শুক্রবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১২

বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম : বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস


১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ উপজেলার জলসুধা নামক গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জগৎজ্যোতি দাস। পিতা জীতেন্দ্র চন্দ্র দাস পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী। নানাবিধ প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ১৯৬৮ সালে এসএসসি উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর জড়িয়ে পড়েন গণমানুষের লড়াইয়ে।

একাত্তরে জগৎজ্যোতি স্থানীয় ছাত্র ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির কর্মী। তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যপারে তাঁকে হঠাৎকরে ভাবতে হয়নি। যুদ্ধ শরুর প্রথমদিকে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়ে ক্রমশ বুঝতে পারেন যে কেবল প্রতিরোধ সংগ্রাম নয়, সশস্ত্রভাবে প্রতিহত করতে হবে পাক-হানাদারদের। সদলে ভারতের শিলংয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণকালে তাঁর নেতৃত্বগুণ, প্রখর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কঠোর পরিশ্রমের যোগ্যতা, বাংলা ছাড়াও অন্যান্য ভাষায় দক্ষতা ইত্যাদি কারণে মুগ্ধ হন ভারতীয় প্রশিক্ষকবৃন্দ। দলের নেতা নির্বাচিত হন জগৎজ্যোতি দাস। দলের নাম হয় দাস পার্টি।

মুক্তিযুদ্ধকালে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার নৌপথসহ উত্তরপূর্ব রণাঙ্গণের বিস্তীর্ণ ভাটি অঞ্চল শত্রুমুক্ত রাখার দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপর। একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের কাছে জগৎজ্যোতির এ দাস-পার্টি আতঙ্কে পরিণত হয়। ভাটি অঞ্চলে পাকদের যাতায়াতের অন্যতম রুট এই নৌপথ তাদের জন্য এতটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যে রেডিওতে গোষণা দিয়ে এই রুট দিয়ে চলাচলকারী ব্যক্তিদের জানমালের দায়িত্ব নিতে অপারগতা স্বীকার করে পাকিস্তান সরকার। কেবল ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বানিয়াচংয়ে প্রায় ২৫০ জন পাকসেনা ও তাদের দোসরদের প্রতিহত করেছেন জগৎজ্যোতি। গানবোট ধ্বংস করে প্রাণ হরণ করেছেন ৩৫ জন শত্রুসেনার। অত্যন্ত সাহসী এ বীরযোদ্ধা একা হাতে একটি এলএমজি নিয়ে দখল করেছেন রাজাকারদের ঘাঁটি জামালগঞ্জ থানা ভবন। এরপর পুরা জামালগঞ্জ মুক্ত করতে নেতৃত্ব দেন তিনি। একইভাবে মাত্র ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে শ্রীপুর শত্রুমুক্ত করেন। খালিয়াজুড়িতে ধ্বংস করেন পাকিস্তানীদের বার্জ। ১৭ আগস্ট পাহাড়পুরে তাঁর বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার কারণে অসংখ্য বাঙালির জীবন ও নারীদের সম্ভ্রব রক্ষা পায়। এই মাসেই দিরাই-শাল্লা, রাণীগঞ্জ, কাদিরীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে খুন-ধর্ষণ ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত রাজাকারদের আটক করে শাস্তি প্রদান করেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এক কিংবদন্তী আর পাকসেনা ও রাজাকারদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন জগৎজ্যোতি দাস।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব নভেম্বরের ১৬ তারিখের ভোরবেলা জগৎজ্যোতি তাঁর দলের ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বাহুবল অভিযানে যাত্রা শুরু করেন। লক্ষস্থলে পৌঁছুনোর আগেই বদলপুর নামক স্থানে পাকসেনা ও রাজাকারদের পাতানো ফাঁদে আটকে যান তিনি। অন্যায়কর্মে রত কয়েকজন রাজাকারকে তাড়া করতে গিয়ে পাকসেনাদের বিশাল বহরের মখে পড়েন তিনি। শুরু হয় এক অসম সম্মুখযুদ্ধ। একদিকে জগৎজ্যোতির সীমিত গোলাবারুদ, সীমিত লোকবল আর অন্যদিকে অত্যাধুনিক অস্ক্রশস্ত্রে শোভিত পাকসেনাদের বিশাল বাহিনী। তবুও অকুতোভয় বীরযোদ্ধা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যেতে একে একে বধ করেন ১২ জন পাকসেনা। কিন্তু এক পর্যায়ে গোলাবারুদ আর সঙ্গীযোদ্ধা কমে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়ে যান জগৎজ্যোতি। পাশে থাকা যুদ্ধরত বীর ইলিয়াসের মাথায় গুলি লাগে। তাই জীবন বাঁচানোর জন্য অবশিষ্ট সঙ্গীদের পালানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে শত্রুদের খুব কাছে চলে যান তিনি। বিকেল তখন পৌণে পাঁচটা, জগৎজ্যোতির যুদ্ধরসদ শেষ পর্যায়ে। সঙ্গীরা দূর থেকে পালিয়ে যেতে আহ্বান করছেন। কিন্তু পিছু হটতে নারাজ তিনি। এমনি সময় আচমকা শত্রুপক্ষের একটি বুলেট আঘাত করে বীরযোদ্ধার শরীর, আমি যাইগ্যা বলে চিৎকার করে মাটির ওপর বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে একটি মানচিত্র এঁকে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জগৎজ্যোতি। 

সীমিত অস্ত্রশস্ত্র ও লোকবল নিয়ে পাকসেনা ও রাজাকারদের বিপুল ক্ষতিসাধনকারী, এক বিস্তৃত অঞ্চলের স্থানীয় নারী-পুরুষকে হানাদারদের অত্যাচার থেকে রক্ষার নায়ক, পাকসেনা ও রাজাকারদের আতঙ্ক এ বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েন সহযোদ্ধাসহ স্থানীয় বিস্তৃত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। ত৭ার শহীদ হওয়ার সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তুলে ধরা হয় তাঁর অনন্যসাধারণ বীরত্বগাঁথা। এ সময় জগৎজ্যোতির বীরত্বপূর্ণে অবদানে মুগ্ধ হয়ে মুিজবনগর সরকার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ পদক প্রদাণের ঘোষণা দেন। সরকারের এ ঘোষণা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে উদ্ধুদ্ধ করে সে সময়।

কিন্তু আমাদের ইতিহাসের দুর্ভাগ্য যে ঘোষণা দিয়েও মুক্তিযুদ্ধের সরকার তাঁর এ বীর যোদ্ধাকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান থেকে বিরত থাকেন। বীরশ্রেষ্ঠ-র পরিবর্তে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাঁকে, এবং এর বাস্তবায়ন হয় স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ দুযুগ পড়ে। 

      

কোন মন্তব্য নেই: