একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ত্যাগ ও অংশগ্রহণ ছিল। একইসঙ্গে এদের মধ্যে কতিপয় কুলাঙ্গার পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করে এদেশের স্বাধীনতার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে প্রয়াস পেয়েছে। তারাই আদিবাসী রাজাকার।
ঔপনিবেশিক শাষক ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে নিয়ে ১৮৮১ সালে একে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে। একাত্তরে এই তিনটি সার্কেলের রাজা ছিলেন যথাক্রমে- ত্রিদিব রায়, অং শৈ প্রু চৌধুরী, মং প্রু চাঁই/ সাইন চৌধুরী। এঁদের মধ্যে মানিকছড়ির মং রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। আর চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানীদের দোসর, যুদ্ধাপরাধী।
পাকিস্তান আমলে পার্বত্য রাঙামাটিতে মুসলীমলীগ রাজা ত্রিদিব রায়, এসটি হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে পাকিস্তানী শোসন-নির্যাতন আর বৈষম্যের পক্ষে রাজনীতি করেছেন। জাতীয় পরিষদে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম-এ রাজা ত্রিদিব রায় এবং ময়মনসিংহে পিডিপি নেতা নুরুল আমিনের আসন ছাড়া বাকি ১৬০টি আসনই লাভ করেছিল। ত্রিদিব রায়ের আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ছিলেন চারু বিকাশ চাকমা।
পাকিস্তানী শাসনামলে পাক-প্রভুদের প্রতি রাজা ত্রিদিব রায়ের যেমন স্বার্থের সম্পর্ক এবং অগাধ আস্থা ছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালেও তিনি পাকিস্তানীদের শক্তিমত্তার প্রতি অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। শরদিন্দু শেখর চাকমা তাঁর মুক্তিযদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রন্থে বলেছেন- "রাজা ত্রিদিব রায় মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে না, যদি ভারত পাকিস্তানকে যদ্ধে পরাস্ত করতে না পারে। আর ভারত পাকিস্তানকে পরাস্ত করতে পারবে না, কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীন এবং আমেরিকা আছে। তারা কোনোদিন পাকিস্তানকে ভারতের কাছে পরাজিত হতে দেবে না।”
তাই রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় থেকেই পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তার সহযোগিতায় রাঙামাটিতে গণহত্যা চলেছে। পাক-পরিবৃত্ত রাঙামাটিতে মুক্ত করতে এগিয়ে আসা দশ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলকে হত্যা করায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এমনকি তার ইন্ধন ও প্রভাবের কারণে ঐকান্তিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক চাকমা তরুণ-যুবক মুক্তিযদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বরং তাদের পাকিস্তানীদের রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি তার সার্কেলের বিভিণœ এলাকায় গিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতেন। চাকমা যুবক তরণদের সংগ্রহ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পানছড়ি প্রর্ভৃতি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানী ক্যাম্পে সরবরাহ করতেন তিনি। এখানে তারা দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সসস্ত্র রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানপন্থী কার্যক্রমে লিপ্ত হতেন।
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নামক আকর গ্রন্থের ৯ম খন্ডে জেনারেল মীর শওকত আলী বীরউত্তম বলেছেন- "চাকমা উপজাতিদের হয়ত আমরা সাহায্য পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায় ...”। একইভাবে ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম তাঁর গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ - এ বলেছেন, "চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রথম থেকেই নির্লিপ্ত এবং গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন...।”
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নামক গ্রন্থে জামালউদ্দিন লিখেছেন, "..... অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক-দালালখ্যাত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দিনই (১৬ই এপ্রিল, ১৯৭১) পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী রাঙ্গামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরামুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এই দলের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইফতেখার। ”
ইফতেখার ছিলেন রাঙামাটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের সন্তান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী।তাঁর দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাঙামাটি সদরের এসডিও আবদুল আলী। তিনি ইফতেখারসহ এসএম কালাম, আবদুল শুকুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, শামসুল হক মাস্টারকে নিয়ে একটি স্পিডবোটে চড়ে মহালছড়ি থেকে রাঙামাটি এসেছিলেন। পাকিস্তানিরা এঁদের নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে সে সময়। তারা আবদুল আলীকে রাঙামাটি পুলিশ লাইনের একটি ব্যারাকে আটকে রেখে তাঁর শরীর ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে লবন ছিটিয়ে দিতো এবং পরবর্তীতে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়েছিল।
কিন্তু একাত্তরের নভেম্বর থেকে যখন মক্তিযুদ্ধের গতিপথ ক্রমশ স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে চলতে থাকে, তখনই নিরাশ হয়ে যান ত্রিদিব রায়। চলে যান তার প্রভুদেশ পাকিস্তানে। সেখান থেকে পাকিস্তানের হয়ে দালালি কর্মকান্ড স¤প্রসারণের অংশ হিসেবে মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড প্রভৃতি বৌদ্ধপ্রধান দেশে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান। তবুও যখন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদারদের শেষরক্ষা হলো না, থকন তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশে না এসে পাকিস্তানে থেকে যান। সেখানে পাক-দালল হিসেবে বাংলাদেশীদের মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের পরেই তার স্থান। একাত্তরে তার অসাধারণ ভূমিকারজন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পাকসরকার তাকে সসম্মানে পনর্বাসিত করেছে। পাকিস্তানের হয়ে আর্জেন্টিনা ও শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন রাজা ত্রিদিব রায়। এখন আছেন ফেডারেল মন্ত্রী হিসেবে। সেখানে থেকে তিনি পাকসরকারের সেবা করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে দ্যা ডিপার্টেড ম্যালোডিসহ বিভিন্ন বিতর্কিত প্রকাশনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ত্রিদিব রায়ের মতই আরেকজন যুদ্ধাপরাধী বোমাং সার্কেলের রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী। মক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানীদের সক্রিয় দোসর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। সে সময় তার সঙ্গে তার পরিবার ও স¤প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ পাকিস্তানী-দালাল হিসেবে নেতিবাচক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনিও শুরু থেকেই পাকসরকারের সহযোগী হিসেবে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে মুসলীমলীগের হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী পরিষদে (বন, সমবায় ও মৎস) স্থান লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুতকৃত যুদ্ধপরাধীদের তালিকা ও এ সম্পর্কিত প্রকাশনায় প্রথম সারিতে স্থান রয়েছে এই দুই আদিবাসী রাজার।
অথচ এসব কুলাঙ্গার ব্যক্তিকে একাত্তরে মানবতা-বিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনো প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়নি। বরং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের স্বাধীন বাংলাদেশে এসব যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তিদের বংশধরকে বিভিন্নভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আর অন্যদিকে, একাত্তরের মক্তিযুদ্ধে নিজের অর্থ, অস্ত্র, শ্রম তথা সর্বস্ব দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মং সার্কেলের রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী। যুদ্ধকালে মানিকছড়ি রাজবাড়িতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজের সংগৃহিত ৩০টি অস্ত্র ও গাড়ি দিয়েছেন, মুজিবনগর সরকারকে নিজের অর্থ-কড়ি দিয়েছেন। এরপর নিজ পরিবার পরিজন নিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে থেকেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং আখাউড়া অপারেশসহ বেশ কয়েকটি অপারেশনে বীরত্বপূর্ন নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। সে সময় তাঁর দক্ষতা ও নিরাপত্তার জন্য ভারত সরকার তাঁকে অনারারি কর্নেল উপাধি দিয়েছিল। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বস্ব হারানো এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ ত্যাগ ও বীরত্বের জন্য কোনো উপাধিও দেওয়া হয়নি।
ঔপনিবেশিক শাষক ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে নিয়ে ১৮৮১ সালে একে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করে। একাত্তরে এই তিনটি সার্কেলের রাজা ছিলেন যথাক্রমে- ত্রিদিব রায়, অং শৈ প্রু চৌধুরী, মং প্রু চাঁই/ সাইন চৌধুরী। এঁদের মধ্যে মানিকছড়ির মং রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। আর চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানীদের দোসর, যুদ্ধাপরাধী।
পাকিস্তান আমলে পার্বত্য রাঙামাটিতে মুসলীমলীগ রাজা ত্রিদিব রায়, এসটি হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে পাকিস্তানী শোসন-নির্যাতন আর বৈষম্যের পক্ষে রাজনীতি করেছেন। জাতীয় পরিষদে পূর্বপাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ পার্বত্য চট্টগ্রাম-এ রাজা ত্রিদিব রায় এবং ময়মনসিংহে পিডিপি নেতা নুরুল আমিনের আসন ছাড়া বাকি ১৬০টি আসনই লাভ করেছিল। ত্রিদিব রায়ের আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ছিলেন চারু বিকাশ চাকমা।
পাকিস্তানী শাসনামলে পাক-প্রভুদের প্রতি রাজা ত্রিদিব রায়ের যেমন স্বার্থের সম্পর্ক এবং অগাধ আস্থা ছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালেও তিনি পাকিস্তানীদের শক্তিমত্তার প্রতি অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। শরদিন্দু শেখর চাকমা তাঁর মুক্তিযদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রন্থে বলেছেন- "রাজা ত্রিদিব রায় মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে না, যদি ভারত পাকিস্তানকে যদ্ধে পরাস্ত করতে না পারে। আর ভারত পাকিস্তানকে পরাস্ত করতে পারবে না, কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীন এবং আমেরিকা আছে। তারা কোনোদিন পাকিস্তানকে ভারতের কাছে পরাজিত হতে দেবে না।”
তাই রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় থেকেই পাকিস্তানীদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তার সহযোগিতায় রাঙামাটিতে গণহত্যা চলেছে। পাক-পরিবৃত্ত রাঙামাটিতে মুক্ত করতে এগিয়ে আসা দশ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলকে হত্যা করায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এমনকি তার ইন্ধন ও প্রভাবের কারণে ঐকান্তিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক চাকমা তরুণ-যুবক মুক্তিযদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বরং তাদের পাকিস্তানীদের রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি তার সার্কেলের বিভিণœ এলাকায় গিয়ে প্রকাশ্যে পাকিস্তানীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতেন। চাকমা যুবক তরণদের সংগ্রহ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পানছড়ি প্রর্ভৃতি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানী ক্যাম্পে সরবরাহ করতেন তিনি। এখানে তারা দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সসস্ত্র রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানপন্থী কার্যক্রমে লিপ্ত হতেন।
হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নামক আকর গ্রন্থের ৯ম খন্ডে জেনারেল মীর শওকত আলী বীরউত্তম বলেছেন- "চাকমা উপজাতিদের হয়ত আমরা সাহায্য পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায় ...”। একইভাবে ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম তাঁর গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ - এ বলেছেন, "চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রথম থেকেই নির্লিপ্ত এবং গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন...।”
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নামক গ্রন্থে জামালউদ্দিন লিখেছেন, "..... অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক-দালালখ্যাত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দিনই (১৬ই এপ্রিল, ১৯৭১) পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী রাঙ্গামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরামুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এই দলের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইফতেখার। ”
ইফতেখার ছিলেন রাঙামাটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের সন্তান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী।তাঁর দলের নেতৃত্বে ছিলেন রাঙামাটি সদরের এসডিও আবদুল আলী। তিনি ইফতেখারসহ এসএম কালাম, আবদুল শুকুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, শামসুল হক মাস্টারকে নিয়ে একটি স্পিডবোটে চড়ে মহালছড়ি থেকে রাঙামাটি এসেছিলেন। পাকিস্তানিরা এঁদের নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করেছে সে সময়। তারা আবদুল আলীকে রাঙামাটি পুলিশ লাইনের একটি ব্যারাকে আটকে রেখে তাঁর শরীর ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে লবন ছিটিয়ে দিতো এবং পরবর্তীতে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়েছিল।
কিন্তু একাত্তরের নভেম্বর থেকে যখন মক্তিযুদ্ধের গতিপথ ক্রমশ স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে চলতে থাকে, তখনই নিরাশ হয়ে যান ত্রিদিব রায়। চলে যান তার প্রভুদেশ পাকিস্তানে। সেখান থেকে পাকিস্তানের হয়ে দালালি কর্মকান্ড স¤প্রসারণের অংশ হিসেবে মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড প্রভৃতি বৌদ্ধপ্রধান দেশে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান। তবুও যখন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদারদের শেষরক্ষা হলো না, থকন তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশে না এসে পাকিস্তানে থেকে যান। সেখানে পাক-দালল হিসেবে বাংলাদেশীদের মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের পরেই তার স্থান। একাত্তরে তার অসাধারণ ভূমিকারজন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পাকসরকার তাকে সসম্মানে পনর্বাসিত করেছে। পাকিস্তানের হয়ে আর্জেন্টিনা ও শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন রাজা ত্রিদিব রায়। এখন আছেন ফেডারেল মন্ত্রী হিসেবে। সেখানে থেকে তিনি পাকসরকারের সেবা করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে দ্যা ডিপার্টেড ম্যালোডিসহ বিভিন্ন বিতর্কিত প্রকাশনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ত্রিদিব রায়ের মতই আরেকজন যুদ্ধাপরাধী বোমাং সার্কেলের রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরী। মক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানীদের সক্রিয় দোসর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। সে সময় তার সঙ্গে তার পরিবার ও স¤প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ পাকিস্তানী-দালাল হিসেবে নেতিবাচক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনিও শুরু থেকেই পাকসরকারের সহযোগী হিসেবে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে মুসলীমলীগের হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী পরিষদে (বন, সমবায় ও মৎস) স্থান লাভ করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে প্রস্তুতকৃত যুদ্ধপরাধীদের তালিকা ও এ সম্পর্কিত প্রকাশনায় প্রথম সারিতে স্থান রয়েছে এই দুই আদিবাসী রাজার।
অথচ এসব কুলাঙ্গার ব্যক্তিকে একাত্তরে মানবতা-বিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনো প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়নি। বরং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের স্বাধীন বাংলাদেশে এসব যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তিদের বংশধরকে বিভিন্নভাবে উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আর অন্যদিকে, একাত্তরের মক্তিযুদ্ধে নিজের অর্থ, অস্ত্র, শ্রম তথা সর্বস্ব দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মং সার্কেলের রাজা মং প্রু চাঁই চৌধুরী। যুদ্ধকালে মানিকছড়ি রাজবাড়িতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিজের সংগৃহিত ৩০টি অস্ত্র ও গাড়ি দিয়েছেন, মুজিবনগর সরকারকে নিজের অর্থ-কড়ি দিয়েছেন। এরপর নিজ পরিবার পরিজন নিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে থেকেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং আখাউড়া অপারেশসহ বেশ কয়েকটি অপারেশনে বীরত্বপূর্ন নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। সে সময় তাঁর দক্ষতা ও নিরাপত্তার জন্য ভারত সরকার তাঁকে অনারারি কর্নেল উপাধি দিয়েছিল। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বস্ব হারানো এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসাধারণ ত্যাগ ও বীরত্বের জন্য কোনো উপাধিও দেওয়া হয়নি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন