। তিনি আরও বলেন, মুজিব যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তাহলে বিশ্বের সমস্ত স্বাধীনতাপ্রিয় জাতি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।’
বঙ্গবন্ধু পেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেড় ঘন্টা ব্যাপী এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। নিজ বাসভবনে মিলিত হন বিশিষ্ট আইনজীবী এ. কে ব্রোহির সঙ্গে। বিকেলে ইয়াহিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে মিলিত হওয়ার জন্য ভুট্টো অত্যন্ত কড়া প্রহরায় তাঁর দলীয় ১২ জন নেতা নিয়ে ঢাকায় আসেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ তখন কালো পতাকা উত্তোলিত। হোটেলের যাত্রাপথে জনতার ভুট্টোবিরোধী বিক্ষোভ স্লোগান। সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া-ভুট্টো ২ ঘন্টা ব্যাপী রূদ্ধদ্বার বৈঠক। রাতে হোটেলে দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক। পরে কাউন্সিল মুসলীগ লীগ নেতার কক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের মধ্যে মত-বিনিময় সভা।
অন্যদিকে, প্রতিদিন ৬টি থেকে ১৭টি পিআইএ ফ্লাইট, বোয়িং ৭০৭ বিমান ও জাহাজযোগে সেনা ও যুদ্ধরসদ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে ঢাকা আসতে থাকে। জেনারেল ইয়াহিয়া তাঁর সামরিক উপদেষ্টা জেনালের হামিদ খান, জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা প্রমুখদের নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে (ইস্টার্ন হেডকোয়ার্টারস) সামরিক প্রস্তুতিতে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে প্রয়াস পান।
২২ মার্চ ’৭১, সোমবার
২২তম দিনে গড়িয়ে যাচ্ছে অসহযোগ আন্দোলন; মিছিলে মিছিলে সয়লাব দিন থেকে রাত রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথ। প্লটন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ। বায়তুল মোকাররমে কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী সৈনিকদের সমাবেশ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ধানমন্ডিতে মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আহমদ শরীফের সভাপতিত্ব ও আহসান হাবীব, শামসর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসল হক প্রমুখের অংশগ্রহণে কবিতাপাঠের আসর।
পূর্বনিধারিতভাবে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক থাকলেও আকস্মিকভাবে ইয়াহিয়া-বঙ্গবন্ধু-ভুট্টো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার কয়েকটি সংবাদপত্রে বাংলার স্বাধীকার শিরোনামে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। প্রথম পাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা। এ ক্রোড়পত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত একটি বাণী এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, রেহমান সোবহান, এএইচএম কামারুজ্জামান প্রমুখের প্রবন্ধ ছাপা হয়।
রাতে ভুট্টো ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা মমতাজ দৌলতানা, ওয়ালি খান, মুফতি মাহমুদ মীর, গাউস বক্স, সর্দার হায়াত খানের সঙ্গে ইয়াহিয়ার পৃথক পৃথক বৈঠক। ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে তিনি এক বাণীতে বলেন, পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। একইদিনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা খান আব্দুল কাইয়ুম খান ও মাওলানা শাহ আহমেদ নূরানীকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান।
২৩ মার্চ ’৭১, মঙ্গলবার
২৩তম অসহযোগ দিবসেও দেশের সর্বত্র প্রতিটি গৃহ ও যানবাহনে কালো পতাকা উত্তোলিত। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক আজ সারাদেশে প্রতিরোধ দিবস পালিত। এ প্রতিরোধ আন্দোলনের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তাঁর নিজ বাসভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় তিনি আওয়ামীলীগের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সালাম গ্রহণ করেন। তথাকথিত এ পাকিস্তান দিবসে প্রেসিডেন্টভবন, ক্যান্টনমেন্ট ও বিমানবন্দর ছাড়াও কোথাও পাকিস্তানী পতাকা দেখা যায়নি। ঢাকাস্থ ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশন এবং সোভিয়েত কনস্যুলেটে সকাল থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীন থাকে। চীন, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল প্রথমে তাদের জাতীয় পতাকার সঙ্গে পাকিস্তানী পতাকা উত্তোলন করলেও পরে জনতার রূদ্ররোষে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে নেয়। আর মার্কিন দূতাবাসে কোনো পতাকাই তোলা হয়নি। ঢাকা টেলিভিশনেও পাকিস্তানী পতাকা উড়েনি, উর্দু সঙ্গীত বাজেনি।
সকালে পল্টন ময়দানে পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশ প্লাটুন গণবাহিনী কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করে। এ সময় তাঁরা স্বাধীন বাংলার পতাকাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম ও মার্চপাস্ট করে সম্মান জানায়। এরপর তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবনে গিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু তাঁদের সালাম গ্রহণ করেন। পল্টন ময়দানে ভাসানী ন্যাপ-এর উদ্যোগে সমাবেশ এবং শহীদমিনারে ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বায়তুল মোকাররমে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে এক বিশাল জনসমাবেশ অনষ্ঠিত হয়। এ সভায় স্বাধীনতা রক্ষায় সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে জনসাধারনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। চট্টগ্রামে অধ্যাপক আজিজুর রহমান মল্লিক, অধ্যাপক সৈয়দ আহসান, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখের নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সৈয়দপুরে সেনাবাহিনী ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। সন্ধ্যায় সেখানে কারফিউ জারি করে অবাঙালি ও সেনাবাহিনী যুক্তভাবে স্থানীয় মানুষের জীবন ও সম্পত্তির উপর হামলা, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্বে থাকা লে. জেনারেল মাসুদুল হককে ঢাকা সেনানিবাসে গৃহবন্দী করা হয়। তাঁর স্থলে জয়দেবপুরে পাঠানো হয় ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট কমান্ডার লে. জেনারেল রকিবকে।
