বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৩

পানি, রাজনীতি ও দরিদ্র মানুষ ...

পৃথিবীর তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ স্থলেও প্রাচীনকাল থেকে পানি নিয়ে মানুষে মানুষে সংঘাত লেগে আছে; কেননা, মানুষের ব্যবহারয়োপযোগী যে স্বাদু পানি, তার পরিমাণ মাত্র ২.৫ ভাগ। এরমধ্যে আবার ৭০% মেরুপ্রদেশে বরফ হিসেবে, বাকি ৩০% অধিকাংশ মাটির আর্দ্রতা এবং ভূগর্ভস্থ পানি হিসেবে বিরাজিত। অর্থাৎ ব্যবহারয়োপযোগী পানির ১% বা মোট পানির .০০৭% হলো সহজলভ্য পানি। এই পানির উৎস হল নদী, হ্রদ, পুকুর, খাল বিল এবং ভূগর্ভস্থ আধার। পৃথিবীর ব্যবহার উপযোগী পানির বন্টন আবার সুষম নয়। কোথাও বৃষ্টিপাত নেই বললেই চলে আবার কোথাও কোথাও অত্যধিক বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। মরু এবং অর্ধমরু এলাকা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ৪০% হলেও এই এলাকায় প্রাপ্য পানির পরিমান মাত্র ২%।

আবার বছরের বিভিন্ন সময়ে পানির প্রাপ্যতার পরিমানও ভিন্ন; বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি, শুস্ক মৌসুমে পানির সংকট। পৃথিবীতে বছরে বৃষ্টিপাতের পরিমান ১ লক্ষ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এরমধ্যে বেশীরভাগ বায়ুমন্ডলে বা¯পীভূত হয়ে যায় অথবা মাটি এবং গাছপালা শুষে নেয়। বছরে ৪২,৭০০ বর্গকিলোমিটার পরিমান পানি নদনদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। বর্ধিত জনসংখ্যার কারনে নদনদীতে বহমান মাথাপিছু পানির পরিমান ১৯৭০ সালের তুলনায় ১৯৯৫ তে কমেছে ৩৭%।

এশিয়া মহাদেশে যদিও এখানে সবচে বেশী পরিমান পানি নদ-নদী দিয়ে প্রবহমান হলেও এ অঞ্চলে মাথাপিছু পানির প্রাপ্যতা সবচে কম। কারন, এশিয়াতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের বসবাস। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ওসেনিয়া এলাকায় বেশিরভাগক্ষেত্রে শুষ্ক হলেও সেখানে মাথাপিছু প্রবহমান পানির পরিমান সর্বোচ্চ। কারণ, সেখানে জনবসতি অপেক্ষাকৃত কম। বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখিয়েছেন যে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার জন্য প্রাপ্য সমস্ত নদ-নদী এবং জলাধারগুলোর সহজলভ্য পানির বাৎসরিক পরিমান ১২,৫০০ বর্গকিলোমিটার। এর অর্ধেক পরিমান পানি আমরা এখন ব্যবহার করে থাকি। এ থেকে মনে হতে পারে যে যথেস্ট পানি আছে, কিন্তু যদি নৌযোগাযোগ, পানি বিদ্যুৎ, পরিবেশ, গাছপালা এবং জলজ প্রানীর চাহিদা বিবেচনা করা হয় তা মোটেও যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের এক হিসেব অনুসারে ২০২৫ সাল নাগাদ ৩০টি দেশে পানি দুর্লভ হয়ে পড়বে, যা ১৯৯০ সালে ছিল ২০টি। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ও ইউনিসেফ এর ২০০৬ সালের রিপোর্ট অনুসারে পৃথিবীর ৭৮ কোটি মানুষ বা ১১% মানুষ নিরাপদ পানি পায় না। ২০০৮ সালের হিসেবে এ সংখ্যা ৮৮ কোটি এবং ২০১২ সালের হিসেবে ১০০ কোটি মানুষ পানি সঙ্কটে ভুগছে। বিশুদ্ধ পানি এবং পয়ঃনিস্কাশনের অভাবে বছরে মোট ৩৫ লক্ষ মানুষ পানিবাহিত রোগের কারনে মারা যায়। ১৪ লক্ষ শিশু মারা যায়। সে হিসেবে প্রতিদিন মারা যায় ৪,০০০ জন এবং প্রতি ২০ সেকেন্ডে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করছে একজন করে শিশু। দূষিত পানির কারনে মৃত্যুর পরিমান যেকোনো সময়ে যুদ্ধে মারা যাওয়া লোকসংখ্যার চেয়ে বেশী। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার হিসেবমতে বিশুদ্ধ পানি, পয়নিস্কাশন এবং স্বাস্থ্যবিধিমালা মেনে চলে ডায়রিয়া জনিত রোগ ৬৫% কমানো সম্ভব। ইউএনডিপি’র মতে পানি এবং স্যানিটেশনের পেছনে ১ ডলার খরচ ৮ ডলারের সমপরিমান উৎপাদনের নিশ্চয়তা দেয়। বস্তি এলাকায় বসবাসরত লোকেরা একই শহরে ধনী ব্যাক্তিদের তুলনায় ৫-১০ গুণ বেশি খরচ করেন। একজন আমেরিকান ৫ মিনিট ¯œান করতে যে পরিমান পানি ব্যবহার করেন তা উন্নয়নশীল দেশে ১ জনের সারাদিনের পানি ব্যবহারের সমান। উত্তর আমেরিকায় প্রতিজন প্রতিদিন ব্যবহার করে ৪০০ লিটার, সেখানে উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রতিদিন প্রতিজন ব্যবহার করে মাত্র ১০ লিটার। (ডধঃবৎ ঝঁঢ়ঢ়ষু ধহফ ঝধহরঃধঃরড়হ ঈড়ষষধনড়ৎধঃরাব ঈড়ঁহপরষ (ডঝঝঈঈ))।

একইভাবে, একজন ইসরাইল নাগরিক যেখানে প্রতিদিন ৩০০ লিটারেরও বেশি পানি ব্যবহার করে থাকে, সেখানে একজন ফিলিস্তিনী পায় মাত্র ৩০ লিটার। বিশ্বজুড়ে ধনী-দরিদ্রে আয় বন্টন, খাদ্য বন্টন ইত্যাদির মতো পানি বন্টনেও বিরাজিত অসাম্য এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ক্রমশ সাধারণ মানুষের কাছে দুর্লভ করে তুলছে। ফলে সকলের জন্য নিরাপদ পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা বিশ্বজুড়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসে প্রাপ্ত তথ্যমতে, পৃথিবীতে পানি নিয়ে প্রথম যুদ্ধ হয় আজকের ইরাক ভূখন্ডে। যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৩১শ’ বছর আগে ইউফ্রেতিস নদীর পানি নিয়ে তৎকালীন ইরাক বা মেসোপটেমিয়ার দু’টি ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। এ দু’টি নগর রাষ্ট্রের একটির নাম ছিল 'ল্যাগাস' এবং অন্যটির নাম ছিল 'উম্মা'।

কৃষিকাজের জন্য ইউফ্রেতিস নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল এ দু’টি রাষ্ট্রের অধিবাসীরা। একসময় উজানের রাজ্য ল্যাগাসের রাজা তার দেশকে কৃষিতে আরও সমৃদ্ধ করতে নদীতে একটি প্রশস্ত খাল কেটে নদী থেকে পানি সরিয়ে নিতে শুরু করেন। এতে পানি সংকটের কারণে ভাটির দেশ উম্মার কৃষিসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ফলে জনগণের দুর্দশা লাঘবে উম্মার রাজা পানির জন্য ল্যাগাসের রাজার কাছে আবেদন করেন। কিন্তু ল্যাগাসের রাজা এ আবেদনে সাড়া না দিলে দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। পানির জন্য প্রাণ হারান দুই দেশের দুই রাজাসহ হাজার হাজার নাগরিক। পানি নিয়ে এমনি অসংখ্য সংক্ষুব্ধ পরিস্থিতি অবলোকন করেছে পৃথিবী, যার মধ্যে শাত-ইল-আরব জলাধার নিয়ে ইরাক-ইরান বিরোধ, সুয়েজ খাল নিয়ে মিশর ও ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধ, ইসরাইল, জর্ডান এবং প্যালেস্টাইনের মধ্যে জর্ডান নদী এবং গ্যালিলি সাগর( ঝবধ ড়ভ মধষরষবব), পানামা খাল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র- পানামা বিরোধ, ইউফ্রেটিস- টাইগ্রীস বা দজলা ফোরাত নদীর পানি নিয়ে সিরিয়া, ইরাক এবং তুরস্কের মধ্যে বিরোধ ইত্যাদি। পানি নিয়ে এই বিরোধ চলছে খরাপীড়িত আফ্রিকায়, চলছে নদ-নদীবহুল এশিয়ায়, দক্ষিণ এশিয়ায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিরোধ চলছে দুই প্রতিবেশি ও বন্ধুপ্রতিমদেশ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে।

দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলো বাঙ্গলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং চীন তথা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বসবাস। জনঘনত্বের মতো নদ-নদীর সংখ্যাও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে বেশি। এখানকার বড় বড় নদীগুলো একাধিক দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত। এরমধ্যে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি নদ-নদী পৃথিবীর ১০টি বিরোধপূর্ণ নদীর অন্যতম। উল্লিখিত তিনটি নদীর মধ্যে দুটি তথা গঙ্গা ও বৃহ্মপুত্রের পানি বন্টন নিয়ে বাংলাদেশ ভারতের অর্ধশত বছরব্যাপী টানাপোড়েন চলছে। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকশত নদ-নদী বিরাজমান থাকলেও এগুলোর প্রবাহিত পানির প্রায় ৯০ শতাংশ আসে উজানের দেশ ভারত থেকে। গঙ্গা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো বেশকয়েকটি বড় বড় নদ-নদীসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪/ ৫৫ টি যৌথনদী রয়েছে। পৃথিবীতে এরকম অনেক নদী রয়েছে যেগুলো একইসঙ্গে একাধিক দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নীল নদ ১০টি দেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত। এসকল নদ-নদীর পানি বন্টন ও ব্যবহার নিয়ে যাতে কোনো বিরোধ না ঘটে সেলক্ষ্যে হেলসিংকি চুক্তির মতো যৌথনদীর পানি বন্টন সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, চুক্তি ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এসকল চুক্তি ও নীতিমালায় যৌথনদীর পানি সমবন্টনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারত তার অন্যান্য প্রতিবেশিদেশগুলোর যৌথনদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে সাবেক মার্কিন এটর্নি জেনারেল হরমনের হরমন ডকট্রিনের বাস্তবায়ন ঘটাতে প্রয়াস পায়। এই তত্ত্বে পানির ওপর ভাটির দেশের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। কেননা, হরমন বিশ্বাস করতেন নদী কখনো অভিন্ন স¤পদ হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের পার্শ্ববতী ছোট্ট দেশ মেঙ্কোর সঙ্গে পানি বিরোধে তিনি এই তত্ত্ব হাজির করেন।

ভারত যৌথনদী ব্যবহারের আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালার বিপরীতে উল্লিখিত তত্ত্ব বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। একইভাবে তিস্তা নদীর ওপর ব্যারেজ নির্মাণ করে। সম্প্রতি বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ শুরু করেছে এবং ব্রহ্মপুত্রসহ অবশিষ্ট নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপক উচ্চাভিলাসী আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়াস পাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, কেবল গঙ্গা ও তিস্তার পানি বন্টন নিয়ন্ত্রণের ফলে যেখানে বাংলাদেশের বিপুল অংশ ক্রমান্বয়ে মরুময় হয়ে উঠছে, সেখানে টিপাইমুখ বাঁধ ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প চালু হলে যে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, প্রকৃতি তথা ১৬ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সামগ্রিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একথাও এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ ভূখন্ডগত, জনবল, অর্থবল ও সামরিকশক্তির দিক থেকে অনেক ছোট। তাই ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করে পানির অধিকার আদায় করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ভারতের এই স্বৈরাচারী ভূমিকা তার পার্শ্ববতীদেশ চীনকেও একই ধরনের আচরণে উস্কানী দিচ্ছে। এ অঞ্চলের অন্যতম দীর্ঘ নদ ব্রহ্মপুত্রের উদ্ভব চীনের তীবব্বত অংশে। চীন তার প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে এ নদীর গতিপথ পরিবর্তন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আর চীন এ নদীর নিয়ন্ত্রণ হাতে নিলে ভারতের এক বিশাল অংশ সামগ্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এক বিস্তৃত উর্বর ভূখন্ড পুরোপুরি মরুভূমিতে পরিণত হবে। তাই এক্ষেত্রে যৌথনদী ব্যবহারে কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা না পেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ সংঘাত অনিবার্য।

অন্যদিকে, ভারতের কাছ থেকে যৌথনদীর আন্তর্জাতিক হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতাও অনেকাংশে দায়ী। পানি রাজনীতিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ম্যাক গ্রেগর বলেন, বাংলাদেশ নদীর পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগেই পরাজিত হয়; যদিও তারই পানি পাওয়ার ন্যায্য অধিকার রয়েছে। কারণ কূটনৈতিক দক্ষতার অভাব। এদেশের কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এখন পর্যন্ত যৌথনদীর ন্যায্য হিস্যা নিয়ে কোনো মডেল বা কাঠামোগত হিসেব বিশ্বদরবারে এমনকি ভারতের কাছেও পেশ করতে পারেনি (ড. মো. আমিনুর রহমান : ২০১২)।

এর পরিবর্তে সকল সমস্যা সমাধানকল্পে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। এমনকি ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন নদীর পানি বন্টন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে এ পর্যন্ত সরকারগুলো কী কী চুক্তি করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ জনগণকে জানানো হয় না। জনগণ কেবল গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পায়- বাংলাদেশ ফারক্কার ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না, তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়ে কোনো ফয়সালা হয়নি, টিপাইমুখে বাঁধ হচ্ছে এবং এ বাঁধ হলে নাকি বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না, ভারত তার বিভিন্ন খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে পানি সরবরাহের জন্য আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করছে ইত্যাদি। বিগত একচল্লিশ বছরে কেবল একের পর এক বেঠক করার সংবাদ ছাড়া তেমন কিছুই এদেশের মানুষ জানতে পারেনি। অর্ধশতাধিক নদীর পানি প্রাপ্তি নিয়ে আলাদা আলাদা চুক্তি করার বদলে সবগুলোর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর যৌথনদী কমিশন করা যায় কিনা সে দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, মানবন্ধন ইত্যাদি চললেও বাংলাদেশের জন্য সমূহ অশনিসংকেত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে তেমন কিছু হচ্ছে না। এমনকি একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও করা হয়নি। অথচ আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ৫,৬০০ বিলিয়ন রুপির প্রকল্প, ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। এ পরিকল্পনায় হিমালয়ের নদীগুলো নিয়ে যে অংশ তাতে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মপুত্র, কোসী, গন্দক, ঘাগড়াসহ বৃষ্টিভেজা ও পানির দিক থেকে ধনী পূর্বদিক থেকে শুকনো ও পানির দিক থেকে গরিব গঙ্গার পশ্চিম অববাহিকা এবং যমুনায় নিয়ে যাওয়া হবে। এখানে কৌশল হিসেবে ভারত তার সুপ্রীম কোর্টের মাধ্যমে সরকারকে এটি বাস্তবায়ন করার নির্দেশ প্রদান করে, যাতে সরকারের বাধ্যবাধকতা প্রকাশ পায়। সুদূরপ্রসারী এ প্রকল্প ১৮৩৯ সালে স্যার আর্থার কটন পেশ করলেও তা দীর্ঘদিন নিভৃতে থাকে। কিন্তু ২০০২ সালে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রস্তাবটি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবুল কালামকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে তা বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রয়াস শুরু হয়। এবছরই ভারতের সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশ প্রদান করে যে, ২০১৬ সালের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে হবে। বলাবাহুল্য- এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব একটি পরিত্যক্ত ভূখন্ডের দশায় আসীন হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই একুশ শতকে মানুষ তার ভোগ ও বিলাসিতার জন্যে অন্য অনেককিছু আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করতে সক্ষম হলেও নদী-নালা ও ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে সাগর- সমুদ্রের বিপুল জলরাশিকে শোধন করে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার সহজ ও স্বল্পব্যয়ী কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। অথচ ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা জনসংখ্যার জন্যে বাড়তি খাদ্য ও অন্যান্য সেবাসামগ্রীর যোগান দিতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে পানির চাহিদা। অতিরিক্ত চাপ পড়ছে স্বাদু পানির সহজলভ্য উপরস্থ ও ভূগর্ভস্থ আধারের ওপর।

কেননা, আন্তর্জাতিক নদীতে ভারতের অন্যায্য বাঁধের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরের এবং বিশেষকরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর নদী-নালা, খাল-বিল ভয়ানক আগ্রাসন ও দূষণের শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর সরকারি-বেসরকারি আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী অগ্রণী ভূমিকায় আসীন হচ্ছেন। ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চলের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে নদীগুলোর বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয়া হয়েছে, খালগুলো ভরাট করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হগয়েছে। শহরের সন্নিকটস্থ জলাধারগুলো কর্পোরেট আবাসনজীবীদের দখলীভূত হয়ে গেছে। পাশাপাশি কল-কারখানাসহ গৃহস্থালীর বর্জ্য পদার্থ এখানে যত্রতত্র ফেলায় ঢাকার প্রধান নদী বুড়িগঙ্গার পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে; নিকটস্থ শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু প্রভৃতিও একই দশায় উপনীত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। ওয়াসার সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকার ৮২ শতাংশ মানুষের মলমূত্র মিশছে বুড়িগঙ্গায়। এরসঙ্গে রয়েছে গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক বর্জ্য। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যরে ৪৯ শতাংশ ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, প্রতিদিন হাজারিবাগ শিল্পাঞ্চল থেকে ১৬ হাজার ঘনলিটার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে ৩ হাজার ৭ শ’ ঘনলিটার দূষিত বর্জ্য মিশ্রিত পানি রাজধানীর নদীগুলোতে মিশ্রিত হচ্ছে। সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এসকল নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে অভিযান চালিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের যোগসাজসে দখলদাররা পুণরায় স্থানু হয়ে বসে।

গত দু’দশকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদগুলোতে শুধু ভূপৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে এখানকার অধিবাসীরা পানির ভূগর্ভস্থ আধারের ওপর অধিকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু এ আধারের অতিরিক্ত ব্যবহারের দরুণ একদিকে আর্সেনিকের দূষণ ঘটেছে, অন্যদিকে ভূউপরস্থ লবণাক্ততার প্রভাবে ভূগর্ভের পানি এমনকি মাটিতেও বহুগুণ লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। আর ৩ কোটি মানুষের এই বিস্তৃত অঞ্চলে এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য প্রথমত এবং প্রধানত দায়ী ধনিক বণিক মুনাফাখোরদের অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ। দ্বিতীয়ত, উজানে ফারাক্কা বাঁধসহ ভারতের আরো কিছু বাঁধের কারণে নদ-নদীগুলোয় মিঠাপানি প্রবাহের অভাব এবং মাথাভাঙ্গা, ইছামতি, কপোতাক্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী নদ-নদীগুলোর মৃত্যু। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি এবং সিডর-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি। এখানে একদিকে মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক ধনী ও ক্ষমতাশালী মানুষের জন্য এবং আপাতদৃষ্টিতে দেশের রপ্তানি-আয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ইতিবাচক ও লাভজনক হলেও ক্ষতায় পিছিয়ে থাকা সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের জন্য এটা মরণজল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমোক্ত শ্রেণীটি অতিরিক্ত মুনাফার আশায় গত দু-তিন দশক যাবত উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিতে কৃত্রিমভাবে লোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়িচাষ সম্প্রসারিত করায় পুরো এলাকা লবণবিষে ভরে গেছে। লবণ দ্রুত ঢুকে পড়ে পুকুর-ডোবা এবং ভূগর্ভস্থ পানির আধারও দখল করে ফেলেছে। ফলে তারা নিরাপদ পানীয়জল প্রাপ্তির মতো একটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি তথা সামগ্রিক জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে খুলনা অঞ্চল বিশেষকরে সাতক্ষীরার কোনো কোনো এলাকার মানুষকে ১০/১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও খাবার পানি আনতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ১০ লিটারের সমপরিমাণ ১ কলসি পানির জন্য ৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। একেকটি পরিবারের খাবার পানি জোগাড় করতে দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতিগতভাবে ঘরেরকাজের দায়িত্ব নারীদের পালন করতে হওয়ায় এ পরিস্থিতিতে তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে। কখনো কখনো পানির কারণে দাম্পত্যকলহ থেকে সংসারে ভাঙন ঘটছে।

পাশাপাশি নিরুপায় হয়ে আর্সেনিকযুক্ত ও লবণযুক্ত পানি ব্যবহার করতে গিয়ে এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষেরা গ্যাষ্ট্রিক-আলসার, চর্মরোগ, কিডনীরোগ ইত্যাদিতে আক্রান্ত হচ্ছে। জীবনীশক্তি হ্রাস পেয়ে কাজে অনীহা সৃষ্টি করছে। নোনামাটিতে তেমন ফসল না ফলায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী কৃষিপেশা, জীবিকা হারিয়ে ফেলছে সাধারণ দরিদ্র মানুষ। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র, ব্যাপকহারে হ্রাস পাচ্ছে হাস-মুরগী, গরু-ছাগলের মতো গৃহপালিত প্রাণীদের হার। আর পরিস্থিতি মোকাবেলায় হেরে গিয়ে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ফেলে অনিশ্চিত অজানার পথে নিয়মিত স্থানান্তরিত হচ্ছে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আদমশুমারি প্রতিবেদনে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সারাদেশে যেখানে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষমতা আর ক্ষমতার রাজনীতির কাছে এভাবেই নিরাপদ পানির মৌলিক অধিকার হারানোর নির্মম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, দরিদ্র মানুষ।
-

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৩

বাংলাদেশের পানিসম্পদ, বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ


"Everything originates in water
 Everything sustained by water"
                                      - Johann Wolfgang von Goethe (1749-1832)

পানি প্রাণের অস্তিত্বের অপর নাম। তাই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে পানির প্রাপ্তির সহজলভ্যতাকে আশ্রয় করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের আবাস গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পানিবাহিত পলিমাটি দিয়ে গঠিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ, যা পরাক্রমশালী নদী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (এইগ) বেসিন বা অববাহিকার সৃষ্টি। এর প্রবাহিত এলাকা প্রায় সাড়ে দশ লক্ষ বর্গকিলোমিটার যার ৭.৫% বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে গিয়ে সাগরে পড়েছে। বাংলাদেশের চার-পঞ্চমাংশ ভূখন্ড তৈরি হয়েছে গঙ্গা (পদ্মা)-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (বরাক) নদী সিস্টেমের মাঝে। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থা ৫টি দেশ যথা ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশ জুড়ে রয়েছে।
অববাহিকা-অঞ্চলে প্রায় ৩০০০ বছর বা তারও পূর্ব থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তার একটি অংশ ইতিহাসের নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে এসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শত শত নদীর হাজার বছর ধরে বয়ে আনা পলিমাটির উর্বর সবুজ-শ্যামল ব-দ্বীপে জড়ো হয়ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানাবিধ নৃগোষ্ঠীর মানুষ; বিচিত্র জাতের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্র জাতিগোষ্ঠী।  নদীনালা, খালবিলসহ ভূ-উপরস্থ ও সহজলভ্য ভূ-গর্ভস্থ পানি এদেশের ভূমিপুত্রদের কল্যাণে ব্যবহৃত সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ যা তাদের জীবন-জীবিকা ছাড়াও এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে অবিকল্প ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত দুটি প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি পেয়ে থাকে- (ক) নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুর তথা ভূউপরস্থ জলাশয় এবং (খ) ভূগর্ভস্থ পানি, যা গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। এছাড়া আরেকটি অপ্রধান উৎস হিসেবে রয়েছে বৃষ্টির পানি। এক্ষেত্রে দুটি প্রধান উৎসের প্রথমটির ওপর দ্বিতীয়টি স¤পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।

দেশের প্রায় সর্বত্র দিয়ে বয়ে যাওয়া শিরা-উপশিরার মতো নদীনালাগুলো এদেশের ভূচিত্র রচয়িতা ও এদেশের প্রাণ। এ প্রাণের ধারায় গড়ে উঠেছে এদেশের মানুষের জীবনধারা, হাজার বছরের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ইতিহাস। আর এজন্যেই বাংলাদেশকে নদীমাতৃকদেশ বলা হয়। প্রতিটি নদীই নির্দিষ্ট অঞ্চলে তার নিজস্ব অবদানের ক্ষেত্রে স্বমহিমায় অভিষিক্ত। জীবনের জন্য অপরিহার্যতা বিবেচনায় ভালোবেসে নদ-নদীগুলোকে দেওয়া হয়েছে অসাধারণ সুন্দর সুন্দর নাম- আত্রাই, আড়িয়াল খাঁ, কপোতাক্ষ, করতোয়া, কর্ণফুলী, কাঁকন, কীর্তনখোলা, কীর্তিনাশা, কুশিয়ারা, খোয়াই, গড়াই, চিত্রা, জলঢাকা, ডাকাতিয়া, তিতাস, তিস্তা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, ধানসিঁড়ি, নাফ, পশুর, পদ্মা, পাহাড়ীয়া, পুণর্ভবা, ফেনী, বড়াল, ব্রক্ষ্মপূত্র, বাঙালি, বালু, বিরিশিরি, বুড়িগঙ্গা, ভৈরব, মধুমতী, মনু, মহানন্দা, ময়ূর, মাতামুহুরী, মুহুরী, মেঘনা, যমুনা, রূপসা, শঙ্খ, শিবসা, শীতলক্ষ্যা, সাঙ্গু, সুরমা, হালদা ইত্যাদি।

বাংলাপিডিয়া ও মাধ্যমিক ভূগোল গ্রন্থে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদনদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০টি; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান পকেট বুক ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর সূত্রমতে এ সংখ্যা ৩১০টি। তবে সংখ্যা যাইহোক, ২৪,১৪০ কিলোমিটার (বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এ নদীগুলো ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, সুরমা-মেঘনা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীসমূহ- এ ৪টি নদীব্যবস্থায় বিভক্ত। বাংলাদেশের অস্তিত্বের অপর নাম এদেশের নদীনালা। এসব নদ-নদীকে ঘিরেই এদেশের শহর-বন্দর-গঞ্জ-বাজার-ঘাট গড়ে উঠেছে। সহজে ও সুলভে মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের প্রধান পাথেয় নদী। বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম খাত কৃষি পুরোপুরি এদেশের সহজলভ্য নদীনালার পানির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির অপরিহার্য খাত শিল্প-কলকারখানাগুলো তাদের পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনে নদীনালার ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে স্মরণাতীতকাল থেকে এদেশের মানুষের প্রাণীজ আমিষের প্রধান উৎস, বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার উৎস, অন্যতম রপ্তানীখাত মৎসসম্পদ এদেশের নদীনালার ওপর নির্ভরশীল। এসকল প্রত্যক্ষ বিষয়াদি ছাড়াও পরোক্ষভাবে এসকল নদীনালা দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষের পাশাপাশি হাজার প্রজাতির পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় প্রভৃতির জীবনযাত্রা নদীকে আশ্রয় করে। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানিতে মরণঘাতী আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের সুপেয় পানির প্রধান আধার হিসেবে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে এদেশের নদ-নদী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী পানির তীব্র চাহিদা বৃদ্ধি এবং এলক্ষ্যে শুরু হওয়া পানি-রাজনীতির শিকার হয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে নদীর সঙ্গে এদেশের অধিবাসীদের আচ্ছেদ্য সম্পর্কের ভারসাম্যে বিঘœ ঘটতে শুরু করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের পানি প্রবাহের শতকরা ৯০ ভাগ পানির উৎস বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত। এদেশের ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টির উৎস ভারতে এবং ৩টির উৎস মায়ানমারে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর সমন্বয়ে বাংলাদেশে স্বাদু পানির যে প্রবাহ বিদ্যমান, তা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী প্রবাহ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা- কোনো কারণে এসকল নদ-নদী শুকিয়ে গেলে গোটা দেশটিই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। আর এ আশংকা এদেশের মানুষের মনে এখন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা, প্রতিবেশীদেশ ভারত অভিন্ন নদী ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে এগুলোতে একের পর এক বাঁধ নির্মাণপূর্বক পানি প্রত্যাহার শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং তাকে কেন্দ্র করে কৃষিকাজে ও সুপেয় পানির চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পানি-রাজনীতির ভয়াবহ বিস্তার ঘটাচ্ছে।

কেননা, পৃথিবীর মোট আয়তনের তিন-চতুর্থাংশ পানিবেষ্টিত হলেও মানুষের ব্যবহারযোগ্য পানির পরিমাণ খুব বেশি নয়। এক হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের মোট প্রাক্কলিত পানির পরিমাণ ১৩৮৬ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার। এর শতকরা ৯৬.৫ ভাগ তথা ১৩৪০ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানির উৎস সমুদ্র। সমুদ্রের এ পানি লবণাক্ত এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ড ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী। অন্যদিকে মিঠাপানির পরিমাণ মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৩৫ মিলিয় কিউবিক কিলোমিটার। কিন্তু এরমধ্যে ২৪.৪ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার তথা পানযোগ্য এ সামান্য পরিমাণ পানির দুই-তৃতীয়াংশ আবার মানুষের ধরাছোয়ার বাইরে হিমবাহ এবং মেরু অঞ্চলে জমাট বরফ অবস্থায় রয়েছে। অবশিষ্ট ১০.৬ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানি সুপেয়, যা পৃথিবীর মোট পানিসম্পদের শতকরা ০.৭৬ ভাগ মাত্র। এরমধ্যে আবার উল্লেখযোগ্যঅংশ জনবসতি থেকে এতদুরে যে তার নাগাল পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পৃথিবীতে যত পানি রয়েছে তার মাত্র ০.০৮ শতাংশ পরিমাণ পানি মানুষের ব্যবহারের আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ পানি একটি সীমিত প্রাকৃতিক স¤পদ এবং কোনোভাবেই প্রকৃতির অন্তহীন দান হিসেবে পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের অবকাশ নেই। তাই বর্তমান শতকে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি  অপর যে সমস্যাটি বিশ্ববাসীর সমুখে এসে দাঁড়িয়েছে, তা হচ্ছে নিরাপদ পানি।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে প্রচন্ড পানি সংকট দেখা দিবে। এসময় পৃথিবীর মোট ৯৩০ কোটি মানুষের ৭০০ কোটিই নিরাপদ পানির সমস্যায় পড়বে। এখনই বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ হয় পর্যাপ্ত পানি পায় না অথবা তাদের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছায় না। অন্যদিকে, অপরিশোধিত বা অনিরাপদ পানি প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ৩০ হাজার শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন উপভোগ করার আগেই পৃথিবী থেকে দুঃখজনকভাবে বিদায় নিচ্ছে।

পানি যেহেতু মানুষের জীবন, জীবিকা ও উন্নয়নের সকলক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক একটি উপাদান, সেহেতু নিরাপদ পানি প্রাপ্তি একটি মৌলিক মানবাধিকার। এই প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হওয়ার কারণে সারাবিশ্বে এটি এখন কৌশলগত প্রাকৃতিক উৎসে পরিণত হয়েছে। পানির প্রাপ্যতা ক্রমেই কমে যাওয়ায় এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তীকালে তেলের মত গুরুত্ব বহন করবে পানি। ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাজেল্ডিন বলেছিলেন- বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের মূল কারণ যদি হয়ে থাকে তেল, তাহলে একুশ শতকে যুদ্ধের কারণ হবে পানি।কেননা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে পানির ব্যবহার বাড়বে, সুপেয় পানির অভাব সৃষ্টি হবে, যার ফলে উজানের দেশগুলো পানি ব্যবহারের ওপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করবে, নদ-নদীর পানি প্রত্যাহার করা শুরু করবে। এতে উপকূলীয় দেশগুলোতে লবণাক্ততার পরিমান বাড়বে। কিন্তু এ লবণাক্ত পানি ব্যবহার উপযোগী নয় বলে মিঠা পানি নিয়ে পাশাপাশি রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়বে।

অন্যদিকে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পানি-রাজনীতিতে শক্তিমত্তা ও বুদ্ধিমত্তায় প্রতিবেশিদেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি দেশটি তার অভ্যন্তরভাগে বিরাজিত জলাধারগুলো সংরক্ষণ ও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহারেও উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। নগরায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গিয়ে শহর ও উপশহরের চারিদিকে বিদ্যমান জলাধারগুলো অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করে যেমন গড়ে উঠছে আবাসনপ্রকল্প, তেমনি একইরকম রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক কুপ্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ভরাট করে যাচ্ছে শহরগুলোর পার্শ্ববর্তী নদীনালার দুই পাড়। একইভাবে পরিবেশ সংরক্ষণের বিদ্যমান নীতিমালা ও আইন-কানুনকে পাত্তা না দিয়ে কলকারখানাগুলো তাদের শিল্পবর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত করতে শহর-সন্নিকটের খাল-বিল নদী-নালাকে।

বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজধানীশহর ঢাকা তার নাগরিকদের মলমূত্র, আবর্জনা, ও শিল্প-রাসায়নিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করেছে নদীটিকে। ওয়াসার সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকার ৮২ শতাংশ মানুষের মলমূত্র মিশছে বুড়িগঙ্গায়। এর সঙ্গে রয়েছে গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক বর্জ্য। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের ৪৯ শতাংশ ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও শিল্প কারখানার বর্জ্য বহন করতে গিয়ে বুড়িগঙ্গা মারাত্মক দূষণের শিকার হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, প্রতিদিন হাজারীবাগ শিল্পাঞ্চল থেকে ১৬ হাজার ঘনলিটার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে ৩ হাজার ৭ শঘনলিটার দূষিত বর্জ্যমিশ্রিত পানি রাজধানীর নদীগুলোতে মিশ্রিত হচ্ছে। শিহরিত হওয়ার বিষয় যে, এই নদীর পানি এখন এতটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে যে এ পানিতে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকেই নাকি ১০ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর পড়েছে ! ঢাকার পার্শ্ববর্তী শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বালু আর তুরাগেরও প্রায় সমদশা। শুধু বুড়িগঙ্গা নয় তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং বালু নদীর তীর ধরে গড়ে উঠেছে বেশুমার শিল্প-কারখানা। শত শত কল-কারখানার শিল্পবর্জ্য আর কয়েকলাখ মানুষের নর্দমার ময়লায় শীতলক্ষ্যা ইতোমধ্যে বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বালু নদী একসময় রাজধানীর ঢাকার পূর্বপার্শ্বে প্রবাহিত হলেও এখন তা আর নদী হিসেবে নেই। এখন এর তীরে দাঁড়ালে চোখে পড়বে ময়লা পানিতে ভরপুর ডোবা। পানিশূন্য এ নদীর মাঝবরাবর রাস্তা নির্মিত হয়েছে, যা এসে মিলেছে আরেকটি সদ্যনির্মিত রাস্তার সঙ্গে, এ রাস্তাটি চলে গেছে বনশ্রী আবাসিক প্রকল্পের দিকে। তুরাগ আর ধলেশ্বরী নদীর অবস্থাও তথৈবচ। কখনো কখনো সরকারি তরফ থেকে এসকল নদী-নালাকেন্দ্রিক অবৈধ জবর-দখল উচ্ছেদকল্পে অভিযান চালানো হলে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকার পর পুণরায় বিপুল উদ্যোমে দখলপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে ২০০৭-এর জুন পর্যন্ত ১৩ দফায় বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-শীতলক্ষ্যা নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে কয়েক কোটি টাকা খরচ হলেও পরবর্তীতে নদী খেকোরা বেশিরভাগ উদ্ধারকৃত জায়গা আবার দখল করে নেয়। অন্যদিকে, কলকারখানার বর্জ্য আর মানুষসৃষ্ট বর্জ্যের ভয়াবহ দূষণে অত্যাধুনিক পানি-পরিশোধন প্লান্টেও এসকল নদীর পানি বিশুদ্ধ করা দূরহ হয়েছে; বিশুদ্ধ করার পরও পানিতে দুর্গন্ধ থেকে যায়। এমনকি পানির দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

একইরকম না হলেও ভিন্নতর করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি ঢাকার বাইরের এবং সারাদেশের অধিকাংশ নদীগুলোপ্রবল প্রবহমানতার কারণে প্রমত্ত উপাধিধারী দেশের ২য় বৃহত্তম নদী পদ্মা। পদ্মা ও মেঘনার মিলিত প্রবাহটি মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা। কিন্তু বর্তমানে প্রমত্তা পদ্মার সেই প্রবাহ আর নেই। ক্রমাগত পলি জমে নদীর বিভিন্ন স্থানে (বিশেষকরে রাজশাহীতে) অনেক স্থায়ী চরের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে পানির প্রবাহ ও মাছের বৈচিত্র্যতা ও প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদীর বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ মাছ ধরার জাল (কারেন্ট জাল) ব্যবহার করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আহরণের ফলেও মাছের উৎপাদনের উপর ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রস্তাবিত ১ম ও ২য় পদ্মাসেতু নির্মিত হলেও যমুনার মতো নাব্যতা হ্রাসের ভয়াবহতা ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিস্তার পানি প্রবাহ এ এযাবতকালের মধ্যে সর্বনিন্ম পর্যায়ে নেমে এসেছে। তিস্তা ব্যারাজ থেকে দেড়শকিলোমিটার পর্যন্ত নদী এখন স্রোত না থাকায় মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার দূর্বার গতিকে থামিয়ে দেয়। বছরের পর বছর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্মৃতি নিয়ে বয়ে চলা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রমত্ত চিত্রা নদীও আজ তার ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং যশোরের কপোতাক্ষ থেকে বের হওয়া নদীগুলো বর্ষার কয়েক মাস পানি থাকে, বাকি সময়গুলো শুকিয়ে যায়। আর নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ নদীর দুতীরে দখল করে বসতবাড়ি-মার্কেট তৈরি করছে। কাপ্তাই লেকের পানি কমতে থাকায় ও অবৈধ দখলের কারণে হুমকিতে পড়েছে কর্ণফুলী। এসব নদীর উজানে বাধার কারণে বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটি অঞ্চলে।

বিআইডব্লিউটিএ নদী সংরক্ষণ বিভাগের হিসেবমতে, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল যা বিভিন্ন কারণে হ্রাস পেতে পেতে এখন প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে। শুষ্ক-মৌসুমে নদীপথের এ দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারে। এ পরিমান ফি-বছর আরও কমে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কেননা গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (বরাক) এই তিনটি বড় এবং প্রধান নদ-নদীসহ যে ৫৪টি ছোট-মাঝারি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত রয়েছে, তারমধ্যে ৪৮টি নদীর পানি প্রবাহকে ভারত নানা প্রক্রিয়ায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। সীমান্ত নদীর উজানে পানি প্রবাহে বাধার কারণে বিপর্যস্ত ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো। পানির অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদ-নদী মরে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীগুলোতে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে এবং নাব্যতা হারানোর ফলে বছর বছর বন্যা দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে দেশের শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যস¤পদ, নৌপরিহন ও আবহাওয়া-পরিবেশে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলাশয় ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজ, চলমান টিপাইমুখ বাঁধ এবং প্রস্তাবিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৈষম্যমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলাদেশকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুকনো মৌসুমে গঙ্গা অববাহিকার নদ-নদী খালবিলগুলো ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে। প্রবাহশূন্য হয়ে পড়েছে মহানন্দা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, বেতনা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, ইছামতির মতো বড় বড় নদীগুলো। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রে এখন পর্যন্ত কোনো বাঁধ নেই। কিন্তু শুকনো মৌসুমে চীন ও ভারত অসংখ্য পা¤প বসিয়ে এই নদীর পানি টেনে নেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ কমে আসে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাতে। তাই, যাদের হাতে এদেশের মানুষ ক্ষমতা তুলে দেয় তারা যদি দেশ ও দেশের মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নে উদাসীন থাকেন, তাহলে এদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে নদী দেখতে বইয়ের পাতা নয়তো ভারতে যাওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না। 

ভূ-উপরস্থ পানির সহজলভ্যতার মতো ভূগর্ভেও সহজলভ্য মিঠা পানির দেশ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে আজকাল গভীর নলকূপও বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে পারছে না। কেননা, নদ-নদীর পানি সহজলভ্য না থাকায় মানুষ তার প্রয়োজনে দৈনন্দিন ব্যবহার ছাড়াও কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে আসছে। ফলে স্বভাবতই পানির স্তর নিচে চলে গেছে এবং সেখানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পানির দূষণ ঘটাচ্ছে।

অন্যদিকে, সমূদ্র সমতল হতে গড়ে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বাংলাদেশের বিস্তৃত সমতল ভূমির নদ-নদীগুলোতে পানিস্বল্পতার কারণে সেখানে জোয়ার-ভাটার টানে বঙ্গোপসাগর থেকে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটছে। মিঠাপানির অভাবে হুমকিতে পড়েছে বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। সুন্দরবনসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদী ও বর্ষায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।


অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, প্রতিবেশিদেশ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারসহ নানাবিধ অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ ও সুশীল শ্রেণীর মতো রাজনীতিক নেতৃবৃন্দও উচ্চকন্ঠ হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি নদী বাঁচাতে সরকার কিছু কিছু নদী খননের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কুষ্টিয়ায় গড়াইসহ কিছু নদীর খননকার্য শুরু হয়েছে। তবে খনন করে নদী রক্ষা করা সম্ভব বলে সাধারণ অভিমত প্রচলিত থাকলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, পানির প্রবাহ না থাকলে খননের মাধ্যমে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। নদী খননের নামে অর্থ বরাদ্দ করে লুটপাটই করাই নদী খননের মূল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে, দেশকে বাঁচাতে হলে একাধারে নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে এবং নদ-নদীসহ দেশের অন্যান্য জলাশয় দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীই হচ্ছে দেশবাসীর প্রাণপ্রবাহ।

মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১২

বাংলাদেশের আদিবাসী প্রসঙ্গে


. অতুল সুর, ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, নৃতাত্ত্বিক গবেষক তাঁরবাাঙলি জীবনের নৃতাত্ত্বিক রূপগ্রন্থে বলেছেন, “ভূতত্ত্ববিদদের হিসেব অনুযায়ী প্রায় দশ থেকে পঁচিশ লাখ বছর আগে আবির্ভূত হয়েছিল মানুষের পূর্বপুরুষ তারপর বিবর্তনের পথে পাঁচ লাখ বছর আগে ঋজুভাবে চলাফেরা করতে পারে এমন মানুষের আবির্ভাব ঘটে এর পরবর্তী পর্যায়ের মানুষের নাম দেওয়া হয়েছে নিয়ানডারথাল জাতির মানুষ আনুমানিক চল্লিশ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথাল জাতির মানুষ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় তার স্থান অধিকার করে ক্রোম্যানিয়োন জাতির মানুষ আর ক্রোম্যানিয়োন জাতি থেকেই পৃথিবীর বর্তমান জাতিসমূহের উদ্ভব অর্থাৎ পৃথিবীতে বর্তমানে যত জাতি বিদ্যমান তারা সকলেই একই বর্গ প্রজাতি থেকে উদ্ভূত তাদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত যে পার্থক্য রয়েছে তার জন্যে তাদের বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর লোক বলা হয়একইসাথে তিনি আরও বলেন, “বাংলার আদিম অধিবাসীরা ছিলেন প্রাক-দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক নৃতত্ত্বের ভাষায় তাদের বলা হয় আদি-অষ্ট্রাল আদি-অষ্ট্রাল বলার কারণ হলো, অষ্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের দৈহিক গঠনের মিল রয়েছে দৈহিক গঠনের মিল ছাড়া অষ্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে তাদের রক্তের মিলও রয়েছে এক সময় আদি-অষ্ট্রালদের বসতি উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আনুমানিক ত্রিশ হাজার বছর আগে তারা ভারত থেকে অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশে গিয়ে প্রথম পৌঁছায় বাঙলার আদিম অধিবাসীরা ওই গোষ্ঠীর লোক এদের সঙ্গে মিশে গেছে আগন্তুক দ্রাবিড় ভাষাভাষী জাতি দ্রাবিড় ভাষাভাষীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল আলপীয়রা আসার আগে আর আদি-অষ্ট্রাল, দ্রাবিড় ভাষাভাষী আলপীয় নরগোষ্ঠীর লোকদের সংমিশ্রণেই বাঙলার নৃতাত্ত্বিক বনিয়াদ গঠিত হয়েছিল

উল্লিখিত এই মানববর্গই ভারত বাংলাদেশ, উপমহাদেশ এবং বৃহৎঅর্থে দক্ষিণ এশিয়া ভূখন্ডের আদি অধিবাসী ইতিহাসের সূত্র ধরে বলা হয়ে থাকে, আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, বৈদিক যুগের শেষ দিকে বহিরাগত আর্যরা অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় ভুখন্ডে পশুপালন নির্ভর যাযাবর বৃত্তির আর্যরা ছিল এখানকার আদিবাসীদের চেয়ে শারীরিকভাবে শক্তিশালী যুদ্ধজ্ঞানে দক্ষ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষী আর্যরা এই উপমহাদেশে পর পর বিভিন্ন দলে আসে, এবং কালক্রমে হিন্দু বর্ণব্যবস্থার উপরের স্তরে আসীন হয় স্থানীয় নরগোষ্ঠীদের দিয়ে তৈরি হয় নীচের স্তর

তবে বঙ্গের লোকদের সাথে বহিরাগত আর্যদের প্রচন্ড যুদ্ধও হয়েছিল আর্যরা প্রথমদিকে তাতে বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে না পারায় বঙ্গের লোকদের ম্লেচ বলে উপহাস করত এবং আর্য অন্যান্যদের আগমনের পূর্বেও ভারতবর্ষে সভ্য জাতির বসবাস ছিল তাদের মধ্যে দ্রাবিড়রা সিন্ধু অঞ্চলে এবং অস্ট্রিকরা ভারতের পূর্ব দক্ষিণ অঞ্চলে বাস করত অনেকের মতে, হরপ্পা মহেঞ্জোদারোতে উৎখননের মাধ্যমে প্রাপ্ত সভ্যতার নিদর্শন সভ্য দ্রাবিড়দের অবদানসাক্ষ্য ঘোড়া যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার জানা যাযাবর হিংস্র প্রকৃতির আর্যরা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে দ্রাবিড়দের ধাওয়া করে এবং স্বভাবতই দ্রাবিড়রা আর্যদের উন্নত কাছে পরাজিত অথবা আর্যদের আধিপত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে বেছে নেয় নির্ঝঞ্জাট অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকা সেই সময় কোল, ভিল, শবর, মুণ্ডা প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা পাহাড়ে বসবাস করত ঘন বনে ঢাকা পাহাড়-পর্বত পার হতে না পেরে আর্যরা আর এগুতে পারেনি আর অন্যদিকে দূরতিগম্য নিস্তরঙ্গ পাহাড়ের বুকে আশ্রয় নেয়া জনমানুষেরাও প্রগতিধর্মীতা ধরে রেখে সভ্যতার যথার্থ গতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি অনেক ইতিহাসতত্ত্ববিদ নৃবিজ্ঞানীর মতে, এই পাহাড়-পর্বত আর অরণ্যে পড়ে থাকা মানুষেরা- এই অঞ্চলের আদিবাসী বা পুর্বপুরুষ

বর্তমান পাকিস্তানের হরপ্পা মহেঞ্জোদারো ছাড়াও প্রতœতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে এই জনপদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন নির্দশন পাওয়া গিয়েছে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর অববাহিকায়, যার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ক্রীট দ্বীপে প্রাপ্ত প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনাবলীর সাথে এবং এতে নৃতত্ত্ববিদ ইতিহাসবিদদের ধারণা, দ্রাবিড় অষ্ট্রিকদের পাশাপাশি এই অঞ্চলে মঙ্গোলীয় জাতিরও বসবাস ছিল

সভ্যতার আদিম অবস্থায় যখন সমাজ ব্যবস্থার সুস্পষ্ট বিকাশ ঘটেনি তখনো ব্যক্তি মানুষের আদর্শ লক্ষ্য ছিল তার এই আদর্শের নির্মিতিতে ভূমিকা রেখেছে আবেগ-অনুভূতি বুদ্ধি-বিবেচনা বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা, একইসাথে যা তাকে দিয়েছে সৃষ্টির সর্বোৎকৃষ্টতার মহিমা এরপর মানুষের আদর্শের সাথে তার একাত্মতায় জন্ম নেয় এক আবেগ মহাসমুদ্রের আর তার সেই আবেগের ধ্বনিত রূপই ভাষাএই হল ভাষা যার সাথে মানুষের মনের মস্তিষ্কের গভীর সংযোগ এক একটি পরিবেশে মন মস্তিস্কের কাঠামোগত বিভিন্নতার কারণে ভাষার মধ্যে বিভিন্নতা দেখা দিয়েছে তাই দেখা দিয়েছে একই দেশে একাধিক ভাষা কিন্তু এক দেশে একাধিক ভাষা সত্ত্বেও এক জাতি গড়ে ওঠে এর দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় অসংখ্য আমাদের পাশের দেশ ভারত এর বৃহত্তম দৃষ্টান্ত”*

ভাষাগত দিক বিবেচনায় বাঙালি জাতি এই দেশের সবচেয়ে বড়ো জাতি কিন্তু বাংলা ভাষাভাষীদের এক তৃতীয়াংশ ভারতের বাসিন্দা ; এবং তারা নিজেদেরকে ভারতীয় জাতিসত্ত্বার অঙ্গীভূত বলে গর্ববোধ করে থাকে, যদিও সেখানে ভাষাগত বিবেচনায় তাঁরা অপ্রধান তেমনিভাবে এইদেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভাষাভাষীর অধিকারী হলেও এই গোষ্ঠীয় জাতিসত্ত্বায় তাঁদের চেতনার অংশগ্রহণ রয়েছে

কেবল ঐতিহাসিক নয়, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সমৃদ্ধতর সুজলা-সুফলা এই দেশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন জাতির বিশেষ আকর্ষণ ছিল, যার পরিণতিতে নানাবিধ উপলক্ষে এখানে তাঁদের আগমন বা আগ্রাসন ইতিহাসতত্ত্ববিদদের মতে এভাবেই আসীন ঘটে দ্রাবিড়, আর্য, শক, হুন, আরব, পাঠান, মোঘল ইয়োরোপীয়দের তাঁদের মধ্যে দ্রাবিড়, আর্য, হুন, শক, মোঘল, পাঠান, আরব, তুর্কি, ইরানি প্রভৃতিরা এদেশবাসীদের সাথে না না সূত্রে এবং নানাভাবে মিশে গিয়েছে

প্রভুত্বকারী প্রথাগত ইতিহাসে আর্যপূর্ব যুগের আদিবাসীরা ঢালাওভাবে অনার্য নামে পরিচিত ঐতিহাসিকদের পাতায় যদিও অনার্যদের কোনো পরিচয় লেখা নেই, তাদের পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে এদেশের প্রাচীন পড়োভূমি আর বিস্মৃতপ্রায় নৃতত্ত্ব, ভাষা সংস্কার সংস্কৃতিতে অনার্য জাতি বলে পরিচিত আদিম জনগণ সম্পর্কে আমরা স্বভাবতঃ যে হীন ধারণা পোষণ করি তা মোটেই সঠিক নয় কেননা, বিদেশাগত আর্য এদেশীয় অনার্যদের তৎকালীন ইতিহাসের পারষ্পরিক অবস্থার মধ্যে তথাকথিত ভ্রান্ত ধারণাদির বিরুদ্ধে নিগুঢ় তথ্য নিহিত রয়েছে আর্যরা যখন আক্রমণকারী রুপে এদেশে আগমণ করে তখনো তারা ছিল যাযাবর জাতি এবং কাঁচা খাদ্য ভক্ষণ করত পক্ষান্তরে এদেশে বসবাসকারী অনার্য নামক অধিবাসীরা ছিল পাকান্ন ভোজী ঘরবাড়ি নির্মাণ করে সামাজিক জীবনযাপনকারী স্থিতিশীল নাগরিক তাদের নিজস্ব কৃষিভিত্তিক সভ্যতা ছিল এই পরিস্থিতিতে আগ্রাসী আর্যরা এদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষদের উপরে চড়াও হয়ে, তাদের পরাভূত করে চাপিয়ে দেয় নিজেদের জীবন-যাপন পদ্ধতি

তবুও যখন এদেশের মূলস্রোতের প্রকৃত ইতিহাসজ্ঞান অর্জনে অক্ষম সাধারণ মানুষদের মতো কোনো কোনো ইতিহাসবিদ, গবেষক, বুদ্ধিজীবী প্রকৃত আদিবাসীদের স্থলে মিশ্ররক্তজাত বাঙালিদের স্থান দেন এবং আদিবাসীদের অস্থানীয়, বহিরাগত ইত্যাদি বলে পাশ কাটিয়ে যেতে প্রচেষ্টা চালান এর প্রতুত্তরে বিশিষ্ট আদিবাসী ব্যক্তিত্ব পল চারু তিগ্যা বলেন, “বাংলাদেশের কোনো কোনো সমাজতত্ত্ববিদ আদিবাসীদের এদেশের ভূমিজ সন্তান নয় বলে উল্লেখ করেন অবশ্য ভৌগোলিক বিচারে নিশ্চয় তাদেরকে এদেশের ভূমিজ সন্তান বলা চলে না তবে একথাও সত্যি যে, এই মানদন্ডের বিচারে আমাদের মধ্যে অনেক বাঙালিও এদেশের ভূমিজ সন্তান নয় কারণ, তারা ভারত বা অন্যান্য স্থান থেকে হয় রাজনৈতিক চাপে পড়ে অথবা রেওয়াজ বদলের মাধ্যমে বাংলার মাটিতে প্রবেশ করেছেন তাদের সম্পর্কে লিখতে গেলে নিশ্চয় সমস্ত সমাজবিদরা তাদেরকেও এদেশের ভূমিজ সন্তান নয় বলে আখ্যায়িত করবেন না দ্বিতীয়তঃ যদি বলি রাজনৈতিক বিচারে তারা এদেশের ভূমিজ সন্তান না হন হলে আমরা যারা ছয় বছরের উর্ধ্বে তারা কেউ এদেশের ভূমিজ সন্তান নই কারণ, বাংলাদেশের বয়স মাত্র ছয় সাত বছর” (‘দিনাজপুর জেলার আদিবাসীদৈনিক উত্তরা, ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৭ খৃষ্টাব্দ)

পরবর্তীতে এই বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মত প্রকাশ করেছেন ; বিশেষত আনু মহম্মদ বলেন, “বাংলাদেশ শুধুমাত্র বাঙালিদের আদি বাসভূমি নয় এদেশে এমন মানুষ আছে যারা বাঙালি নয়, এবং যারা এখানে বহুবছর ধরে আছে, কিছু এলাকায় বাঙালিদের চেয়ে বেশিদিন ধরে তারা তাদের নিজস্ব সমাজ, সংগঠন, সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে এবং সর্বোপরি তারা বাংলাদেশকে তাদের বাসভূমি মনে করে এদের মতো অনেক গোষ্ঠী আছে যারা বাঙালিদের তুলনায় কম গভীরভাবে এখানে প্রোথিত নেই বাঙালিদের মতো তারাও বাংলাদেশের নাগরিক, কিন্তু এটি ভীষণ জরুরি যে, এরা বাঙালি নয় তা মনে রাখতে হয় ... তাদের ইতিহাস আলাদা, তাদের সমাজ আলাদা, তাদের ভাষা আলাদা, কিন্তু আমরা সবাই অবিভক্ত রাষ্ট্রের পরিচিতি বহন করি

সর্বশেষ স্বীকৃত হিসেব অনুযায়ী পৃথিবীর ৭০টির বেশি দেশে প্রায় ৫০০০ টি জাতিগোষ্ঠীর ৩০ কোটির অধিক আদিবাসী রয়েছে কিন্তু আদিবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন আদিবাসীসহ বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতিশীল বৃদ্ধিজীবীরা সংখ্যা বৈষম্যের ক্ষুদ্র নমুনা বাংলাদেশে আদিবাসীদের সংখ্যা নির্নয়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলেই ষ্পষ্ট হয় ১৯৭৪ সালের আদমশুমারীতে ২৬ টি নৃগোষ্ঠীর ,১০,৬৪২ জনকে দেখানো হয়েছে ১৯৯১ হিসেবে ২৭টি জনগোষ্ঠীর ১২,০৫,৯৮৭ জন কিন্তু জুন ২০০০ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে ৪৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের জনসংখ্যা ১৪,২৩,০৬৮ জন অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক ফাদার ষ্টিফেন গোমেজ তাঁর গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বসবাসরত ৫৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উল্লেখ করেছেন এবং আদিবাসী নেতৃবৃন্দ মনে করেন এদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ আর রাজনৈতিকভাবে আদিবাসীদের কোনঠাসা করার নিমিত্তেই সরকারীভাবে আদিবাসী সংখ্যা কম উল্লেখ করা হয় বলে মনে করেন তাঁরা

তবে ভৌগোলিক শারীরিকসহ কিছু কিছু ভিন্নতা থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত আদিবাসীরাই সামঞ্জস্য তাদের প্রান্তিক অবস্থান, শোষণ, বঞ্চণা, দারিদ্র, অশিক্ষা, অসচেতনতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশেই তারা মূলস্রোতের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষদের চাঁপিয়ে দেওয়া বিবিধ অন্যায় আচরণের শিকার তথাকথিত সভ্যতার নামে, প্রচার সর্বস্ব উন্নয়নের নামে সারাবিশ্বে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ সহ চলছে আধুনিক মানুষদের অভিনব সব অত্যাচার, অবমাননা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদিবাসীদের অসভ্য, জংলী ইত্যাদি নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করে চালানো হয়েছে নির্যাতনের খরগ তাদের অকৃত্রিম সরলতার সুযোগ নিয়ে কথিত সভ্য মানুষেরা উদ্ভাবন করেছে অজস্র প্রতারণা-কৌশল রাষ্ট্রীয় আইনের অন্যায় নিস্ক্রিয়তায় প্রকাশ্যে তাদের উপর চলে রাজনৈতিক নিপীড়ন, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক শোষণ

কেবল বস্তুগত শোষণ নয়, আদিবাসীদের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক সত্যতার অভাবও পরিলক্ষিত কমবেশি অধিকাংশ দেশের সমকালীন বিবরণে, যার জ্বলন্ত উদাহরণ এদেশের প্রচলিত ইতিহাস বিশেষ করে এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর মহান অবদানের অদ্ভুত অনুপস্থিতিতি কেবল এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা নয়, বরং এটাকে এক ধরনের সুচিন্তিত বর্জন বলে মনে করেন কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী জাতি ভিত্তিক রাষ্ট্রের যথার্থতা নিরুপন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন তাঁরা এবং এক্ষেত্রে সংবিধানে বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতির অনুল্লেখ তাদের মতামতের প্রমাণ হিসেবে কার্যকর

পৃথিবীর দুটি দেশের সংবিধানে সেদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংযোজিত হয়েছে, যার একটি বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের সংবিধানই বিশ্বে একমাত্র সংবিধান যেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে, “ধর্মকে অবলম্বন করে কোনো রাজনীতি করা যাবে নাকিন্তু স্বাধীনতার তৎপরবর্তীকালীন জিয়া এরশাদ আমলে পঙ্গুকৃত সা¤প্রদায়িক সংবিধান বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সংবিধানের মহত্বকে কেবল নষ্টই করেনি, সংবিধানের তথাকথিত সংশোধনের কারণে আজ এক ধরনের অঘোষিত অধিকার নিয়ে দেশের সর্বত্র সৃষ্ট হচ্ছে অসংখ্য জঙ্গিবাদী সা¤প্রদায়িক সংগঠন, যারা দেশের আইন-কানুন মানবাধিকারকে তুচ্ছজ্ঞান করে মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ধর্মবাদী প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলসমূহ ছাড়াও অর্ধশতাধিক জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে এদেশে যারা দেশব্যাপী হাজারের অধিক মাদ্রাসা প্রায় লাখ ৩০ হাজার মসজিদকে কেন্দ্র করে তারা নানাবিধ প্রশিক্ষণ সহ অন্যান্য কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকে (ভোরের কাগজ ১৮.০৮.০৫) দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার প্রশিক্ষিত জঙ্গি রয়েছে (জনকন্ঠ ২২.০৮.০৫) এসব জঙ্গীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে তিনটি বিদেশী সংস্থা (জনকণ্ঠ ২১.০৮.০৫) এভাবেই বাঙালি বাঙালি মুসলিম সচেতনতাবোধের মিশ্রণে বিবর্তিত হতে থাকে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের প্রতিনিধিদের জাতীয়তাবাদ আর জাতীয়তাবাদের এই দুটো মুখ্য উপাদানই পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেয় এদেশের সংখ্যালঘু ভিন্নভাষী অমুসলিম জাতিসমূহের প্রতি বিবিধ অনাচারের শিতাংশু গুহ গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত স্লো জেনোসাইড এথনিক ক্লিনজিং কারণে মাত্র কয়েক বছরে (১৯৪৭ থেকে বর্তমান) সংখ্যালঘুর সংখ্যা ৩০% থেকে ১০% য়ে চলে এসেছে এবং অত্যাচার অভিমানে দেশান্তরিত এই মানুষদের সংখ্যা সম্মিলিতভাবে বাহরাইন, আইসল্যান্ড, জর্ডান, লেবানন, লিবিয়া, নামিবিয়া, ওমান, পানামা কোষ্টারিকার জনসংখ্যার সমান

দেশ বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক অন্যান্য গণমাধ্যমসহ, জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং গবেষণা রিপোর্টে প্রতিনিয়ত প্রকাশিত এসকল অমানবিক বৈষম্যমূলক আচরণের বিবরণ প্রকাশে বিশ্বে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে তা নিশ্চয়ই কোনো দেশের জন্যে সূখকর সুফলবাহী নয়

আর এই পরিকল্পিত প্রান্তিকীকরণ নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় এদেশে ক্রমহ্রাস ঘটছে সংখ্যালঘু সত্তার ১৯৭৪ সালের জনগণনা অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৮৫.% মুসলিম বাকীরা বিভিন্ন সংখ্যালঘূ ¤প্রদায়ের ১৯৯১ সালের হিসাবনুযায়ী ৮৮.% মুসলিম বাকীরা বিভিন্ন সংখ্যালঘু ¤প্রদায়ের অধিবাসী জানা যায়, রাষ্ট্র তার সংখ্যাগরিষ্ট জনসংখ্যার বহুমুখী চাপে প্রতিদিন গড়ে ৫৫০ জন সংখ্যালঘু মানুষ দেশান্তরী হচ্ছে

অথচ ১৭৭১ সালে সংঘটিত ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম উপনিবেশ বিরোধী গণবিদ্রোহ তৎপরবর্তী সকল স্বাধীকার আন্দোলনে অপরিসীম ত্যাগ বীরত্বের সাক্ষ্য রেখেছে আদিবাসী মানুষ এবং কেবল ১৮৫৫ সালের বৃটিশ বিরোধী সাঁওতাল হুল বিদ্রোহে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ হাজার আদিবাসী সাঁওতাল এমনিকরে ওঁরাও তানাভগৎ আন্দালন, পাগল বিদোহ, হাতিখেদা আন্দোলন, চাকমা বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহ, হাজংদের টংক বিরোধী আন্দোলন, মণিপুরী বিদ্রোহ, ভানুবিলের কৃষক-প্রজা বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, নাচোল বিদ্রোহ প্রভৃতিতে অকাতরে জীবন দিয়েছেন তাঁরা কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ অবধি উপমহাদেশের সকল বিদ্রোহ-সংগ্রাম ইতিহাসযোগ্য হয়ে স্থান নিতে পারেনি প্রথাগত প্রভাবশালী বিবরণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান লিপিবদ্ধ খন্ড বিদ্রোহ বা স্থানীয় হাঙ্গামা হিসেবে এরই ধারাবাহিকতায় আদিবাসীদের ত্যাগ অবদানের অদ্ভুত অনুপস্থিতি লক্ষ্যনীয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে

পৃথিবীর ইতিহাসগ্রন্থে স্বর্ণের হরফে লেখা এক মহাকাব্যের নাম ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ মহান সেই যুদ্ধে এদেশের মানুষ তাদের রক্তের নদী বেয়ে নিয়ে এসেছে স্বাধীনতার সাম্পান আর এত অল্প সময়ে এত বড়ো অর্জন সম্ভব হয়েছিল সেই সংগ্রামে দেশের আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততার কারণেই সম্পৃক্ততা ছিল এদেশের বাঙালি ভিন্ন আরো অর্ধশতাধিক জনগোষ্ঠীর, যারা আমাদের মূলস্রোতেরই অংশ, এই দেশের আদিবাসী ¤প্রদায় এক প্রাথমিক হিসেবে জানা যায়, একান্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গারো সাঁওতাল আদিবাসীর সংখ্যা দুই হাজার দু জন, যুদ্ধে শহীদ আদিবাসীর সংখ্যা কয়েকশত রংপুরের উপকন্ঠে পাকসেনাদের হাতে নিহত আদিবাসী সাঁওতালদের সংখ্যা ২০০ জন উল্লেখ রয়েছে ১৫ খন্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস গ্রন্থে সংখ্যাহীন এমন অনেক আদিবাসী যোদ্ধা রয়েছেন যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ চলাচলে অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব রেখে এদেশের বিজয়কে অনুকূলে এনে দিয়েছেন অথচ স্বাধীন দেশের ক্রমাগত নিগ্রহ, বঞ্চনা অস্বীকৃতি তাঁদের অনেককে আজ দেশান্তরিত হতে বাধ্য করেছে, কুণ্ঠিত করছে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিতে তেমনি এক অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বীর মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত বীরবিক্রম ইউ কোচিং মারমা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কী পেয়েছেন জীবন বাজি রেখে যুদ্ধজয়ের বিনিময়ে? জবাবে তিনি বলেন, “ অনেক পেয়েছি বাঙালির জন্যে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সুন্দর পতাকা, নিজের দেশের বড়ো বড়ো মন্ত্রি, এমপি, অফিসার, সবই তো পেয়েছি এমনকি দেশ আমাকে বীরত্বের জন্য একটি উপাধিও দিয়েছে আমার নাম এখন ইউ কে চিং বীরবিক্রম বাহ্ কী সুন্দর নাম! আদিবাসী শত সহস্র মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত ইউ কে চিং মারমা অথচ তার পেটে এখন ইঁদুর দৌঁড়ায়, বাইরে বৃষ্টি নামার আগে ঘরে পানি পড়ে তার কোনো জায়গা-জমি, ব্যবসা-বাণিজ্য নেই তার সন্তানদের কোনো চাকরি-বাকরি নেই ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো তাদের কোনো আয়ের উৎসও নেই তার সন্তানরা এখন দিনমজুর!” বান্দরবানের এক হতদরিদ্র পল্লী লাঙ্গিপাড়ায় বসবাসরত ইউকেচিং মারমা আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন না ¤প্রতি ষাটোর্ধ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মায়ের মৃত্যু হলে তিনি কয়েক দিনের জন্যে পার্শ্ববর্তী লাইটপোস্ট থেকে লাইন টেনে একটি বাতি জ্বালালে তাঁর কাছ থেকে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ টাকা দাবি করে এবং তিনি টাকা প্রদানে অসামর্থ্য হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ১৫,৬১২.২৭ টাকার বিল অনাদায়ে মামলা দায়ের করা হয় একাত্তরের যুদ্ধময়দানে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাক সেনাদের বন্দুক-কামানের মুখ থেকে না পালালেও স্বাধীন দেশে পুলিশি গ্রেফতারের ভয়ে পালাতে হয়েছে এদেশের একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা বীরবিক্রম ইউকেচিং মারমাকে সংক্ষেপে এই হল আমাদের স্বাধীন দেশের একজন খেতাবপ্রাপ্ত স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধার হাল-হকিকত সেক্ষেত্রে এদেশের অন্যসকল জীবিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা সাধারণ আদিবাসীদের কেমনতর দিনগুজরান তা সহজেই অনুমেয়

এমনিকরে অতিক্রান্ত সময়ের ঁিসড়ি বেয়ে এই ভূখন্ডের আধিপত্য থেকে বিদায় নিয়েছে বেনিয়া বৃটিশ, বিদায় নিয়েছে পাকিস্তানী শকুনের দল এদেশ এখন স্বাধীন, স্বার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র কিন্তু দীর্ঘ তিন যুগের অধিককাল অতিবাহিত হলেও এদেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পায়নি প্রতিষ্ঠিত হয়নি খাদ্য, চিকিৎসা সামাজিক নিরাপত্তা, আইনের সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আত্মসংরক্ষণের অধিকার তা এখনও দেশের মুষ্টিমেয় অভিজাতবর্গের আয়ত্বে, যারা তাদের চেয়ে নিচু শ্রেণীর মানুষদের কেবল দাবার গুটি হিসেবে গণ্য করতে অভ্যস্ত যাবত তারা যেমন দেশের ৮০ ভাগ কৃষিসংশ্লিষ্ট মানুষের স্বার্থকে স্বভাবজাতভাবে অবহেলা করে এসেছে, তেমনি তাদের ইচ্ছেকৃত অবহেলার শিকার হয়েছে এদেশের অর্ধ শতাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর রাষ্ট্রের অবহেলা অপকর্মে ইন্দন যোগায় মূলস্রোতের সাধারণ মানুষদের ফলে আদিবাসীরা আজ যুগপৎ উপেক্ষা, নিপীড়ন বৈষম্যের শিকার