প্রেসিডেন্টভবনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও ড. কামাল হোসেন ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা এমএম আহমেদ, বিচারপতি কর্নেলিয়াস, লে. জে. পীরজাদা ও কর্নেল হাসানের সঙ্গে সকাল-বিকাল দুই দফা বৈঠক করেন। এতে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ একটি খসড়া শাসনতন্ত্র পেশ করেন। লে. জে. পীরজাদা এ শাসন্তন্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলো মেনে নেওয়া হবে বলে আভাস দেন। পাকিস্তানী বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এ.কে ব্রোহি সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে আইনগত কোনো বাধা নেই।’ পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ভবনের এক মুখপাত্র বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণের পদ্ধতি চলছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে ঘোষণা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সেনাকর্মকর্তাদের সঙ্গে ইস্টার্ন কমান্ড সদর দপ্তরে আলোচনা বৈঠক এবং বৈঠক-পরবর্তী ভাষণ দান করেন। করাচিতে ভুট্টো-সমর্থকদের বাঙালি কলোনিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, গুলিবর্ষণ ও লুটতরাজ চলে, হতাহত হয় বেশ কয়েকজন।
২৪ মার্চ ’৭১, বুধবার
অসহযোগ আন্দোলনের ২৪ দিনের মাথায় একইররকম বিক্ষুব্ধ মিছিলে মিছিলে উত্তাল শহরের রাজপথগুলো বঙ্গবন্ধুর অভিমুখে গমন করে। বঙ্গবন্ধু তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমার মাথা কেনার শক্তি কারো নেই। বাংলার মানুষের সাথে, শহীদের রক্তের সাথে আমি বেঈমানি করতে পারব না। আমি কঠোরতর নির্দেশ দেয়ার জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানিনা। দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।’ যশোর পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেলস-এর হেডকোয়ার্টারসে জওয়ানরা জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান গেয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং পতাকাকে অভিবাদন করে।
এদিন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট-ভবনে প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের নব নতুন নাম নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে লে. জে. পীরজাদা টেলিফোনে পরবর্তী বৈঠকের সময় ধার্য এবং তখন নাম নিয়ে কথা বলা হবে বলে জানান। কিন্ত সে টেলিফোন আর আসেনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকে বিদায় জানিয়ে করাচি ফিরে যান।
চট্টগ্রাম পোর্টের ১৭ নং জেটিতে এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে যুদ্ধাস্ত্র নামানো নিয়ে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিক, বাঙালি সৈনিক ও সাধারণ মানুষ চট্টগ্রামে ব্যারিকেড রচনা করে। এক জরুরি বৈঠকের কথা বলে লে. জে. টিক্কা খান দুপুরবেলা হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম থেকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে ঢাকায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী। তাঁদেরকে সেনানিবাসে বন্দী করে রাখা হয়। ঢাকার বাইরে হত্যালীলা শুরু করে দেয় পাকবাহিনীর এরিয়া কমান্ডাররা। সৈয়দপুরে পাকসেনা ও অবাঙালি বিহারীরা যৌথভাবে গণহত্যা শুরু করে। দিনের প্রথমভাগের মধ্যেই রংপুরে পাকসেনাদের কয়েকটি হেলিক্পটার অবতরণ করে। এখানে বিগ্রেড কমান্ডারের বাসভবনে গোপন শলাপরামর্শ করে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠঠা খান প্রমুখ। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী দটি হেলিকপ্টারে চড়ে সবকটি সেনানিবাসে গিয়ে ব্রিগেডকমান্ডারদের নীলনকশা সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানপথে আরো দুই ডিভিশন সেনা ও যুদ্ধরসদ আসছে।
চট্টগ্রাম জেলা সংগ্রাম কমিটি রাত দশটায় জনাব এম আর সিদ্দিকীর বাসায় বৈঠককালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এক জরুরী রার্তা এসে পৌঁছে। বার্তার মূল বিষয়বস্তু ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলো।
২৫ মার্চ ’৭১, বৃহস্পতিবার
ইতিহাসের এক তমসাক্লিষ্ট ভয়াল অশুভক্ষণ নামে এই বাংলায়, এই ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে। নিরস্ত্র দেশবাসীর ওপর হানাদার পাকসেনাদের অতর্কিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি ঘুমন্ত মানুষ।
দিনটি ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২৫তম দিন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সর্বত্র শোকের কালো পতাকা আর পাশপাশি আশাদীপ্ত স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন। সারাদিন সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্র-মিছিল-মিটিং। সকালে প্রেসিডেন্টভবনে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও উভয় দলের উপদেষ্টাদের মধ্যে বৈঠক। বিকেলে পল্টন ময়দানে পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে বিশাল জনসভা। বিকেলেই সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু রংপুর, সৈয়দপুর, জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যার প্রতিবাদে আগামী ২৭ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন।
অন্যদিকে, রাতের অন্ধকারে শেষবারের মতো ঢাকা ত্যাগ করার সময় সেনাবাহিনীর ওপর এ কাপুরোষোচিত নির্দেশ জারি করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি প্রেসিডেন্টভবন থেকে সেনানিবাসে যান। রাত ৮ টায় করাচি রওয়ানা দেন। রাত ৯ টার মধ্যে এ খবর ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর কাছে এ খবর আগেই পৌঁছে। রাত ৯টার পর তাঁর বাসভবনে উপস্থিত নেতা-কর্মী-সমর্থক-সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট অখন্ড পাকিস্তানের সমাপ্তি টানতে চলেছেন।’ তিনি আরও বলেন, আমাকে হয়তো ওরা হত্যা করতে পারে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার সমাধির ওপর একদিন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করবেই।’
রাত ১১ টায় পাকসেনারা তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অপারেশন সার্চলাইটের’ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। রাত সাড়ে ১১ টায় সেনারা সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে আসে। মাইকযোগে সারা শহরে কারফিউ জারি করে। এরপর প্রথমইে তারা ফার্মগেট এলাকায় প্রেিতরাধের মুখোমুখি হয়। গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। অতপর গর্জে ওঠে পাকিস্তানী সেনাদের মেশিনগান। পাখির মত লুটিয়ে পড়তে থাকে স্বাধীনতাকামী মানুষ। এভাবেই খন্ডযুদ্ধ চলতে থাকে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। ডিনামাইড ব্যবহৃত হয় ব্যারিকেড সরানোর জন্য। ইয়াহিয়ার সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষক কলোনি, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, নীলক্ষেতসহ ঢাকার নতুন ও পুরাতন আবাসিক এলাকা, এমনকি বস্তিবাসীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ করে গণহত্যা সংঘটিত করে।
পাকসরকারের সেনারা এদেশের জনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন : আজ থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। আমার এ ঘোষণা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিন। শত্র“র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।” এ ঘোষণা লিখিত আকারে পিলখানা ইপিআর ব্যারাক ও অন্যান্য স্থান থেকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে বার্তা আকারে সারাদেশে পাঠানো হয়।
একের পর এক প্রতিরোধব্যূহ ভেঙ্গে হানাদাররা রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে। ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাথারিভাবে গুলিবর্ষণ করতে করতে। এরপর শত্র“সেনারা বন্দি বঙ্গবন্ধুকে সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর শেরে বাংলায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে সেনানিবাস এবং এরপর আদমজী কলেজের একটি একটি কক্ষে সকাল পর্যন্ত বন্দি করে রাখে।
২৬ মার্চ ’৭১, শুক্রবার
পাকসেনারা দলে দলে রাস্তায় নেমে মেশিনগান আর কামানের গোলার আঘাতে জর্জরিত করতে থাকে নাগরিকদের আবাসস্থল, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার অফিস, শহীদমিনার। তারা দুপুর থেকে মধ্যরাত অবধি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হানাদারদের সহায়তা করে অবাঙালি বিহারীরা। এদিন সকালে কড়া সামরিক প্রহরায় ঢাকা ত্যাগকারী পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছে ঢাকায় সেনাবাহিনী কর্তৃক গণহত্যাকে প্রশংসা করেন। রাত ৮ টার বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবর রহমান অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাজ করেছেন। ... শেখ মুজিবর রহমান সবসময়ই গঠনমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।... লোকটি এবং তাঁর দল পাকিস্তানের শত্র“। ... এ অপরাধের জন্য তাঁকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’
সমগ্র ঢাকাশহর পাকসেনাদের কাছে অবরুদ্ধ। সারাদেশে এখনো স্বাধীন পতাকা উড্ডীণ। গত রাতের গণহত্যার খবরে দেশের সর্বত্র সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। এ সংগ্রামের অন্যতম স্থল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সেখানে বঙ্গবন্ধু-ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা বাংলা ও ইংরেজিতে হ্যান্ডবিল আকারে ছাপিয়ে বিলি করা হয়। বিলি করা হয় রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ বড় বড় শহরগুলোতে। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্বপাদক এম.এ হান্নান দুপুর ২ টা ১০ মিনিট এবং ২ টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশকে সাহায্যের জন্য বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ ও রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহ্বান জানান। এরপর রাত ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপর্ণ স্থানগুলোতে ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিক-পুলিশ-ইপিআর বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত বিপ্লবী বাহিনী স্থানীয় পাকসেনাদের প্রতিহত করার প্রয়াস পায় এবং অধিকাংশ স্থানেই প্রাথমিকভাবে সফলতা লাভ করে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)